নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা আর সুপারিশমুখর, নখদন্তহীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন দেখতে চান না। পাশাপাশি, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রায় এক বছর ধরে মানবাধিকার কমিশনকে অকার্যকর রাখার তীব্র সমালোচনা করেছেন তারা। গতকাল শনিবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে ‘খসড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ শীর্ষক নাগরিক সংলাপের আয়োজন করে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ। বক্তারা অধ্যাদেশের ওপর আলোচনা করে এর অসংগতি ও আপত্তি তুলে ধরে বিভিন্ন সুপারিশ পেশ করেন। অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা ছিল ‘বাংলাদেশ রিফর্ম ওয়াচ’।
বৈষম্যবিরোধী সরকার এক বছরেও কেন একটি কার্যকর মানবাধিকার কমিশন গঠন করতে পারেনি, এ প্রশ্ন রাখেন প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে মাঝেমধ্যে অন্তরীণ সরকার মনে হয়। এই সরকারের কাছে আমাদের অনেক প্রত্যাশা ছিল। কেন সেই প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না, তা বোধগম্য নয়। মানবাধিকার কমিশন গঠন না করার পেছনে চাপের কথা বলা হচ্ছে। কী এমন চাপ যে এত বড় একটি সরকারের তা সহ্য করার ক্ষমতা নেই?’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা একটি মানবাধিকার কমিশন চেয়েছিলাম বলে অতীতে নখদন্তহীন কমিশন উপহার দেওয়া হয়েছে, যার দাঁত নেই, কামড়াতেও পারে না, যার কোনো দক্ষতা বা কার্যকারিতা নেই।’
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘কমিশনে মেরুদণ্ডহীন ভালো মানুষ বসিয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ, মেরুদণ্ডহীন ভালো মানুষ কখনো অন্যের জন্য নিজের মেরুদণ্ড সোজা করতে পারে না।’
অনুষ্ঠানে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কোনোভাবেই মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত হবে না।’
তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরেও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কেন কার্যকর হলো না, তার সঠিক জবাব সরকারকে দিতে হবে।’
খসড়া অধ্যাদেশের ওপর আলোকপাত করে তিনি বলেন, ‘অতীতে ডিজিএফআইসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী গোয়েন্দা ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা এবং সেনাবাহিনীকে কমিশনের আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘আমরা মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা চাই। সেই সঙ্গে তাদের জবাবদিহিও চাই। প্রতিবছর রাষ্ট্রপতির কাছে কমিশন যে প্রতিবেদন দেয়, তা ছবিসর্বস্ব। দুদক সংস্কার কমিশনে জবাবদিহির যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তার ভিত্তিতে মানবাধিকার কমিশনেরও জবাবদিহি থাকা উচিত।’
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সম্পর্কে আমাদের প্রত্যাশা বিশাল। কিন্তু বিশ্ব জুড়ে কমিশনের তিন ধরনের কাজ থাকে: সুপারিশ, তদন্ত এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা। এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রত্যাশা বেশি মনে হচ্ছে। এটি কমাতে হবে।’
নিকট ভবিষ্যতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ হলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সরকারের সময় তা গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিয়ে খসড়া অধ্যাদেশটি অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়নি বলে উল্লেখ করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন। এছাড়া, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তদন্তে ৬ মাস সময়কে খুব বেশি বলে মনে করেন তিনি। ৭ বছর আগে আলোচিত শহীদুল আলমের গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, তখন তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে এবং মিথ্যা মামলা ও নির্যাতনের বিষয়টি উল্লেখ করে তার স্ত্রী মানবাধিকার কমিশনে চিঠি দিয়েছিলেন। কিন্তু সেখান থেকে জানানো হয়, এ বিষয়ে শুধু সুপারিশ করা হয়েছে।
ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, ‘আমরা আসলে কেমন মানবাধিকার কমিশন চাই, তা নির্ধারণ করতে হবে। এটি যেন পুনর্বাসন কেন্দ্র বা হাজার হাজার কর্মশালার কমিশন না হয়।’
দ্বৈত নাগরিকত্বধারী কাউকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে নিয়োগ দেওয়া সমীচীন হবে না বলে মন্তব্য করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। খসড়া অধ্যাদেশের বিভিন্ন অসংগতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে কিছু নেই। ঘটনার তদন্তে ৬ মাস অনেক বেশি সময়। শুনানির কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। তদন্ত দলের কোনো যোগ্যতা বা পটভূমি উল্লেখ নেই। কমিশন নিজস্ব জনবল দিয়ে কীভাবে কাজ করবে, তা নিয়েও কিছু বলা নেই। আর্থিক স্বাধীনতাও নেই। সরকার যা দেবে, তাই দিয়ে কাজ করতে হবে। তাহলে কমিশন কীভাবে স্বাধীনভাবে কাজ করবে? এসব বিষয়ের সমাধান করতে হবে।’
আওয়ামী লীগ আমলে গুম হওয়া বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন ও ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, ‘ভাইয়ের খোঁজে ২০১৪ সাল থেকে মানবাধিকার কমিশনে আমরা ২৫টি চিঠি দিয়েছি। কিন্তু তাদের কিছু করার সুযোগ নেই।’
তিনি বলেন, ‘মানবাধিকার কমিশন গঠনে একটি মহলের চাপ রয়ে গেছে। এই সরকারের আমলেও সেই চাপ থেকে বেরিয়ে আসা যায়নি।’
নাগরিক সংলাপে আরও বক্তব্য রাখেন গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী শাহীন আনাম, নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মতিউর রহমান আকন্দ, সিএসআইডির নির্বাহী পরিচালক খন্দকার জহুরুল আলম, চাকমা সার্কেলের প্রধান রানী ইয়ান ইয়ান, নারী অধিকারকর্মী ও ‘নারী অঙ্গন’-এর সম্পাদক নাদিরা ইয়াসমিন, নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সদস্য কল্পনা আক্তার প্রমুখ।