উত্তরবঙ্গের তিস্তা নদীবিধৌত এলাকা নীলফামারীর ডিমলা উপজেলা। এখানেই রয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় সেচ প্রকল্প তিস্তা সেচ প্রকল্প। এর মূল অংশ হলো তিস্তা ব্যারাজ। এই উপজেলার সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে তিস্তার পানি বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এই প্রকল্পটি নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও দিনাজপুরের ৫ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা দেয়। তিস্তা নদী শুধু কৃষির প্রাণ নয়, লাখো মানুষের জীবন-জীবিকার উৎস। এই নদীর পাড়েই গড়ে উঠেছে অসংখ্য বসতবাড়ি এবং বন্যানিয়ন্ত্রণের জন্য বাঁধ। কিন্তু উত্তরবঙ্গের প্রাণখ্যাত তিস্তা এখন এক ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ডিমলার সীমান্তবর্তী এলাকায় চলছে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের মহোৎসব। প্রভাবশালী চক্রের মদদে শত শত ইঞ্জিনচালিত নৌকা ব্যবহার করে নদী থেকে অবাধে তুলে নেওয়া হচ্ছে হাজার হাজার ঘনফুট পাথর। এর ফলে একদিকে যেমন নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি ভাঙনের কবলে পড়ে ভিটেমাটি হারাচ্ছে হাজার হাজার মানুষ।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, প্রতিদিন উপজেলার বাইশপুকুর, চরখড়িবাড়ি, একতা বাজার, তেলির বাজার, তিস্তাবাজার, কালীগঞ্জ ও ছোটখাতা গ্রোয়েন বাঁধসহ অন্তত ১৫-২০টি স্থানে চলছে পাথর উত্তোলন। নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে পাথর-বালু উত্তোলনে তিস্তার গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে। নদীর পাড়, ফসলি জমি, বসতভিটা ভাঙনের কবলে পড়ছে। এ ছাড়া শত শত ট্রলি দিয়ে নদীর পাড় থেকে পাথর পরিবহন করায় তিস্তার ডানতীর প্রধান বাঁধ ও গ্রামীণ রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।
স্থানীয় মো. আজগর বলেন, শ্যালো ইঞ্জিনচালিত নৌকায় লোহার তৈরি যন্ত্র দিয়ে নদীর তলদেশে গভীর গর্ত করে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। তিস্তা ব্যারাজের অদূরে তিস্তাবাজার, তেলির বাজার, চরখড়িবাড়ি, বাইশপুকুর, কালীগঞ্জ, ভেন্ডাবাড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় পাথর উত্তোলনে ১৫টি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় রয়েছে। পাথর উত্তোলনে শত শত ইঞ্জিনচালিত নৌকা ব্যবহার করা হচ্ছে। নৌকা চলন্ত অবস্থায় শ্যালো ইঞ্জিনচালিত পাখা দিয়ে নদীর তলদেশের বালু সরিয়ে পাথর তুলে আনা হয়। উত্তোলিত পাথর স্থানীয় কয়েকটি সিন্ডিকেট কিনে নিয়ে জমজমাট ব্যবসা করে আসছে।
স্থানীয় কৃষক হাফিজুল ইসলাম ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘সারা দিন ইঞ্জিনের শব্দে টিকে থাকা দায়। পাথর তুলতে তুলতে নদীর পাড় ভেঙে পড়ছে। আমাদের ফসলি জমি আর ভিটেমাটি নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বেড়িবাঁধ ভেঙে গেলে এলাকার হাজার হাজার পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাবে।’
একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালে উপজেলার ৩৯টি ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান সরকারের কাছে পাথর উত্তোলনের আবেদন করেছিল। কিন্তু তাদের অনুমতি দেওয়া হয়নি। পরে তারা তিস্তা নদীর নুড়ি পাথর উত্তোলনের অনুমতির দাবি করে ইউএনও ও জেলা প্রশাসকের কাছে আবার আবেদন করে। নুড়ি পাথর উত্তোলনের অনুমতি পেলে তারা সরকারি খাসজমি ও তাদের নিজস্ব মালিকানা জমি থেকে বোমা মেশিনের মাধ্যমে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন শুরু করে। এ ঘটনায় এলাকাবাসী অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন বন্ধের দাবিতে দফায় দফায় মানববন্ধন ও উচ্চ আদালতে আবেদন করলে প্রশাসন পাথর উত্তোলন বন্ধ করে দেয়। কিন্তু প্রশাসন পাথর উত্তোলন বন্ধ ঘোষণা করলে থামেননি পাথর উত্তোলনকারীরা। তারা একইভাবে দিন-রাত পাথর উত্তোলন করে চলছেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, পাথরবোঝাই ভারী ট্রাক্টর চলাচলের কারণে বন্যানিয়ন্ত্রণ ডানতীর প্রধান বাঁধ ও স্থানীয় সড়ক চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত চলে পাথর পরিবহন, যা নদীর পাড় থেকে সঠিবাড়ি বাজার, ডালিয়া বাজার সড়কের ধারে স্তূপ করে রাখা হয়। সেখান থেকে রাতারাতি পাথর বিক্রি করা হচ্ছে। অন্যদিকে অবৈধভাবে পাথর-বালু উত্তোলন করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে চক্রটি।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন, প্রশাসনের অভিযান সত্ত্বেও কেন কিছুদিন পরই সেই নৌকাগুলো আবার গর্জন তুলে নদীর বুক খুঁড়তে শুরু করে? তিস্তাপাড়ের মানুষ আজ এক অনিশ্চয়তার স্রোতে ভাসছে। প্রতিদিন তাদের ভিটেমাটি একটু একটু করে নদীতে হারিয়ে যাচ্ছে। তিস্তাপাড়ের মানুষের ভবিষ্যৎ কী? নদীভাঙনের ফলে তাদের কি উদ্বাস্তুতে পরিণত হতে হবে?
এ ব্যাপারে গত ২৩ সেপ্টেম্বর কথা হয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘তিস্তা নদীতে কোনো পাথর বা বালুমহাল নেই। এ ছাড়া নদী থেকে পাথর-বালু উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে। নদী থেকে বালু-পাথর উত্তোলনের বিষয়টি দেখার দায়িত্ব প্রশাসনের। অন্যদিকে বাঁধসহ বিভিন্ন অবকাঠামো রয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের। এসবের ক্ষতি হলে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।’
প্রভাবশালী চক্রের মদদে শত শত ইঞ্জিনচালিত নৌকা ব্যবহার করে তিস্তা নদী থেকে অবাধে পাথর উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমরানুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নদী বা মাটির তলদেশ থেকে পাথর ও বালু উত্তোলনের আইনগতভাবে কোনো সুযোগ নেই। এটি একটি দ-নীয় অপরাধ। এ ব্যাপারে অভিযোগ পেলেই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জেল-জরিমানা করা হচ্ছে।’