দলীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকরা সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন। দলের ওপরমহল থেকে এ বিষয়ে তাদের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। আর গা ঢাকা দিয়ে কিংবা ঘরে বসে অলস সময় কাটাতে চাইছেন না তারা।
দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে দেশ রূপান্তরের এ প্রতিবেদকের কথা হয়েছে। তারা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে মনস্থির করেছেন কর্মী-সমর্থকরা। এরই অংশ হিসেবে প্রায় সারা দেশে ঝটিকা মিছিল বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন তারা। এর মাধ্যমে তারা হামলা-মামলা ও অত্যাচার-নির্যাতনের ভয় কাটিয়ে উঠতে চান।
নেতাকর্মীরা বলছেন, টানা ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট অনেকটা আকস্মিকভাবে সরকারের পতন ঘটলে দলের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ে। সারা দেশে নেতাকর্মীদের পরস্পরের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রায় সবাই নিজের বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র সরে যান। অনেকে রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরে আশ্রয় নেন। নিজেদের মধ্যে ছিন্ন হয়ে যাওয়া সেই সংযোগ এখন আবার ঝালাই করতে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নিজেদের ভেতরে যোগাযোগ বাড়ছে। এ যোগাযোগই আওয়ামী লীগে মনোবল ফিরিয়ে আনার উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এখনই মাঠের কর্মসূচিতে নামতে হবে কেন্দ্র থেকে এমন নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। মাঠে নামলে কর্মীদের ধরপাকড়, মামলা ও জেলে যাওয়া বেড়ে যেতে পারে, এদিকটি বিবেচনায় রেখেই কৌশল ঠিক করা হচ্ছে। আবার একেবারে বসে থাকলে কর্মী-সমর্থকরা অলস হয়ে পড়বেন, এমন আশঙ্কাও রয়েছে দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে। ফলে সুযোগ ও পরিস্থিতি বুঝে কেউ মাঠে নামতে চাইলে তাতে দলের ওপরমহল থেকে বাধাও দেওয়া হচ্ছে না।
আওয়ামী লীগের পালিয়ে থাকা একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তে আওয়ামী লীগ কাউকে মাঠে নামায়নি। কর্মী-সমর্থকরা নিজেদের ভেতরে যোগাযোগ স্থাপন করে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। তারা বলেন, এটাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির শক্তি। সময়ের চাহিদা আওয়ামী লীগকে মাঠে নামতে সাহস জোগাচ্ছে।
নেতাকর্মীরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের ওপর দমন-পীড়ননীতি অনুসরণ করলেও আওয়ামী লীগের তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকরা ভয়ের ঊর্ধ্বে উঠে আসতে চান। এ কারণে মনোবল ফিরিয়ে আনতে প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ঝটিকা মিছিল বের করার চেষ্টা আছে। আকস্মিক সিদ্ধান্তে পুরো রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে খন্ড খন্ড মিছিল করা হচ্ছে। আগের ১০-১৫ জনের অংশ নেওয়া মিছিলে এখন শতকর্মীর সমাগম হচ্ছে।
গতকাল বুধবারও ফার্মগেটসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ ঝটিকা মিছিল করেছে। একটি মিছিল থেকেই প্রায় ২৫০ স্থানীয় নেতাকর্মীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। এর বাইরে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অজয় কর খোকনসহ নেতৃস্থানীয় কয়েকজনকেও পুলিশ গতকাল গ্রেপ্তার করেছে।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এত কঠিন পরিস্থিতিতেও দলের কর্মী-সমর্থকরা নিজেদের কী হবে সেটা ভাবেনি। মাঠে নেমেছে জনগণের চাহিদা পূরণ করতে। দেশের জন্য কখন কী করতে হবে সেটি আওয়ামী লীগের একজন কর্মীও বোঝে। ফলে নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করেনি কর্মী-সমর্থকরা।’
আওয়ামী লীগের অন্তত চারজন কেন্দ্রীয় নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখন আওয়ামী লীগের যেসব কর্মসূচি চলছে, সেগুলো নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে ঠিক করে দেওয়া কর্মসূচি নয়। ভারতে অবস্থানরত দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার বিভিন্ন সময়ের অনলাইনে দেওয়া বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হয়ে কর্মী-সমর্থকরা এসব কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করছে। পুলিশের ধরপাকড়ের আশঙ্কার মধ্যেই মিছিল করার চেষ্টাকে এক ধরনের ‘অ্যাসিড টেস্ট’ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। সরকার কঠোর হলে সাময়িকভাবে ঝটিকা মিছিলের সংখ্যা কমে যেতে পারে, এমন আশঙ্কার কথাও বলছেন তারা। সরকারের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হলে আরও শক্ত কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামার ভাবনাও দলে আছে।
অন্যদিকে, আগামী ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সরকার যেকোনো উপায়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার কথা বলছে। এ ক্ষেত্রে শুধু আইনশৃঙ্খলা সংস্থাগুলোর ওপর নির্ভর না করে আওয়ামী লীগবিরোধী অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যের ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে। তারা নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। তাদের প্রতিহত করতে জনগণ এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।