রাজনৈতিক কারণে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়নি

রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের কারণে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার। তার দাবি, এটি শুধু তার নয়, দেশের অধিকাংশ মানুষেরও অভিযোগ। গতকাল বৃহস্পতিবার গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন। বদিউল আলম বলেন, ‘স্থানীয় সরকারের ভোট কেন হলো না, এটা আমারও অভিযোগ। এটা এ দেশের অধিকাংশ মানুষের অভিযোগ। আমি নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ছিলাম। আমরা প্রথমে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করার প্রস্তাব করেছি। আমাদের জরিপেও দেখা গেছে, বেশির ভাগ মানুষ এই নির্বাচন চায়। আপনারা জানেন কেন তা হয় নাই। আমাদের জাতীয় নির্বাচন করতে হবে, এই নির্বাচন করলে জাতীয় নির্বাচন পিছিয়ে যাবে এ ধরনের অভিযোগ ছিল, যদিও তা সত্য নয়। শুধু তাই নয়, নির্বাচন কমিশনও বাধ সেধেছে। তারা বলেছে, আমরা স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে চিন্তা করতে চাই না। জাতীয় নির্বাচন নিয়ে কাজ করতে চাই।’

তিনি বলেন, এ নির্বাচন না হওয়ার পেছনে রাজনীতিবিদদেরও উদ্দেশ্য আছে। কারণ যারাই ক্ষমতায় আসবেন, পরে তারা স্থানীয় সরকার নির্বাচন করবেন। সেখানে অতীতে কী হয়েছে তা জানা। এসব কারণে দুর্ভাগ্যবশত বিষয়টি নিয়ে কথা বলাই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে। তিনি সোচ্চার ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের কথাগুলো বিরোধীদের উচ্চকণ্ঠের কাছে বিলীন হয়ে গেছে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর বলেন, ‘পুরনো রাজনৈতিক দলগুলো চায় নির্বাচন করে ক্ষমতায় যেতে। তাদের স্থানীয় জমিদারিটি আবার নতুন করে চালু করতে। বিকেন্দ্রীকরণ করতে রাজনৈতিক অর্থনীতি কোথায়? এ প্রশ্ন তোলা উচিত। বিকেন্দ্রীকরণ করার ইচ্ছাটি কোথায়? বর্তমান সরকার সেটিকে সহযোগিতা দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। ঐকমত্যের আলোচনায়ও বিষয়গুলো নেই।’

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আইনুন নিশাত বলেন, ‘গ্রামের কোনো স্কুলে বেঞ্চ লাগলে বরাদ্দ হয় কাবিটার টাকা। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেন সংসদ সদস্য। এখানেই তো দুর্নীতি হচ্ছে। সবখানেই সংসদ সদস্যের ভূমিকা আছে। এটা বন্ধ করতে হবে। সংসদ সদস্যের কাজ হচ্ছে নীতিনির্ধারণ করা, দেশ পরিচালনা করা।’

পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘গ্রামীণ কর্মসংস্থান স্থবির হয়ে পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনে আগামী দুই দশকে কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে। অথচ দেশের ৪৪ শতাংশ ব্যবসা ঢাকা-চট্টগ্রামে কেন্দ্রীভূত। স্থানীয় সরকারের বাজেট জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ছয় শতাংশ। শুধু কেন্দ্রভিত্তিক উন্নয়ন নয়, শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ও আর্থিক ক্ষমতায়ন ছাড়া সামনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব নয়।’

সেমিনারে মূল গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করে পিআরআইয়ের পরিচালক আহমেদ আহসান বলেন, ‘বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া বাংলাদেশ উন্নয়ন করতে পারবে কি না এমন প্রশ্ন আছে। আমাদের গবেষণা বলছে, না। বাংলাদেশের দীর্ঘকালীন টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয় বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া। স্থানীয় পর্যায়ে দায়বদ্ধতা না থাকলে সাধারণ মানুষের উপকার হবে না।’

তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিকভাবে আমরা অনেক পিছিয়ে পড়েছি শিক্ষার গুণগত মানে। আমাদের স্বাস্থ্যক্ষেত্রের দুরবস্থা, ডাক্তার নেই, নার্স নেই। যেসব দেশ বিগত তিন-চার দশকে বেশি উন্নয়ন করেছে, তাদের উন্নয়নের পেছনে বিকেন্দ্রীকরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।’

পিআরআইয়ের পরিচালক বলেন, ‘উন্নয়ন নিয়ে, দেশের মানুষের প্রয়োজন নিয়ে, হঠাৎ করে কর্ম থেকে নারীর উধাও হয়ে যাওয়া নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না। এসব নিয়ে আলোচনা হারিয়ে গেছে। আমরা কিছুটা সাংস্কৃতিক বিষয়, সাংবিধানিক বিষয়ে জড়িয়ে পড়েছি।’