পৃথিবীর পাঁচ ভাগের মাত্র দুইভাগ স্থল হলেও তাতে রয়েছে হাজার হাজার পশুপাখি, কীটপতঙ্গের অবাধ বিচরণ। তবে আমরা যতটুকু জানি বা দেখি তারচেয়েও ঢের বেশি কীটপতঙ্গের বিচরণ রয়েছে আমাদের দৃষ্টির বাইরে। যা আমাদের খালি চোখে ধরা পড়ে না বা দেখতে পাই না। এর কিছু আছে প্রকাশ্যে কিছু গাছগাছালির ছাল-বাকলের আবরণে, পরিত্যক্ত বিভিন্ন জড়ে এবং মাটির তলে। আকার ক্ষুদ্র ও বসবাসস্থল দৃষ্টিসীমার বাইরে থাকার কারণে আমরা জানিও না কত অদ্ভুত অদ্ভুত প্রাণী রয়েছে আমাদের চারপাশে। সে রকম অদ্ভুত একটি প্রাণী ‘পান্ডা অ্যান্ট’।
নামকরণ : অদ্ভুত এই প্রাণীর পান্ডা অ্যান্ট (চধহফধ অহঃ) নামে পরিচিত। এর বৈজ্ঞানিক নাম ঊঁংঢ়রহড়ষরধ সরষরঃধৎরং। এদের শরীরে পান্ডাদের মতো সাদা-কালো রঙের বাহার আছে বলে এদের পান্ডা বলা হয়। পান্ডা পিঁপড়েরা দেখতে ভারি সুন্দর মায়াবী। দেখলে একটু ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করবে খুব। কিন্তু সাবধান! এর হুল মারাত্মক বিষাক্ত।
পান্ডা পিঁপড়ের আরেক নাম ‘কাউকিলার’। একবার হুল ফুটিয়ে গরু কিংবা তার চেয়ে বড় আকারের প্রাণীর অবস্থা নাজেহাল করে দিতে পারে। তাই এদের এমন নাম। যদিও এরা আক্রমণাত্মক স্বভাবের নয়, তবে ঘাঁটালে ছেড়ে কথা বলে না। কিন্তু এদের নাম অ্যান্ট হলেও এরা পিঁপড়ে না। এরা মূলত বোলতা বা ভীমরুল গোত্রের প্রাণী।
আকার-আকৃতি : পান্ডা পিঁপড়েরা বেশি একটা বড় হয় না। এদের সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য আট মিলিমিটারের মতো। প্রাপ্তবয়স্কদের দৈর্ঘ্য প্রায় ১ থেকে ২ সেন্টিমিটার। তবে স্ত্রী পান্ডা অ্যান্টরা হুলসহ দৈর্ঘ্য মাত্র ৮ মিলিমিটার হয়ে থাকে। ১৯৩৮ সালে দক্ষিণ আমেরিকার চিলিতে প্রথম পান্ডা পিঁপড়েদের খোঁজ পাওয়া যায়। পরে অবশ্য গবেষণা করে জানা যায়, বালু ও ছোট নুড়িপাথর আছে এমন এলাকাতেও এদের অস্তিত্ব রয়েছে। শরীরে আছে পান্ডার মতো সাদা কালো মিশ্রণ, সাদা মাথার মাঝে কালো রঙের ছোট্ট চোখ। দেহের মাঝে কালো রঙের ওপর ছোপ ছোপ সাদা আর পেছনে রয়েছে সাদার ওপর কালো রঙের দাগ। পুরুষ ও স্ত্রী পান্ডা অ্যান্টের পার্থক্য রয়েছে নেই বললেই চলে। হঠাৎ দেখলে পার্থক্য করা খুব মুশকিল। পুরুষ পান্ডা অ্যান্টের পাখা থাকলেও স্ত্রী পান্ডা অ্যান্টের তা নেই। পুরুষরা আকারে বেশ বড় হয়। তবে স্ত্রী পান্ডা অ্যান্টরা বেশ হৃষ্টপুষ্ট হয়ে থাকে। সাদা-কালো রঙ শুধু তাদের স্ত্রী প্রজাতির মধ্যেই দেখা যায়।
স্ত্রী পান্ডা পিঁপড়ে উড়তে পারে না। ডানার বদলে তাদের রয়েছে লোমশ এবং ভয়ংকর এক হুল, যা ফোটালে প্রচ- ব্যথা অনুভূত হয়। তাই তো এদের কাউকিলার বলা হয়। পান্ডা অ্যান্টরা বাঁচে গড়ে দুই বছর।
বাসস্থান : পান্ডা পিঁপড়ে মূলত চিলি এবং আর্জেন্টিনার দেশগুলোর শুষ্ক অঞ্চলে বেড়ে ওঠে। চিলি ছাড়াও আমেরিকা ও মেক্সিকোর কিছু মরু অঞ্চলে পান্ডা পিঁপড়েদের দেখা মেলে। সাধারণত উষ্ণম-লীয় অঞ্চলের শুকনো মরুভূমি বা বালুকাময় পরিবেশ তাদের বাসস্থানের উপযুক্ত। তবে এরা মাটির গর্তে
থাকতেও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
খাবার : পান্ডা অ্যান্টের খাদ্য তালিকায় রয়েছে বিভিন্ন ফুলের নির্যাস। প্রাপ্তবয়স্ক পান্ডা পিঁপড়রা মিষ্টিজাতীয় খাবার খেতে পছন্দ করে। এদের প্রিয় খাবার ফুলের মধু। এ ছাড়াও পান্ডা পিঁপড়ের লার্ভা পরজীবী, প্রায়ই অন্যান্য পোকামাকড়ের লার্ভা খেয়ে থাকে।
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও প্রজনন : পুরুষ পান্ডা পিঁপড়ে এবং স্ত্রীদের রয়েছে আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য। পুরুষরা দিনের বেলা চলাফেরা করলেও স্ত্রী পিঁপড়েরা হাঁটাচলা করে রাতে। পুরুষ পান্ডা পিঁপড়েদের পাখা থাকলেও নেই হুল। হুল রয়েছে স্ত্রী পান্ডা পিঁপড়েদের। কেননা, ওই ভয়ংকর হুলই পরবর্তী সময়ে ডিম পাড়ার অঙ্গে পরিণত হয়। এরা অন্য পিঁপড়েদের মতো কলোনি তৈরি করে না, দলবেঁধেও চলে না বরং বোলতাদের মতোই একা একা থাকতে পছন্দ করে। তবে শুধু প্রজনন মৌসুমে সঙ্গীর প্রয়োজন হয়। এদের মিলনের সময় পুরুষ পান্ডা পিঁপড়ে স্ত্রীকে পিঠে নিয়ে উড়ে বেড়ায়। মিলন শেষে স্ত্রীকে মাটিতে নামিয়ে দেয়। স্ত্রী পিঁপড়ে প্রতিবারই দু’হাজার ডিম পাড়ে। সবচেয়ে মজার কথা হলো, স্ত্রী পিঁপড়ের যখন ডিম পাড়ার সময় হয় তখন ভিন্ন প্রজাতির পিঁপড়েদের বা কীট-পোকাদের বাসায় ডিম পাড়ে। যাতে সদ্য জন্ম নেওয়া পান্ডা পিঁপড়ের বাচ্চারা ওই কীট-পোকামাকড়দের খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে।
পান্ডা পিঁপড়েরা ঢের বেশি ডিম দিলেও জীবনকাল কেবল দু’বছর হওয়ায় ও বন জঙ্গল ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় দিন দিন এই সুন্দর ও মায়াবী প্রাণীর সংখ্যা কমেই চলেছে।
লেখক : শিশুসাহিত্যিক, শিক্ষক, গ্লোবাল কিডস হ্যাভেন ক্যাডেট মাদ্রাসা ও মাদ্রাসা ইলমে নববী (স.)