এস আলমের প্রতিষ্ঠানের অর্থ পাচার তদন্ত শুরু

পুঁজিবাজারের সদস্যভুক্ত ব্রোকারেজ হাউজ আভিভা ইকুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের (পূর্বের নাম রিলায়েন্স ব্রোকারেজ সার্ভিস) ঋণসহ বিভিন্ন আর্থিক লেনদেন ও অর্থপাচার তদন্তে নেমেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক খাতের বহুল আলোচিত এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান।

জানা গেছে, বিএসইসি পুঁজিবাজার এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে প্রতিষ্ঠানটির অনিয়ম তদেন্তে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে নির্দেশনার পরবর্তী ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। বিএসইসির মার্কেট ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে (এমডি) অবহিত করা হয়েছে।

কমিটির সদস্যরা হলেন বিএসইসির পরিচালক মনসুর রহমান, যুগ্ম পরিচালক সুলতানা পারভীন ও সহকারী পরিচালক মো. মারুফ হাসান।

ব্রোকারেজ হাউজটির বিরুদ্ধে শেয়ার কারসাজি, সমন্বিত গ্রাহক হিসাবে (সিসিএ) ঘাটতি, নেগেটিভ অ্যাকাউন্টে ঋণ প্রদান, ডিলার অ্যাকাউন্ট ও নেগেটিভ অ্যাকাউন্টে শেয়ার ডাম্পিং, অতিরিক্ত দামে প্লেসমেন্ট শেয়ার ক্রয় এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ আত্মসাৎ করাসহ নানান অভিযোগ রয়েছে। এ সব ঘটনার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. শহিদুল ইসলামের সম্পৃক্ততা থাকার অভিযোগ রয়েছে।

তথ্যমতে, আভিভা ফাইন্যান্সের চেয়ারম্যান ছিলেন এস আলম গ্রুপের কর্ণধার মোহাম্মদ সাইফুল আলম। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাকে এই প্রতিষ্ঠান থেকে সরিয়ে দেয়। অর্থ কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত পি কে হালদার ২০০৯ সালে আভিভা ফাইন্যান্সের (তৎকালীন রিলায়েন্স ফাইন্যান্স) ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আর্থিক কেলেঙ্কারির পর ২০২০ সালে রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের নাম পরিবর্তন করে আভিভা ফাইন্যান্স রাখা হয়। একই সঙ্গে তৎকালীন তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্স ব্রোকারেজ রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের নাম পরিবর্তন করে আভিভা ইকুইটি ম্যানেজমেন্ট রাখা হয়।

বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, আভিভা ফাইন্যান্স থেকে ঋণ গ্রহণ করেছে আভিভা ইকুইটি ম্যানেজমেন্ট। কোনো কোনো ক্ষেত্র ওই ঋণের টাকা ব্যবহার করা হয়েছে, যথাযথ নিয়ম মেনে তা ব্যবহার করা হয়েছে কি না, ওই ঋণের টাকা থেকে কোনো রিলেটেড পার্টিকে মার্জিন ঋণ দেওয়া হয়েছে কি না, ওই ঋণ মানিলন্ডারিংয়ে ব্যবহৃত হয়েছে কি না, যথাসময়ে পরিশোধে ব্যর্থতার কারণ কীÑ এসব বিষয় তদন্ত করবে বিএসইসির গঠিত তদন্ত কমিটি।

বিএসইসির আদেশ যা বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন মনে করে, পুঁজিবাজার এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বৃহত্তর স্বার্থে উল্লেখিত শর্তাবলী অনুসারে এনআরবি ব্যাংক সিকিউরিটিজ লিমিটেডের কার্যক্রম তদন্ত করা প্রয়োজন।

তাই বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩-এর ধারা ১৭(ক) এবং মানি লন্ডারিং প্রিভেনশন রুলস, ২০১৯ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে কমিশন তিন কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। গঠিত তদন্ত কমটিকে আভিভা ইকুইটি ম্যানেজমেন্টের বিভিন্ন কার্যপরিধি তদন্ত করে দেখবেন। কর্মকর্তারা এই আদেশ জারির তারিখ থেকে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করবেন এবং কমিশনের কাছে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিল করবেন।

তদন্ত কালে কমিটি আভিভা ফাইন্যান্স থেকে আভিভা ইকুইটি ম্যানেজমেন্ট কত টাকা ঋণ নিয়েছে এবং আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত সুদসহ মোট ঋণের পরিমাণ যাচাই করবে। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃক ওই ঋণের কত টাকা পরিশোধ করেছে, অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো ঋণ নিয়েছে কি না এবং নিয়ে থাকলে বর্তমানে সুদসহ তার পরিমাণ কত তা যাচাই করা হবে।

এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির নেওয়া ওই ঋণ কোনো কোনো খাতে ব্যবহার করা হয়েছে, তা সিকিউরিটিজ আইন ও প্রযোজ্য নিয়ম মেনে ব্যয় হয়েছে কি না, এই ঋণ থেকে কোনো সম্পর্কিত পক্ষকে (রিলেটেড পার্টি) মার্জিন ঋণ দেওয়া হয়েছে কি না, দিয়ে থাকলে তার অঙ্ক, সুদসহ বর্তমান অবস্থা কত এবং সেসব ঋণ ফেরত এসেছে কি না সেটাও খতিয়ে দেখবে তদন্ত কমটি।

পাশাপাশি আভিভা ফাইন্যান্স থেকে আভিভা ইকুইটি ম্যানেজমেন্টের নেওয়া ঋণ মানিলন্ডারিং -এ ব্যবহৃত হয়েছে কি না তাও অনুসন্ধান করতে গঠিত তদন্ত কমিট। এ ছাড়া ঋণ যথাসময়ে পরিশোধে আভিভা ইকুইটি ম্যানেজমেন্ট কেন ব্যর্থ হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটি আদৌ ঋণ শোধ করতে সক্ষম কি না, তা যাচাই করা হবে। আর সক্ষম হলে কবে নাগাদ তা পরিশোধ করা সম্ভব এবং এই সম্পর্কিত অন্য সব তথ্য যাচাই করবে গঠিত তদন্ত কমিটি।