চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচন দীর্ঘ ৩৫ বছর পরে আগামী ১৫ অক্টোবর। চবিয়ানদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের প্রধান প্ল্যাটফর্ম চাকসু। এখান থেকেই যুগে যুগে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী দেশের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং সাধারণ মানুষকে পথ দেখিয়েছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে মাত্র ৬ বার চাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন শিক্ষার্থীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল চাকসু নির্বাচন। শিক্ষার্থী হিসেবে এটিকে নিজের ন্যায্য অধিকার হিসেবেই দেখেন তারা। ইতিমধ্যেই চাকসুর তফসিল ঘোষণা, চূড়ান্ত ভোটার তালিকা ও মনোনয়নপত্র জমাদানসহ অধিকাংশ কার্যক্রম শেষ হয়েছে। প্রার্থীরা ভোট পেতে প্রচারণা চালাচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংলাপ করছেন এবং তাদের চাওয়া-পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইছেন প্রার্থীরা। প্রশ্ন উঠতে পারে, আদৌ কি সাধারণ শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে পারবে চাকসু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আসা ছাত্র প্রতিনিধিরা? এই নির্বাচন কোনো রাজনৈতিক দলের ক্ষমতাকাঠামো আরও শক্তপোক্ত করবে, নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু করবে শিক্ষা ও গবেষণার সুস্থ পরিবেশ এবং সহাবস্থানের সংস্কৃতি।
চাকসু নির্বাচন যেন কোনো দলীয় গোষ্ঠীকে সুবিধা না দেয়, বরং তা যেন হয় শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব বিকাশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর শিক্ষার্থীরা এমন নির্বাচন পেতে যাচ্ছে বলে তাদের কৌতূহলের জায়গা এই চাকসু নির্বাচন। দলমত নির্বিশেষে সবার মাঝে নির্বাচনকে ঘিরে অধীর আগ্রহ ও উচ্ছ্বাস। কারোর মাঝেই আগ্রহের কমতি নেই। বলতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের সবাই বহুল আকাক্সিক্ষত এই চাকসু নির্বাচনকে নিয়ে সরব। চাকসু নির্বাচনের ধারাবাহিকতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর শিক্ষক রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাব কিছুটা হলেও কমাবে। শিক্ষার্থীরা তাদের ন্যায্য অধিকার বুঝে পাবে।
শিক্ষার্থীদের এই আকাক্সক্ষার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটবে যদি নির্বাচিত প্রার্থীরা শিক্ষার্থীদের ম্যান্ডেট বুঝে কাজ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কখনোই অযোগ্য কাউকে এই দায়িত্বে বসাতে চাইবে না। কেননা ভোটার হিসেবে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত থাকলেও বছরজুড়ে মূল ভূমিকাটা পালন করে যাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চাওয়া পাওয়া অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়েও বেশি। ঢাবি, রাবি, জাবি প্রভৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকেও বেশি চবির আয়তন। অথচ এই তেইশশ একর বিশাল আয়তনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থীর ঠাঁই মেলে না। ক্যাম্পাসে আবাসিক হলের সংখ্যা অপ্রতুল। এই সমস্যার একটি সুষ্ঠু সমাধান করবে চাকসু নেতৃত্ব সেটাই প্রত্যাশা।
যাতায়াতের ভোগান্তি চবিয়ানদের নিত্যসঙ্গী। শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম শাটল ট্রেন। বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকে চবি ক্যাম্পাসের দূরত্ব ২২ কিলোমিটার। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ক্যাম্পাসে ক্লাস করতে আসে প্রায় ১৬ হাজার শিক্ষার্থী। প্রতিদিন শহরে টিউশন করতে গিয়ে প্রায় ৭ ঘণ্টা সময় জীবন থেকে হারাতে হয় এই ক্যাম্পাসের একজন শিক্ষার্থীকে। শাটল ট্রেন শিক্ষার্থীদের গৌরবের কারণ হলেও নিয়মিত শিডিউল বিপর্যয় ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবুও এই ক্যাম্পাসের স্বপ্নবাজরা দমে যায় না।
বিগত এক বছর ধরে এই ক্যাম্পাসে অর্ধশতাধিক বিক্ষোভ হয়েছে কেবল আবাসন সংকট নিয়ে। শিক্ষার্থীদের চাওয়া আবাসন সংকট মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নিতে এগিয়ে আসবে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। স্বপ্নবাজ শিক্ষার্থীদের স্বপ্নকে জাগ্রত করতে প্রতিনিধিরা দুর্ভোগ কমাবে এই যাতায়াতের। বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেলের আধুনিকায়ন করতে সৃজনশীল কাঠামো সৃষ্টি করবে আকাক্সিক্ষত চাকসুর প্রতিনিধিরা। আরও অনেক বেশি চাওয়া-পাওয়া আছে এই ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের। তবে এগুলোর সমাধানও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে করতে হলেও অসম্ভবের কিছু নই। প্রয়োজন কেবল সদিচ্ছা, যোগ্যতা ও ব্যক্তিস্বার্থ বিসর্জন দিয়ে সম্মিলিত স্বার্থকে সমুন্নত রাখার মানসিকতা। তবেই পূরণ হবে শিক্ষার্থীদের ম্যান্ডেট।
হলগুলোতে পানি সংকট মাঝে মাঝেই প্রবল আকার ধারণ করে। ক্যান্টিনের খাবারের মানও তেমন উন্নত ও পুষ্টিকর নয়। অথচ এই ব্যাপারগুলো পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের নেই কোনো ব্যবস্থা। ডাকসু নেতৃত্ব পানি সংকটের সমাধান ও খাবারের মানোন্নয়নে কার্যকর ব্যবস্থা নেবেন তেমনই প্রত্যাশা শিক্ষার্থীদের।
চাকসু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ২৮ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য একটি সম্মিলিত কণ্ঠস্বর পাবো। ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন পূরণে এক যোগ্য নেতৃত্ব তখন আমাদের সামনে এসে দাঁড়াবে। দেশের সংকটময় পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যে কৃতিত্ব সেটিকে কেউ অস্বীকার করতে পারে না। ফ্যাসিস্ট সরকার পতনেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল চবিয়ানরা। আসন্ন নির্বাচনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন ও সুষ্ঠু অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য চাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে প্রত্যাশা।
মাহমুদ ইমন
শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় বর্ষ
ইতিহাস বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়