কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে জরাজীর্ণ ‘দেয়াঙ কিল্লা’

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নের বন্দর গ্রামে একটি ছোট টিলা আছে। টিলাটির নাম কিল্লা পাহাড়। হেঁটে উপরে উঠতে পাঁচ মিনিটের মতো সময় লাগে। টিলার চূড়ায় গেলে দেখা যায়, কয়েক শ বছরের পুরনো একটি জরাজীর্ণ ভবন। এ ভবনটির নাম দেয়াঙ কিল্লা। এটি দেশের প্রথম জাহাজ নিয়ন্ত্রণ কার্যালয় হিসেবে পরিচিত। আজ থেকে সাড়ে ৩০০ বছর আগে আরাকানিদের হারিয়ে মোগলরা প্রথম এই নিয়ন্ত্রণ কার্যালয় তৈরি করে। পরে ইংরেজরা এটি ব্যবহার করে চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ন্ত্রণ করত। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার কর্ণফুলী নদীর মোহনায় দাঁড়িয়ে থাকা দেয়াঙ কিল্লা ইতিহাসের এক জীবন্ত নিদর্শন।

বন্দর গ্রামের বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা প্রাচীন বন্দরের বাসিন্দা, এটি ভাবতে গর্ব হয়। কিন্তু বর্তমানে মোগল রাজত্বকালের স্মৃতিচিহ্ন কিল্লা পাহাড়ের চাটিগাঁ দুর্গ, বাতিঘর ও পতাকাস্তম্ভ ধ্বংসের পথে। এটি সংরক্ষণ করা গেলে দেশ-বিদেশের মানুষ অনেক কিছু জানতে পারত।’

ঐতিহাসিকদের মতে, ১৭৬১ সালে চট্টগ্রামের শাসন চলে যায় ইংরেজদের হাতে। তখন মোগল শাসনামলের প্রশাসনিক ব্যবস্থার পরিবর্তন শুরু হয়। একপর্যায়ে মোগল যোদ্ধারা চাকরিচ্যুত হয়। কিন্তু তারা সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকে। সেই মোগল সৈনিকের বংশধররাই আজকের বন্দর গ্রামের অধিবাসী। স্থানীয়ভাবে তারা খোট্টা নামেই পরিচিত।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, প্রায় ৫০০ বছর আগে দেয়াঙ পাহাড়ের কিল্লায় বাণিজ্য কুটির স্থাপন করে পর্তুগিজরা। ওই কুটিরকে কেন্দ্র করে ‘বাংলা বন্দর’ বা পোর্ট টু গ্রান্ডে শহরের পত্তন হয়েছিল। সে সময় পাহাড়ের সুউচ্চ চূড়ায় তৈরি করা হয় বাতিঘর ও পতাকাস্তম্ভ। ১৫৩৭ থেকে ১৬৬৬ সাল পর্যন্ত আরাকানিদের দখলে ছিল চট্টগ্রাম। এ সময় পর্তুগিজরা আরাকান রাজাকে কর দিয়ে বন্দর পরিচালনা করত। আরাকানি আমলে সেই বাতিঘর ও পতাকাস্তম্ভকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠা করা হয় চাটিগাঁ দুর্গ।

আর এটিই ছিল আরাকানিদের চট্টগ্রামের প্রশাসনিক কেন্দ্র। সাগর পথে শত্রুদের আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য এই দুর্গ নির্মাণ করা হয়েছিল। লাল, নীল চাটি-আলোর সংকেতের মাধ্যমে গভীর সমুদ্রে ভাসমান জাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে বন্দরে ভিড়ার অনুমতি দেওয়া হতো। পরে এই দুর্গ মোগল ও ইংরেজ শাসনামলে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

১৬৬৬ সালের ২৭ জানুয়ারি মোগল সেনাবাহিনী চট্টগ্রাম আক্রমণ করে এবং আরাকানিদের সঙ্গে তীব্র নৌযুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে দেয়াঙ কিল্লার চাটিগাঁ দুর্গ ছিল সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দু। অবশেষে মোগলদের বিজয়ে আরাকানি অস্ত্রাগার ও জনপদ ধ্বংস হয়ে যায়।

চট্টগ্রাম বিজয়ের পর আরাকানিদের যেকোনো মুহূর্তে আক্রমণ সম্ভাবনায় বন্দরের স্থান অন্যত্র সরিয়ে নেয় মোগলরা। কর্ণফুলী নদীর উজানের দিকে ওই স্থানের নামকরণ করা হয় ‘সদরঘাট’। সেখানেই নতুনভাবে জাহাজ ভিড়ানো ও বন্দরের কার্যক্রম শুরু হয়। তবে শত্রু প্রতিরোধের জন্য কিল্লা পাহাড়ের চূড়ায় একটি নতুন পাকা ভবন নির্মাণ করা হয়। সেই ভবন থেকেই সাগর পথে চলাচলকারী জাহাজ ও বহির্নোঙরে নৌযান চলাচল পর্যবেক্ষণ করা হতো।

ঐতিহাসিক শিহাবুদ্দিন তালিশ রচিত ‘ফতিয়াই ইব্রিয়া’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ-পূর্ব তীরবর্তী মোহনায় দেয়াঙ পাহাড়ে চাটিগাঁ দুর্গ আরাকানিদের প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল। ১৭৬১ সালে চট্টগ্রাম ইংরেজ শাসনের অধীনে চলে গেলে দেয়াঙ কিল্লার গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায়। মোগল রাজত্বকালে প্রাচীন স্থাপত্যে নির্মিত এই ভবন পুনঃসংস্কার করা হয়। এটি চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হতে থাকে। পরে পাকিস্তান আমল ও দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দেয়াঙ কিল্লা বা পর্যবেক্ষণ টাওয়ারটি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অধীনে ব্যবহৃত হয়।

ঐতিহাসিক পূর্ণচন্দ্র চৌধুরীর ‘চট্টগ্রামের ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, ‘পাহাড় চূড়ায় সারিবদ্ধ চাটি (প্রদীপ) জ্বালিয়ে দেওয়া হতো। গভীর সমুদ্রে চলাচলকারী জাহাজ থেকে চাটির আলো দেখা যেত। সেই চাটি থেকেই চাটিগ্রাম বা চাটিগাঁ, ক্রমে চট্টগ্রাম নামকরণ হয়েছে।’

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বর্তমানে দেয়াঙ কিল্লার কাছেই গড়ে উঠেছে বিভিন্ন শিল্পকারখানা। এর মধ্যে কোরিয়ান ইপিজেড, কর্ণফুলী ড্রাইডক, চট্টগ্রাম সার কারখানা, কর্ণফুলী সার কারখানা অন্যতম। দীর্ঘদিনের অযত্ন-অবহেলার কারণে দেয়াঙ কিল্লার ভবন জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। কক্ষ ও সিঁড়ির প্রবেশদ্বার অনেকটা ভেঙে পড়েছে। ভবনটির উপরিভাগ আগাছায় ছেঁয়ে গেছে। দ্বিতীয় তলার কক্ষের মেঝেতে পতাকার একটি স্তম্ভের কাটা অংশ দেখে বোঝা যায়, এখানে একসময় পতাকার স্তম্ভও ছিল।

আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার বলেন, ‘ভবনটি ঐতিহাসিক একটি নিদর্শন। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে এটি সংরক্ষণ করার চিন্তা রয়েছে।’

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুক বলেন, ‘দেয়াঙ কিল্লার ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। ভবিষ্যতে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের সমন্বয়ে এটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।’