হাজার কোটির ক্ষতি ২৩৩ কোটির স্তুতি

বেসরকারি খাতের মাধ্যমে সার আমদানিতে দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ায় সরকারের ২৩৩ কোটি ৬১ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়েছে বলে দাবি করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এ সাশ্রয় নিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুললেও অভিযোগ উঠেছে, কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তহীনতার কারণে সার আমদানিতে সরকারের প্রায় ২-৩ হাজার কোটি টাকার খরচ বাড়ছে। এ ক্ষতিকে ঢাকতে উল্টো সাশ্রয়ের বিষয়টিকে স্তুতি হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার কৃষি মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে একটি সংবাদ সম্মেলন করেন কৃষি ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। এ সময় উপস্থিত ছিলেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব এমদাদ উল্লাহ মিয়ানসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে ২৩৩ কোটি ৬১ লাখ টাকা সাশ্রয় করা হয়েছে। উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ‘সার আমদানির সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ায় সরকারের ২৩৩ কোটি ৬১ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়েছে। সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ-সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০০৯ হালনাগাদের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। পাটকলের অব্যবহৃত গুদামগুলো সার মজুদের জন্য ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

সিন্ডিকেট ভেঙে সার আমদানিতে সাশ্রয়ের বিষয়টি উল্লেখ করে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, ‘বেসরকারি খাতের আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাচ্ছি। আমরা জি টু জি পদ্ধতিতে আমদানি বাড়াচ্ছি। একটি টেন্ডার করেছিলাম। আগে যে নিয়ম ছিল, সর্বনিম্ন দরদাতাকে কার্যাদেশ দেওয়া হতো। আমাদের চাহিদা অনুযায়ী আমরা সেই দামে সার আমদানি করতাম। তবে এবার আমরা জি টু জি পদ্ধতিতে যে সার আমদানি করি, তা আন্তর্জাতিক দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি দাম নির্ধারণ করেছি। সেই দামের ভিত্তিতে আমরা সারের মূল্য নিয়ে আলোচনা করেছি। এই টেন্ডারে আমরা ৫ দশমিক ১৫ লাখ টন সার আমদানির কার্যাদেশ দিয়েছি। এই প্রক্রিয়ার কারণে আমরা একটি টেন্ডার থেকেই ২৩৩ কোটি টাকা সাশ্রয় করেছি।’

কৃষি মন্ত্রণালয় ও বেসরকারি আমদানিকারকদের সূত্রে জানা গেছে, সরকার প্রতিবছর নন-ইউরিয়া সার আমদানির জন্য এপ্রিল-মে মাসে টেন্ডার দেয়। গত বছরও মে মাসে এই টেন্ডার দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এ বছর টেন্ডার দেওয়া হয়েছে জুনের শেষ সপ্তাহে। ৯ দশমিক ৫ লাখ টনের টেন্ডারের বিপরীতে দুই ধাপে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে আগস্টের শেষে এবং সেপ্টেম্বরের শুরুতে। মাঝের দুই মাসের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাজারে নন-ইউরিয়া সারের দাম ব্যাপকভাবে বেড়েছে। তবে দেরিতে টেন্ডার দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ানোর কারণে সরকারের প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা বাড়তি খরচ হতে পারে।

চীনের ডিএপি সারের আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মার্চে ডিএপি সারের দাম ছিল টনপ্রতি ৬৩০-৬৩৫ মার্কিন ডলার। মে মাসে তা বেড়ে দাঁড়ায় টনপ্রতি ৬৭০-৬৯০ ডলারে। জুলাইয়ে দাম আরও বেড়ে টনপ্রতি ৭৯৮-৮০১ ডলারে পৌঁছায়। কৃষি মন্ত্রণালয় যখন আগস্টে চীনের ডিএপি আমদানির কার্যাদেশ দেয়, তখন দাম নির্ধারণ করা হয় টনপ্রতি ৮৪৮ মার্কিন ডলার। অর্থাৎ, মে মাসের তুলনায় কার্যাদেশ দেওয়া পর্যন্ত প্রতি টনে বাড়তি খরচ বেড়েছে অন্তত ১৭৮ মার্কিন ডলার। প্রথম টেন্ডারে কৃষি মন্ত্রণালয় ৩ লাখ ৩৫ হাজার টনের কার্যাদেশ দিয়েছে এই বাড়তি খরচে। শুধু ডিএপি সারের ক্ষেত্রেই সরকারের বাড়তি খরচ হচ্ছে ৭২৭ কোটি টাকার বেশি। ৯ দশমিক ৫ লাখ টনের মধ্যে ৫ দশমিক ১৫ লাখ টন ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি আমদানির কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। বাকি অংশ এখনো প্রক্রিয়াধীন।

একইভাবে, আন্তর্জাতিক বাজারে এ সময় টিএসপি ও এমওপি সারের দাম ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক বাজারের গতিবিধি বুঝতে না পারার কারণে সরকারকে বাড়তি খরচে সার আমদানি করতে হচ্ছে। ৯ দশমিক ৫ লাখ টন সার আমদানিতে বাড়তি খরচ হতে পারে ২-৩ হাজার কোটি টাকা। অথচ কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা শুধু সিন্ডিকেট ভাঙার দোহাই দিয়ে ২৩৩ কোটি টাকা সাশ্রয়ের স্তুতি শুরু করেছেন। আবার ৫ দশমিক ১৫ লাখ টন নন-ইউরিয়া সার আমদানির কার্যাদেশে এক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানকে ৪০ শতাংশের বেশি কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। আমিনুর রশিদ খান মানুনের বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, দেশ ট্রেডিংসহ যে প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে এত বড় কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ম লঙ্ঘন করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ২০১৫-২০১৬ সালে বিসিআইসির ইউরিয়া পরিবহনের সময় তা আত্মসাৎ করেছিল বলে সংস্থাটির তদন্তে প্রমাণিত হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে সরকারের ২৩৩ কোটি টাকার সাশ্রয়ের স্তুতি কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এদিকে, সংবাদ সম্মেলনে কৃষি উপদেষ্টা জানান, পূর্ববর্তী ফ্যাসিস্ট সরকারের রেখে যাওয়া ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি বকেয়া পরিশোধ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। বর্তমানে সারের কোনো সংকট নেই। সারের দামও বাড়েনি।

তবে মাঠের চিত্র ভিন্ন। কৃষকদের সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। অবশ্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, ‘সারের সংকট বা কমতি আছে, এই বিষয়টি ঠিক নয়। টাকা দিলে সার পাওয়া যায়, তাহলে সংকট থাকার কথা নয়। তবে আমাদের ব্যবস্থাপনায় কিছুটা সমস্যা আছে। যেমন : খুচরা বিক্রেতাদের ক্ষেত্রে দাম নিয়ে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। মৌসুমে যত সার প্রয়োজন, আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত তার সবটাই মজুদ আছে। তারপরও চলমান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সার আসছে। সারের কোনো সংকট নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘নতুন ডিলার নীতিমালা প্রায় চূড়ান্ত। এটি হলে খুচরা বিক্রেতা বলে কিছু থাকবে না। তখন ডিলাররাই সব বিক্রি করবেন। ডলারের সংকট দূর করতে আমরা ২০০ মিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি করেছি।’