জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে গত বুধবার নিউ ইয়র্কে এক গোলটেবিল আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে আরও বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এদিন তিনি ইতালি, পাকিস্তান, ফিনল্যান্ড ও কসোভোর সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
এসব বৈঠক বাংলাদেশের সঙ্গে চার দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে বলে উল্লেখ করেছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ এক্সিকিউটিভ বিজনেস গোলটেবিল আলোচনায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধান উপদেষ্টা সেখানে উপস্থিত মেটলাইফ, শেভরন ও এক্সেলেরেটসহ শীর্ষ মার্কিন কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ কাজে লাগানোর আহ্বান জানান।
‘অ্যাডভান্সিং রিফর্ম, রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড গ্রোথ’ শীর্ষক এ আলোচনার আয়োজন করে ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিল (ইউএসবিবিসি)।
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সফরে আসা বাংলাদেশের ছয়জন রাজনৈতিক নেতা সভায় উপস্থিত ছিলেন এবং তাদের মার্কিন শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।
চার বিশ্বনেতার সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠক : প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বুধবার নিউ ইয়র্কে ইতালি, পাকিস্তান, ফিনল্যান্ড ও কসোভো এ চার দেশের সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠক বাংলাদেশের সঙ্গে চার দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে বলে উল্লেখ করেছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
নিউ ইয়র্কে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে শফিকুল আলম বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা নিউ ইয়র্ক সফরের তৃতীয় দিনে চার বিশ্বনেতার সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেছেন। প্রতিটি বৈঠক খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং আমরা বলব যে, এ বৈঠকের মাধ্যমে আমাদের সম্পর্ক ওই দেশগুলোর সঙ্গে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।’
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে বুধবার সংস্থাটির সদর দপ্তরে প্রধান উপদেষ্টা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক করেন। দিনের শুরুতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একটি হোটেলে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। এর পাশাপাশি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ফাঁকে ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাবের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ ছাড়া জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ফাঁকে কসোভোর প্রেসিডেন্ট ভজোস্যা ওসমানির সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।
শফিকুল আলম বলেন, প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে অনুষ্ঠিত প্রতিটি বৈঠকে বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন সম্পর্কেও আলোচনা হয়। তিনি বলেন, ইতালির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে অধ্যাপক ইউনূস বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক বৃদ্ধি করতে অনুরোধ করলে তিনি ইতালি-বাংলাদেশ বিজনেস ফোরাম গঠনের প্রস্তাব দেন। ড. ইউনূস এ প্রস্তাবকে স্বাগত জানান এবং বলেন, দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা বিস্তারের বড় সম্ভাবনা রয়ে গেছে।
উভয় নেতা বৈঠকে বাংলাদেশের আসন্ন সাধারণ নির্বাচন, অভিবাসন চ্যালেঞ্জ, রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট এবং আগামী ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রী মেলোনির বাংলাদেশে সম্ভাব্য সফর নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
অভিবাসন বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী মেলোনি ইতালির পক্ষ থেকে ঢাকার সঙ্গে গঠনমূলকভাবে কাজ করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন, যাতে দুই দেশের জন্য নিরাপদ অভিবাসনের পথ নিশ্চিত করা যায়। তিনি মানব পাচারের বিরুদ্ধে শক্তিশালী ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা পুনর্ব্যক্ত করেন, যা ভূমধ্যসাগরে শত শত মানুষের প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দুই নেতা রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও গঠনমূলক আলোচনা করেন। অধ্যাপক ইউনূস বাংলাদেশে আশ্রয়প্রাপ্ত এক মিলিয়নেরও বেশি রোহিঙ্গার জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
প্রেস সচিব বলেন, কসোভা একটি ছোট দেশ হলেও এর অর্থনীতি ইউরোপে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৯০-এর দশকে এটি যুদ্ধবিধ্বস্ত ছিল, তবে গত দুই বছরে এটি ইউরোপের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির মধ্যে শীর্ষে রয়েছে।
নিউ ইয়র্কের একটি হোটেলে কসোভোর প্রেসিডেন্টের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে অভিবাসন, বাণিজ্য এবং পারস্পরিক বাণিজ্যিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং উভয় দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করতে প্রেসিডেন্ট ওসমানি বাংলাদেশ ও কসোভোর মধ্যে কয়েকটি বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তাব দেন। বিশেষভাবে তিনি বস্ত্র খাতে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির সুপারিশ করেন এবং এ খাতে সহযোগিতা ও পারস্পরিক সুফলের ব্যাপক সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন।
ড. ইউনূস প্রেসিডেন্ট ওসমানিকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান এবং ঢাকায় একটি কসোভো বাণিজ্য প্রতিনিধিদল পাঠানোর আহ্বান জানান, যাতে তারা অর্থনৈতিক সুযোগগুলো অনুসন্ধান করতে পারে। তিনি নিয়মিত যুব বিনিময় কর্মসূচির পক্ষে মত দেন, যা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করবে।
শফিকুল আলম বলেন, প্রধান উপদেষ্টার ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়। তিনি বলেন, ফিনল্যান্ড ও ইতালি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রতি তাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি আশা প্রকাশ করেছেন যে, তিনি আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সফর করবেন।
চারটি বৈঠকেই রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়। ইতালির প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার দেশ জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ৩০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিতব্য রোহিঙ্গাবিষয়ক সম্মেলনে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল পাঠাবে। বৈঠকে রোহিঙ্গাদের জন্য অর্থায়ন কীভাবে বৃদ্ধি করা যায়, তা নিয়েও আলোচনা হয়।
শফিকুল আলম বলেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা পাকিস্তানে সাম্প্রতিক বন্যায় প্রাণহানির প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন। এ ছাড়া বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা হয়। উভয় নেতা আলোচনা করেন যে, সম্প্রতি কয়েক বছরে সার্ক কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিকল্প উপায় অনুসন্ধান করা উচিত।
সার্ককে সক্রিয় করতে এবং আসিয়ানের সদস্য পদ পেতে কাজ করছে বাংলাদেশ : ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাবের সঙ্গে বৈঠকে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) পুনরুজ্জীবন এবং আসিয়ানের সদস্য পদ পেতে বাংলাদেশ সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশকে সার্ক ও আসিয়ানের মধ্যে একটি প্রধান সেতুবন্ধ হিসেবে দেখতে চাই। আসিয়ানের সঙ্গে সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনারশিপের জন্য আমাদের আবেদন পূর্ণ সদস্য পদের দিকে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।’
বৈঠকে দুই নেতা বাংলাদেশের আসন্ন সাধারণ নির্বাচন, জাতিসংঘ সংস্কার, রোহিঙ্গা সংকট, রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ, আসিয়ান সদস্য পদ প্রক্রিয়া, শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের বিচার এবং নেপাল ও ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ ব্যবহারসংক্রান্ত পদক্ষেপসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং জাতিসংঘ সংস্কারের জরুরি প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। ‘বিশ্বের রাজনৈতিক পরিম-ল পরিবর্তনশীল। জাতিসংঘকে শক্তিশালী করতে হবে’ প্রেসিডেন্ট স্টাব বলেন।
প্রধান উপদেষ্টা একমত পোষণ করে বলেন, জাতিসংঘ বিশ্বব্যাপী বড় সংকট মোকাবিলায় কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ‘বিশ্ব জুড়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে এবং জাতিসংঘ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে যথাযথ প্রভাব রাখতে সক্ষম হচ্ছে না’ তিনি উল্লেখ করেন।
উভয় নেতা দীর্ঘমেয়াদি রোহিঙ্গা সংকট ও বাংলাদেশে আশ্রয়প্রাপ্ত এক মিলিয়নেরও বেশি রোহিঙ্গার জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেন।