যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে চলছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশন। গত মঙ্গলবার শুরু হওয়া এবারের অধিবেশনের প্রথম দুদিনই বিশ্ব নেতাদের আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত ‘ফিলিস্তিন’। জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অধিবেশনের প্রথম দিনই বক্তব্য রাখেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁসহ বেশ কয়েকজন ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপ্রধান। সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে আরব ও মুসলিম দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে গাজা নিয়ে বৈঠক করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ বৈঠক ‘সফল’ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। এদিকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট মাখোঁ বলেন, নোবেল শান্তি পুরস্কার পেতে চাইলে ট্রাম্পের গাজা যুদ্ধ বন্ধ করা উচিত। যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক চাপে ফিলিস্তিনকে আপাতত স্বীকৃতি না দিলেও, মধ্যপ্রাচ্যে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান নীতি বাস্তবায়নে ইসরায়েল যদি বাধা দেয় তাহলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবা।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বলেছেন, গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আরব ও মুসলিম দেশগুলোর নেতাদের ‘ফলপ্রসূ’ বৈঠক হয়েছে। বৈঠকের ফলাফল নিয়ে ট্রাম্পও ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। যদিও গাজা সিটিতে ইসরায়েল ক্রমাগত বোমাবর্ষণ করে চলেছে। সেখানে প্রতিদিন ডজন ডজন ফিলিস্তিনিকে হত্যা এবং হাজার হাজার মানুষকে জোরপূর্বক অজানা ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত বৈঠকের কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। বৈঠকে মিসর, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতারা অংশ নেন। ট্রাম্প এই বৈঠক সম্পর্কে বলেছেন, এ-ই সেই দল, যারা সমস্যার সমাধান করতে পারে। গতকাল বুধবার আমিরাতের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ডব্লিউএএম জানিয়েছে, বৈঠকের আলোচনার মূল বিষয় ছিল গাজার যুদ্ধ বন্ধ করে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা করা। এ ছাড়া গাজায় আটক জিম্মিদের মুক্তি ও তীব্র মানবিক সংকট মোকাবিলা করাও অগ্রাধিকারে ছিল।
এর আগে, মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে ফিলিস্তিন নিয়ে কথা বলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ সময় ট্রাম্প পশ্চিমা মিত্রদের ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার পদক্ষেপের বিরোধিতা করে এর নিন্দা জানান। তার মতে, এটি হামাসের সন্ত্রাসবাদকে পুরস্কৃত করার শামিল। তবে একই ভাষণে তিনি শান্তির কথা বলছিলেন। ট্রাম্প বলেন, আমাদের অবশ্যই গাজায় অবিলম্বে যুদ্ধ থামাতে হবে। আমাদের অবিলম্বে শান্তি আলোচনা শুরু করতে হবে। তিনি বলেন, একমাত্র জিম্মি মুক্তিই যুদ্ধ বন্ধের পথ খুলে দেবে। ট্রাম্পের এই বক্তব্যের বিষয়ে ফরাসি প্রেসিডেন্ট মাখোঁ বলেন, একমাত্র ট্রাম্পই এই যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখেন। নিউ ইয়র্ক থেকে ফ্রান্সের বিএফএম টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মাখোঁ বলেন, আমি একজন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে দেখছি, যিনি শান্তির কথা বলছেন। আজ সকালেও মঞ্চ থেকে তিনি বলেছেন : আমি শান্তি চাই, আমি সাতটি সংঘাতের সমাধান করেছি। পাশাপাশি তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার চান। কিন্তু এই সংঘাত বন্ধ করতে পারলেই কেবল নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া সম্ভব। যা তার পক্ষে সম্ভব।
মাখোঁর মতে, এ বিষয়ে একমাত্র ট্রাম্পই কিছু করতে পারেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প আমাদের চেয়েও বেশি কিছু করতে পারেন, কারণ আমরা গাজায় যুদ্ধ চালানোর মতো অস্ত্র সরবরাহ করি না। যুক্তরাষ্ট্রই ইসরায়েলকে এই যুদ্ধ জারি রাখার অস্ত্র সরবরাহ করে। কম্বোডিয়া, ইসরায়েল এবং পাকিস্তানের মতো কয়েকটি দেশ শান্তিচুক্তি বা যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা করার জন্য ট্রাম্পকে এই বার্ষিক পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছে। ট্রাম্পের দাবি, তার চারজন পূর্বসূরি আগে এই পুরস্কার পেলেও, এবার এটি তারই প্রাপ্য। হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র আনা কেলি ট্রাম্পের পক্ষ নিয়ে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জাতিসংঘে উপস্থিত সবার সম্মিলিত চেষ্টার চেয়েও শান্তির জন্য বেশি কাজ করেছেন। কেবল এই প্রেসিডেন্টই বিশ্ব স্থিতিশীলতার জন্য এত কিছু করতে পেরেছেন, কারণ তিনি সফলভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে আবার শক্তিশালী করেছেন।
এদিকে, ইসরায়েল দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানে বাধা দিলে কড়া পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছে জাপান। মঙ্গলবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে এ হুঁশিয়ারি দেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবা। ভাষণে ইশিবা বলেন, জাপান এখনো ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়নি, তবে এই স্বীকৃতি প্রদান সময়ের ব্যাপার মাত্র। জাপানের জনগণ দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে এবং উপযুক্ত সময়ে আমরা ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেব। সেই সঙ্গে আমি বলব, সম্প্রতি ইসরায়েলের জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তারা একাধিকবার দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করছেন এবং এতে জাপানের জনগণ খুবই ক্ষুব্ধ। ইশিবা আরও বলেন আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, ভবিষ্যতে যদি ইসরায়েল কখনো দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান বাস্তবায়নের পথে কোনো ধরনের বাধা দেয়, তাহলে তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে জাপান কিছু নতুন পদক্ষেপ নেবে এবং সেসব পদক্ষেপ হবে কঠোর। গত সোমবার ফিলিস্তিনকে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান এবং মধ্যপ্রাচ্যের আল আকসা অঞ্চলে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান নীতি বাস্তবায়নের দাবিতে বৈশ্বিক সম্মেলন করেছে ফ্রান্স এবং সৌদি আরব।
সেই সম্মেলনে এবং সম্মেলনের আগে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, পর্তুগালসহ বেশ কয়েকটি দেশ। জাপানও স্বীকৃতি দিতে প্রস্তুত ছিল, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তির কারণে শেষ পর্যায়ে পিছিয়ে আসে টোকিও। বর্তমানে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ৮০ শতাংশই ফিলিস্তিনকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।