পোশাক শিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকদের মধ্যে প্রতি তিনজন নারীর দুজনের ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে হয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ নারী ১৮ বছর হওয়ার আগেই প্রথম গর্ভধারণ করেছেন। এ ছাড়া প্রতি তিনজনে একজন নারী শ্রমিক জীবনে অন্তত একবার অনাকাক্সিক্ষত গর্ভধারণের শিকার হয়েছেন এবং প্রতি চারজনে একজন গর্ভপাত করেছেন। ‘তৈরি পোশাক শিল্পে (গার্মেন্ট) কর্মরত নারী শ্রমিকদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার’ বিষয়ক আইসিডিডিআরবির দুই বছর মেয়াদি কোহর্ট গবেষণায় এ তথ্য উঠে আসে। গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডার সহায়তায় এ গবেষণা চালানো হয়। এটি বাংলাদেশে পরিচালিত প্রথম এ ধরনের কোনো গবেষণা।
গতকাল সোমবার রাজধানীর মহাখালীর আইসিডিডিআরবির সাসাকাওয়া মিলনায়তনে গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে বলা হয়, ২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কড়াইল ও মিরপুর বস্তি এবং গাজীপুরের টঙ্গী বস্তিতে আইসিডিডিআরবির আর্বান হেলথ অ্যান্ড ডেমোগ্রাফিক সার্ভেইলেন্সের আওতাধীন এলাকায় গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়। তৈরি পোশাক কারখানায় কর্মরত ১৫ থেকে ২৭ বছর বয়সী মোট ৭৭৮ শ্রমিককে সঙ্গে নিয়ে প্রতি ছয় মাস অন্তর অন্তর জরিপের মাধ্যমে এই গবেষণাটি করা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, পোশাক শিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকদের মধ্যে প্রতি তিনজন নারীর দুজনের ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে হয়েছে এবং তাদের মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ নারী ১৮ বছর হওয়ার আগেই প্রথম গর্ভধারণ করেছেন। এ ছাড়া প্রতি তিনজনে একজন নারী শ্রমিক জীবনে অন্তত একবার অনাকাক্সিক্ষত গর্ভধারণের শিকার হয়েছেন এবং প্রতি চারজনে একজন গর্ভপাত করেছেন।
অনুষ্ঠানে আরও বলা হয়, গবেষণার শুরুতে ৪৯ শতাংশ নারী তৈরি পোশাক শিল্প শ্রমিকদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন ছিল, যা দুই বছর শেষে ফলোআপ করার সময় ৭০ শতাংশ দেখা গেছে। গবেষণার শুরুতে ১৫ শতাংশ নারী গর্ভনিরোধক বড়ি/ট্যাবলেট সম্পর্কে জানতেন, যা পরে বৃদ্ধি পেয়ে ৩৯ শতাংশে দাঁড়ায়। একই সময়ে পরিবার পরিকল্পনায় লিঙ্গ সমতার অর্থাৎ, স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের মতামতের প্রাধান্য দেওয়ার মনোভাব ৫৪ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭১ শতাংশে।
গবেষণায় দেখা গেছে, তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকরা ঘর ও কর্মস্থল দুই জায়গায়ই সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। গত ১২ মাসে নারী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে তাদের স্বামীর সহিংসতার হার ছিল অনেক বেশি এবং যৌন সহিংসতা ছাড়া অন্য সব ধরনের সহিংসতা গত দুবছরে আরও বেড়েছে। কর্মক্ষেত্রে মানসিক সহিংসতার হারও বেশি ছিল। গবেষণার শুরুতে প্রায় ৪৮ শতাংশ নারী গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে মানসিক সহিংসতার শিকার হয়েছিলেন, যা দুবছর পর বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫ শতাংশে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সহিংসতার শিকার নারীরা প্রায় কেউই আনুষ্ঠানিক সাহায্য চাইতে যান না। গবেষণার শুরুতে ৩৫ শতাংশ নারী অনানুষ্ঠানিক (পরিবার বা বন্ধুদের কাছে) সাহায্য চেয়েছিলেন, কিন্তু এই হার ক্রমশ কমে ২ বছর শেষে দাঁড়ায় মাত্র ২১ শতাংশে। কর্মক্ষেত্রে সহিংসতার ঘটনায়ও মাত্র প্রতি পাঁচজন নারীর মধ্যে একজন নারী শুরুতে কর্র্তৃপক্ষকে সহিংসতার কথা জানিয়েছিলেন এবং ২ বছর পরে এসেও এই চিত্রে কোনো পরিবর্তন হয়নি। গবেষণায় অংশ নেওয়া শ্রমিকদের ২২ শতাংশ কারখানায় স্যানিটারি প্যাড পাওয়া যায় এবং মাত্র ১৪ শতাংশ কারখানায় পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রী সরবরাহের তথ্য মিলে।
গবেষণায় দেখা গেছে, নারী তৈরি পোশাক শিল্প শ্রমিকদের মধ্যে যারা অন্তত ৯ বছর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণ করেছেন এবং তুলনামূলক বেশি বয়সে বিয়ে করেছেন, তাদের কিশোরী বয়সে (১৫-১৯ বছর) গর্ভধারণের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। যারা সন্তান ধারণের আগেই গর্ভনিরোধক ব্যবহার শুরু করেছিলেন, তাদের কিশোরী বয়সে গর্ভধারণের ঝুঁকি ৪৭ শতাংশ কম পাওয়া গেছে। আবার যারা প্রথম গর্ভধারণের আগে তৈরি পোশাক শিল্প খাতে কাজ শুরু করেছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি আরও কম ছিল। অন্যদিকে, স্বামীর দ্বারা সহিংসতার অভিজ্ঞতা থাকলে কিশোরী বয়সে গর্ভধারণের ঝুঁকি ২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। এই গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণ বাংলাদেশের পোশাকশিল্প খাতে কর্মরত নারী শ্রমিকদের স্বাস্থ্য, অধিকার ও নিরাপত্তা উন্নয়নের লক্ষ্যে সঠিক নীতি ও কর্মসূচি প্রণয়নে সহায়ক হবে।
অনুষ্ঠানে পপুলেশন কাউন্সিল বাংলাদেশের সাবেক পরিচালক ড. উবাইদুর রব, বিকেএমইএর যুগ্ম সম্পাদক ফারজানা শারমিন, মেরী স্টোপস বাংলাদেশের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও স্বাধীন গবেষক ইয়াসমিন এইচ আহমেদ। গবেষণা টিমের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আইসিডিডিআরবির ইমিরেটাস সায়েন্টিস্ট ড. রুচিরা তাবাসসুম নভেদ। তিনি অর্থনৈতিক দিক থেকে তুলনামূলক এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত নারীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অবস্থা অন্য নারীদের চেয়েও খারাপ। পরিস্থিতি উন্নয়নের নিয়ামকগুলো নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা দরকার। এজন্য সরকার, উন্নয়ন সংস্থা ও অংশীদারদের সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে।
বিকেএমইএর যুগ্ম সম্পাদক ফারজানা শারমিন বলেন, যেহেতু সমাজ ব্যবস্থা পুরুষতান্ত্রিক, তাই নারীদের জন্য ওয়ার্ক লাইফ ব্যালান্স ধরে রাখা বেশ কঠিন। গর্ভধারণের মতো বিষয়েও তাদের মতামতের তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এই পরিস্থিতিতে, কর্মীদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে সরকার একটি সুদূরপ্রসারী ভূমিকা নিতে পারে। কর্মীদের কাছে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিগুলো সহজলভ্য করা এবং এই বিষয়ে তাদের জ্ঞান বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। অন্যদিকে, সরকারি ক্লিনিকগুলোর সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত নির্দিষ্ট কার্যসময়ের কারণে কর্মরত নারীরা সেবা গ্রহণের সুযোগ পান না, যা পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
পপুলেশন কাউন্সিল বাংলাদেশের সাবেক পরিচালক ড. উবাইদুর রব বলেন, ‘নারীদের কর্মক্ষেত্র এখন কেবল গার্মেন্টসে সীমাবদ্ধ নেই। তবে যেখানেই কাজ করুক না কেন অনাকাক্সিক্ষত গর্ভধারণ কমাতে হবে। এজন্য কর্মীদের জ্ঞান বৃদ্ধির বিকল্প নেই।
মেরি স্টোপেস বাংলাদেশের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও স্বাধীন গবেষক ইয়াসমিন এইচ আহমেদ বলেন, নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নারীরা এখনো দোকানে গিয়ে স্বল্পমেয়াদি জন্মবিরতিকরণ সামগ্রী ক্রয় করতে পারে না। তাই গার্মেন্টসগুলোতে কাউন্সেলিংয়ের পাশাপাশি সাধারণ জন্মবিরতিকরণ সামগ্রীগুলো নিশ্চিত করতে হবে।