চুরি-ছিনতাই প্রতিদিন কর্তৃপক্ষ উদাসীন

২৫০ শয্যাবিশিষ্ট শেরপুর জেলা সদর হাসপাতালটি যেন অপরাধীদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে। হাসপাতালে প্রতিদিন চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। এতে চরম আতঙ্কে থাকছেন হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা। হাসপাতালে নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজনীয় গার্ড ও সিসি ক্যামেরা স্থাপনের দাবি সেবাগ্রহীতাদের। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, অপরাধ দমনে প্রয়োজনীয় সংখ্যক লোকবল নিয়োগে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। 

রোগীর স্বজনরা জানান, শেরপুর জেলা সদর হাসপাতালে চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা নিত্যদিনকার। একই সঙ্গে দালালদের দৌরাত্ম্য তো রয়েছেই। ছিনতাইকারীরা হাসপাতালের ওয়ার্ড এবং কেবিনে ঢুকে রোগী ও স্বজনদের অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে  টাকা-পয়সা, স্বর্ণালংকার লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। একটু চোখ ফেরালেই মোবাইল ফোন চুরি হয়ে যাচ্ছে। রাত নামলেই নেশাখোরদের উৎপাত বাড়ে। তারা চুরি-ছিনতাই করার পাশাপাশি রোগীর স্বজনদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে।  

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা শমসের আলী শ্বাসকষ্ট ও বুকের সমস্যা নিয়ে গত মাসে শেরপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। সন্ধ্যার আগে শমসের আলী সদর হাসপাতালের নতুন ভবনের নিচে তার বন্ধুর কাছ থেকে চিকিৎসা বাবদ ১০ হাজার টাকা ধার নেন। এ সময় পাশেই দাঁড়িয়েছিল হাসপাতালের ছিনতাইকারী চক্রের কয়েক সদস্য। টাকা নিয়ে আটতলা ভবনের (মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সংরক্ষিত) নিজের কেবিনে যাওয়ার পর মহিলা ও পুরুষ দুজন  ছিনতাইকারী জোর করে তার রুমে ঢুকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ১০ হাজার টাকা ও মোবাইল ছিনিয়ে নেয়। এ সময় চিৎকার না করার জন্য হুমকিও দেয় ছিনতাইকারীরা।

ভুক্তভোগী বীর মুক্তিযোদ্ধা শমসের আলী বলেন, ‘শেরপুর সদর হাসপাতালের অবস্থা খুবই খারাপ। আমি বুকের সমস্যা নিয়ে সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলাম। ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে আমার মোবাইল-টাকা সব শেষ। এখানে কারও কোনো নিরাপত্তা নেই।’

দর্শনার্থী রাবেয়া বেগম বলেন, ‘আমি কয়েক দিন আগে রাতে আমার এক আত্মীয়কে দেখতে হাসপাতালে এসেছিলাম। আমার চোখের সামনে হাসপাতালের ভেতরে ছিনতাইকারীরা এক নারীর গয়না ছিনিয়ে নেয়।’

হাসপাতালে সেবা নিতে আসা মাসুম আলী বলেন, ‘হাসপাতালে আসি চিকিৎসার জন্য। এখানে এলেই দেখি একটা কিছু চুরি হয়ে যাচ্ছে। কেবিন থেকে রোগীদের কাছ থেকে টাকা-মোবাইল ছিনিয়ে নিচ্ছে। এ ভয়ে এখন আর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে মন চায় না।’

ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জেলা সদর হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগী এবং স্বজনরা দিনে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যের শিকার হচ্ছেন। সেই সঙ্গে হাসপাতাল থেকে ওষুধ চুরির ঘটনাও ঘটছে। আর রাত নেমে এলেই হাসপাতালে শুরু হয় মাদকসেবী এবং ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য। তাই অতি দ্রুত হাসপাতালে প্রয়োজনী সংখ্যক আনসার সদস্য নিয়োগ দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।

কবি ও সাংবাদিক রফিক মজিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাসপাতালটির অবস্থা খুবই নাজুক। রাতের বেলা হাসপাতালটি ছিনতাইকারী এবং নেশাখোরদের হাতে চলে যায়। তাদের ভয়ে রাতে হাসপাতালের ওয়ার্ড বয়, নার্স কেউ ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হাসপাতালটি পরিচালনা করতে ব্যর্থ হয়েছে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শেরপুর জেলা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সেলিম মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, শেরপুর সদর হাসপাতালটি ২৫০ শয্যার হলেও জনবল আছে মাত্র ১০০ শয্যার। এ হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৭০০ রোগী ভর্তি থাকে। বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে প্রতিদিন ১২০০ থেকে ১৩০০ রোগী আসে। এসব রোগীর সঙ্গে অনেক ভিজিটর হিসাবে রোগীর আত্মীয়স্বজন এখানে আসা-যাওয়া করেন। এরই ফাঁকে কিছু দুষ্টপ্রকৃতির লোক হাসপাতালে ঢুকে পড়ে। হাসপাতালে পর্যাপ্ত লোকবল ও সিকিউরিটি গার্ড বা আনসার সদস্য না থাকায় চুরি-ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা ঘটছে। অপরাধ দমন এবং হাসপাতালের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক আনসার নিয়োগ ও সিসি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।