ফেব্রুয়ারিতেই ভোটের কথা ট্রাম্পকে জানালেন ড. ইউনূস

বাংলাদেশের পরিস্থিতি, সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে জানতে চেয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাকে ফেব্রুয়ারিতেই ভোট হবে বলে অবহিত করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সেই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ঢাকা সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তিনি।

রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সম্মানে গত মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্টের দেওয়া নৈশভোজে তাদের মধ্যে এ কথোপকথন হয়। ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের প্রেস মিনিস্টার গোলাম মোর্তজা এ কথা জানিয়েছেন।

প্রেস মিনিস্টার জানান, বাংলাদেশের পরিস্থিতি, সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে জানতে চেয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফেব্রুয়ারিতেই ভোট বলে অবহিত করেছেন প্রধান উপদেষ্টা। এ সময় তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।

আয়োজন চলাকালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ছাড়া আরও কয়েকজন বিশ্বনেতার সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন ড. ইউনূস। তাদের মধ্যে ছিলেন স্পেনের রাজা ষষ্ঠ ফেলিপে, জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবা, জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে।

প্রধান উপদেষ্টা সংবর্ধনায় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সের্জিও গরের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন।

এদিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত মঙ্গলবার বিশ্ব সংস্থাটির সদর দপ্তরে একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নিয়েছেন। এসব বৈঠকে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কার্যক্রম, ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন এবং বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, রোহিঙ্গা ইস্যুসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন তিনি।

অধ্যাপক ইউনূস অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী, নেদারল্যান্ডসের রানী ম্যাক্সিমা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক, চিলির প্রাক্তন রাষ্ট্রপ্রধান ও উরুগুয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা, প্যারিসের মেয়র অ্যানে হিদালগোসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন প্রধান উপদেষ্টা।

আগামী নির্বাচন হবে গণতন্ত্রের নতুন ভিত্তি : প্যারিসের মেয়র অ্যানে হিদালগোর সঙ্গে এক বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন শুধু একটি নির্বাচন নয়, এটি দেশের গণতন্ত্রে একটি নতুন যুগের সূচনা করবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে একটি ভিত্তিমূলক ঘটনা হবে, যা দেশের গণতন্ত্রকে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে নেবে।

বৈঠকে উভয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, ক্রীড়া, সামাজিক উদ্যোগ এবং বিশ্বমানবিক সংকট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

সাক্ষাৎকালে দুই নেতা বাংলাদেশের আসন্ন সাধারণ নির্বাচন, অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে চলমান সংস্কার কার্যক্রম, ক্রীড়া ও অলিম্পিকে সামাজিক ব্যবসার সম্ভাবনা এবং বৈশ্বিক শরণার্থী সংকট, বিশেষ করে রোহিঙ্গা মানবিক সংকট সম্পর্কে ব্যাপক মতবিনিময় করেন।

অধ্যাপক ইউনূস প্যারিস ২০২৪ অলিম্পিককে সামাজিক ব্যবসায় উদ্যোগ রূপান্তর করতে নেতৃত্ব দেন। প্রধান উপদেষ্টা ভবিষ্যতে অনুষ্ঠিত সব অলিম্পিক, বিশেষত আসন্ন লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক কার্বন নিরপেক্ষ করার ওপর জোর দেন।

মেয়র হিদালগো এ সংকটময় সময়ে অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বে পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি আপনার নেতৃত্বকে গভীরভাবে সম্মান করি। আপনি অসাধারণ কাজ করেছেন এবং আপনার অঙ্গীকার মানবতার জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।’

উভয় নেতা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য তহবিল বৃদ্ধির জরুরি প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বিশেষ করে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে অবস্থিত শরণার্থীশিবিরে বসবাসরত এক মিলিয়নের বেশি মানুষের জীবনমান উন্নয়নের আহ্বান জানান। মেয়র হিদালগো আশা প্রকাশ করেন যে, একদিন রোহিঙ্গারা নিরাপদ ও মর্যাদাসহ তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে ফিরে যেতে পারবে।

অধ্যাপক ইউনূস উল্লেখ করেন, জাতিসংঘ আগামী সপ্তাহে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করছে, যার উদ্দেশ্য হলো বৈশ্বিক মনোযোগ পুনরুজ্জীবিত করা এবং এর একটি স্থায়ী সমাধান খোঁজা।

তিনি মেয়র হিদালগোকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের জন্য আন্তরিক আমন্ত্রণ জানান, যা দুই দেশের মধ্যে মানবিক ও সামাজিক ব্যবসায়িক সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করবে। বৈঠকে এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ উপস্থিত ছিলেন।

সিনিয়র বিশ্বনেতাদের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠক : জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলাপে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচন হবে স্বচ্ছ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য। তিনি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি আশা করেন।

প্রধানমন্ত্রী আলবানিজ অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির অবদানের প্রশংসা করেন এবং কয়েক বছর আগে ভাষাশহীদ দিবসের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার স্মৃতি তুলে ধরেন।

নেদারল্যান্ডসের রানী ম্যাক্সিমার সঙ্গে বৈঠকে তারা স্বাস্থ্যবীমা সম্প্রসারণ, জীবন ও স্বাস্থ্যবীমা, দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ও পেনশন ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেন। অধ্যাপক ইউনূস মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যসেবার জন্য ঋণ সহজলভ্য করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে গ্রামীণ নারীদের শীর্ষ চিকিৎসকদের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব দেন।

তিনি বৈশ্বিক ওষুধশিল্প পুনর্গঠনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘সামাজিক ব্যবসায় ওষুধ প্রস্তুতকারকরা উৎপাদিত টিকা সর্বদা সুলভ রাখবে।’

রানী ম্যাক্সিমাকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান অধ্যাপক ইউনূস। বৈঠকে প্রিন্সেস অব অরেঞ্জ রাজকুমারী কাথারিনা-আমালিয়াও উপস্থিত ছিলেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক ড. তেদ্রস আধানোম গেব্রিয়াসিসের সঙ্গে বৈঠকে অধ্যাপক ইউনূস যৌথ অগ্রাধিকার ও সাম্প্রতিক বৈশ্বিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করেন।

দিনের শেষপর্যায়ে তিনি ‘ফ্যাশন ফর ডেভেলপমেন্ট’ এবং সামাজিক উদ্ভাবনে সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতাবিষয়ক দুটি অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ : মঙ্গলবার নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা।

সাক্ষাৎকালে দুই নেতা বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে আলোচনা করেন। এর মধ্যে রয়েছে আগামী ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন, দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ, আর্থিক ও ব্যাংক খাতের সংস্কার, চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন, আঞ্চলিক অর্থনৈতিক একীকরণ এবং এশিয়া জুড়ে তরুণদের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক অংশগ্রহণ। তারা চুরি হয়ে যাওয়া কয়েক বিলিয়ন ডলার সম্পদ উদ্ধারের বিষয়েও কথা বলেন।

প্রেসিডেন্ট বাঙ্গা গত ১৪ মাসে অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বের প্রশংসা করেন এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন।

প্রতিক্রিয়ায় অধ্যাপক ইউনূস বিশ্বব্যাংকের অবিচল সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং এটিকে দেশের ইতিহাসের অন্যতম সংকটময় সময় হিসেবে বর্ণনা করেন।

প্রধান উপদেষ্টা চুরি হওয়া অর্থ উদ্ধারে এবং চট্টগ্রাম বন্দর সংস্কার ও আধুনিকায়নে বিশ্বব্যাংকের সহায়তা কামনা করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এর মাধ্যমে লাখো উৎপাদনমুখী কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার হবে।

‘চট্টগ্রাম বন্দর আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাবিকাঠি। আসুন, আমরা একসঙ্গে এগিয়ে যাই’ বলেন অধ্যাপক ইউনূস। তিনি আরও উল্লেখ করেন, স্থলবেষ্টিত নেপাল ও ভুটানসহ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যও আধুনিকায়িত বন্দরের সুবিধা ভোগ করবে।

প্রেসিডেন্ট বাঙ্গা আর্থিক ও ব্যাংক খাতে শক্তিশালী সংস্কারের গুরুত্বের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, টেকসই ও উচ্চ প্রবৃদ্ধিনির্ভর অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তি গড়তে এসব সংস্কার অপরিহার্য।

সাক্ষাতে আরও উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুতফে সিদ্দিকী এবং এসডিজি সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ।