রসিদ ছাপিয়ে হোল্ডিং ট্যাক্স আত্মসাৎ, তদন্তে গড়িমসি

দীর্ঘদিন ধরে ভুয়া রসিদ বই ছাপিয়ে গাজীপুরের কাপাসিয়ার তরগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের কর আদায়কারীরা লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি জানাজানি হলে তাদের কাছ থেকে ওই ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যরা গত বুধবার এক বস্তা ভুয়া রসিদ বই আটক করেছেন। তবে এ চক্রের সঙ্গে ওই ইউনিয়ন পরিষদের সচিবসহ কয়েকজন সদস্যের যুক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে। এখনো কোনো আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। তদন্তের নামে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ঘন ঘন যাতায়াতে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

উপজেলার তরগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের আওতাধীন গ্রামগুলোর স্থায়ী বাসিন্দাদের বাসাবাড়ি থেকে হোল্ডিং ট্যাক্স হিসেবে বার্ষিক বিভিন্ন পরিমাণ টাকা আদায় করা হয়। বাসিন্দাদের বসতবাড়ির অবকাঠামোর ধরন ও তারতম্যের ভিত্তিতে ১০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত এ কর ধার্য করা হয়। উপজেলার অন্যান্য ইউনিয়নে এ কর আদায়ের জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়োগ করা হলেও এ ইউনিয়ন পরিষদে নীলফামারী ও রংপুর জেলার চার ব্যক্তিকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার মেলাবর গ্রামের রবীন্দ্রনাথ রায়ের ছেলে প্রদীপ কুমার রায়, একই উপজেলার পাড়াগ্রামের মো. সুলতান আলীর ছেলে মো. জুনায়েত আলী, মো. দুলাল মিয়ার ছেলে মো. সোহেল ইসলাম এবং রংপুর সদরের উত্তর খলেয়ার মো. আনোয়ার হোসেনের ছেলে মো. সোরাব মিয়া।

এ ইউনিয়নের মৈশন গ্রামের রুপজু মিয়া জানান, কর আদায়কারীরা তরগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের রসিদ দিয়ে নির্ধারিত হারে টাকা আদায় করায় তাদের মধ্যে সন্দেহ হয়নি। পরে তারা জানতে পারেন, কর আদায় করে যে রসিদ দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো নকল রসিদ। গ্রামবাসীর বাছ থেকে ১ হাজার টাকা আদায় করে তাদের সমপরিমাণ টাকার রসিদ দেওয়া হলেও মুরি রসিদ বইয়ে তা লেখা হয় ১০০ টাকা। একইভাবে ৫০০ টাকার রসিদে লেখা হয় ৫০ টাকা। মুরি চেক বইয়ে লেখা অনুযায়ী টাকা জমা দিয়ে তারা বাকি টাকা আত্মসাৎ করেন।

তরগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মো. আলমগীর হোসেন জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তরগাঁও ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি আয়ুবুর রহমান শিকদার পলাতক থাকায় উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. রুহুল আমীনকে চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর থেকে দীর্ঘদিন কর আদায় বন্ধ থাকায় উল্লিখিত ব্যক্তিদের প্রশাসক কর আদায়ের জন্য নিয়োগ দেন। তারপর ওই চারজন ব্যক্তিকে ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে ৩০টি রসিদ বই বুঝিয়ে দেওয়া হয় এবং তাদের কাছ থেকে হিসাব বুঝে নেওয়ার জন্য ইউপি সদস্যদের মাঝ থেকে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়।

কর আদায়কারীরা আসল রসিদ বইয়ের হুবহু নকল রসিদ বই ছাপিয়ে বাসিন্দাদের কাছ থেকে কর আদায় শুরু করেন। অভিযোগ উঠলে গত ২৪ সেপ্টেম্বর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যরা ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে অভিযান চালিয়ে এক বস্তা নকল রসিদ বই উদ্ধার করেন। পরে তাদের কাছে হস্তান্তর করা ৩০টি বই ফেরত নেওয়া হয়। এ ঘটনার পর থেকে কর আদায়কারী চারজন পলাতক রয়েছেন।

তরগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী সদস্য পারুল আক্তার জানান, কর আদায়কারীদের কাছে পাওয়া রসিদ বই থেকে প্রায় সাড়ে ৮ লাখ টাকা আদায়ের হিসাব পাওয়া গেছে। ভুয়া রসিদের মাধ্যমে কত টাকা তারা হাতিয়ে নিয়েছেন, তা বোঝা যাচ্ছে না।

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ও তরগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক মো. রুহুল আমীন বলেন, ‘ওই চার ব্যক্তি আগের চেয়ারম্যানের আমলে নিয়োগ পেয়েছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দীর্ঘদিন তারা অনুপস্থিত ছিলেন। কর আদায় বন্ধ থাকায় তাদের আবার সেই দায়িত্বে নিয়োজিত করা হয়। তাদের করের টাকা আত্মসাতের ঘটনা জানার সঙ্গে সঙ্গেই ইউপি সচিবকে তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়।’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ওই চার ব্যক্তির মোবাইল ফোনে কল দিলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।

কাপাসিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তামান্না তাসনীম জানান, এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

গাজীপুরের স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক আহাম্মদ হোসেন ভূঁইয়া জানান, বিষয়টি জানতে পেরে তিনি গত ২৯ সেপ্টেম্বর তরগাঁও ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় পরিদর্শনে যান। সেখানে ওই চার ব্যক্তির নিয়োগ-সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্র কিংবা রেজল্যুশন তল্লাশি করে পাননি। করের টাকা আত্মসাতের বিষয়টি প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। এ ঘটনার সঙ্গে একাধিক ব্যক্তির সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে।

তরগাঁও গ্রামের বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন, তরগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক মো. রুহুল আমীনের অদক্ষতা রয়েছে। গ্রামবাসীর হোল্ডিং ট্যাক্সের টাকা কত আদায় হচ্ছে আর কত জমা হচ্ছে, তা প্রশাসকের তদারক করা দরকার ছিল। করের টাকা আত্মসাতের আগে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন কর্মকর্তাদের গ্রামে এলে তা কাজে দিত। এখন আত্মসাতের পর তাদের ঘন ঘন যাতায়াতে কোনো লাভ হবে না। বিষয়টি স্থানীয় সরকার বিভাগের তদন্ত করা উচিত।