ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের কারুর জেলায় তামিলাগা ভেত্তরি কাঘাজাম (টিভিকে) দলের প্রধান ও জনপ্রিয় অভিনেতা-রাজনীতিক থালাপতি বিজয়ের একটি রাজনৈতিক সমাবেশে পদদলনের ঘটনায় শিশুসহ অন্তত ৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনায় আরও প্রায় অর্ধশত আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন।
এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুসারে, থালাপতি বিজয়ের বক্তৃতা শোনার জন্য কারুর জেলার ওই সমাবেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ সমবেত হয়েছিলেন। কর্র্তৃপক্ষের প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী, সমাবেশে প্রায় ত্রিশ হাজারের বেশি মানুষ উপস্থিত ছিলেন। সমাবেশের একপর্যায়ে ভিড় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, যার ফলে পদদলনের এই দুর্ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা গেছে, হঠাৎ ভিড়ের ঢল বেড়ে যাওয়ায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ভিড়ের অসহনীয় চাপে অনেকে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যান, যার মধ্যে শিশু এবং বয়স্ক ব্যক্তিরাও ছিলেন। এই চাপের কারণে বহু মানুষ জ্ঞান হারান এবং পদদলিত হয়ে প্রাণ হারান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়াকে (পিটিআই) জানিয়েছেন, সমাবেশস্থলে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাপনার ঘাটতি ছিল। ভিড়ের চাপে অনেকে পায়ের ওপর দাঁড়াতে না পেরে পড়ে যান এবং পরে আতঙ্কিত জনতার ছুটাছুটির কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।
ঘটনার সময় থালাপতি বিজয় প্রচার বাসের ছাদে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার সংকেত পাওয়া মাত্র তিনি বক্তৃতা থামিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। তিনি ভিড়ের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে পড়া মানুষদের সহায়তার জন্য পানির বোতল ছুড়ে দেন এবং উপস্থিত কর্মীদের নির্দেশ দেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে। তবে, ঘটনাস্থলের রাস্তা মানুষে পরিপূর্ণ থাকায় অ্যাম্বুলেন্স এবং উদ্ধারকারী দলের পক্ষে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা এনডিটিভিকে জানিয়েছেন, সমাবেশে অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি এবং তাদের বেপরোয়া এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টার কারণে অসহনীয় চাপ তৈরি হয়। এতে অনেকে জ্ঞান হারান এবং পরে আতঙ্কিত জনতার ছুটাছুটির ফলে পদদলনের ঘটনা ঘটে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, সমাবেশের আয়োজকদের পক্ষ থেকে ভিড় নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছিল না। এ ছাড়া, বিজয়ের সমাবেশে পৌঁছাতে ছয় ঘণ্টারও বেশি দেরি হওয়ায় জনতার মধ্যে উত্তেজনা ও অধৈর্য বৃদ্ধি পায়, যা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে।
এই শোকাবহ ঘটনায় তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্ট্যালিন সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘কারুর জেলায় ঘটে যাওয়া এই ঘটনা আমাকে গভীরভাবে মর্মাহত করেছে। প্রয়াতদের পরিবারের প্রতি আমার সমবেদনা এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি।’
তিনি আরও জানিয়েছেন, রাজ্য সরকার আহতদের চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সহায়তার ব্যবস্থা করছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও এই ঘটনাকে ‘অত্যন্ত দুঃখজনক’ আখ্যা দিয়ে শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে আছি এবং আহতদের জন্য প্রার্থনা করছি।’
থালাপতি বিজয় নিজে এক্স-এ একটি আবেগঘন পোস্টে বলেছেন, ‘আমার হৃদয় ভেঙে গেছে। এই অসহনীয় বেদনা ও শোকে আমি কাতর। যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের পরিবারের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা। আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি। আমি এই ঘটনার তদন্ত এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করব।’
স্থানীয় প্রশাসন ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, সমাবেশের আয়োজকদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় গাফিলতির অভিযোগে মামলা দায়ের করা হতে পারে। এ ছাড়া, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে বড় সমাবেশে ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।