গাজাবাসীর জন্য মানবিক সহায়তা বহনকারী গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা নামক নৌবহরকে ইসরায়েলি বাহিনী কর্তৃক আটক করার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এ ঘটনার প্রতিবাদে জুমার নামাজের পর বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছে নাগরিক ঐক্য। এ ছাড়া বাংলাদেশ ইউথ সিনার্জি অ্যালিয়েন্স রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে।
গতকাল শুক্রবার সকালে গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিন্দা জানিয়ে বলেছে, গাজাবাসীর জন্য মানবিক সহায়তা বহনকারী গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা নামক নৌবহরকে আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইসরায়েলি বাহিনী কর্তৃক আটক করার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। এটি আন্তর্জাতিক আইনের ঘোর লঙ্ঘন এবং যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ক্ষুধাকে ব্যবহারের ন্যক্কারজনক ঘটনা।
এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ সরকার অবিলম্বে সব আটক মানবাধিকারকর্মী ও শান্তিকামী কর্মীদের নিঃশর্ত মুক্তি এবং তাদের নিরাপত্তা ও সুস্থতা নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছে। বিবৃতিতে ইসরায়েলকে অবিলম্বে গাজা ও পশ্চিম তীর থেকে বেআইনি দখলদারিত্বের অবসান, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন মেনে চলা এবং গাজায় চলমান গণহত্যা ও মানবিক অবরোধ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ।
বিজ্ঞপ্তিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, মানবিক সহায়তা বহনকারী ফ্লোটিলা ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি বিশ্ববাসীর সংহতির প্রতীক। ইসরায়েলকে অবশ্যই গাজায় তাদের অবাধ প্রবেশাধিকার দিতে হবে, যেখানে দখলদার ইসরায়েলি বাহিনী বেসামরিক জনগণকে তাদের জীবন, মর্যাদা এবং জীবিকা নির্বাহের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে চলেছে। বাংলাদেশ সরকার ও জনগণ ফিলিস্তিনের এই ভয়াবহ দুর্দশা ও অব্যাহত দুর্ভোগের মুহূর্তে তাদের সঙ্গে অটল সংহতি প্রকাশ করছে।
জামায়াতের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ : গাজায় ত্রাণবাহী জাহাজ গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলায় ইসরায়েলের আক্রমণ, হামলা ও বিশ্বের মানবাধিকার কর্মীদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে গতকাল জুমার নামাজের পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী উত্তর ও দক্ষিণ যৌথভাবে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে বিক্ষোভ মিছিল-পূর্বক সমাবেশ করেছে। সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, ‘কোনো সভ্য জাতি খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তায় বাধা দিতে পারে না। ইসরায়েল গাজায় ত্রাণবাহী জাহাজ গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলায় আক্রমণ, হামলা ও বিশ্বের মানবাধিকার কর্মীদের গ্রেপ্তার করে শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘনই করেনি, নিজেদেরকে নিকৃষ্ট জাতি হিসেবেও উপস্থাপন করেছে।’ এ সময় তিনি গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা থেকে আটক মানবাধিকার কর্মীদের সসম্মানে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়ে বলেন, ‘জব্দকৃত জাহাজে মজুদ খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী গাজাবাসীর মধ্যে বিতরণের ব্যবস্থা করতে হবে।’
সমাবেশ শেষে, বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেট থেকে এক বিশাল প্রতিবাদ মিছিল বিজয়নগর-কাকরাইল হয়ে শান্তিনগর মোড়ে গিয়ে শেষ হয়। এ সময় হাজার-হাজার তৌহিদী জনতা মিছিলে অংশগ্রহণ করে গাজায় ত্রাণবাহী জাহাজ গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলায় ইসরায়েলের আক্রমণ, হামলা ও বিশ্বের মানবাধিকার কর্মীদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ জানায়।
নাগরিক ঐক্যের প্রতিবাদ : গতকাল রাজধানীর ইস্কাটনে দলের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার সভাপতিত্বে নাগরিক ঐক্য কেন্দ্রীয় কমিটির জরুরি বৈঠকে ফিলিস্তিনিদের সহায়তার জন্য গাজার উদ্দেশ্যে যাত্রা করা গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার ত্রাণবাহী নৌযানগুলোকে আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইজরায়েলি বাহিনী কর্তৃক আটকের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন দলটির নেতারা। অবিলম্বে আটক মানবিক সহায়তাকারীদের মুক্তি এবং গাজায় সহায়তা পৌঁছানোর দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের অবৈধ দখল বন্ধ, গাজায় গণহত্যা এবং অবরোধ বন্ধ করার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে আন্তর্জাতিক সমর্থন তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান নেতারা।
মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে বিক্ষুব্ধ জনতার প্রতিবাদ সমাবেশ : গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলায় ইসরায়েলি হামলা ও বাধা সৃষ্টি আর জাহাজে থাকা ব্যক্তিদের বন্দির প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ ও র্যালি করেছে বাংলাদেশ ইউথ সিনার্জি অ্যালিয়েন্স। গতকাল বিকেলে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে ৭০টি সংগঠনের একাত্মতায় এই আয়োজন করে ইউথ সিনার্জি অ্যালিয়েন্স। বিক্ষোভ কর্মসূচিতে বক্তারা ফিলিস্তিনে আগ্রাসন বন্ধসহ পাঁচটি দাবি উত্থাপন করেন। ঘণ্টাব্যাপী সমাবেশ শেষে বিকেল ৫টার দিকে একটি প্রতিবাদী মিছিল বের করে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ সড়কে প্রদক্ষিণ করেন তারা।
তারা বলেন, ফ্লোটিলার সুরক্ষা নিশ্চিতের পাশাপাশি ইসরায়েলি বাহিনীর কবলে আটকে পড়া সব দেশের নাগরিককে নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে হবে। ফিলিস্তিনে হত্যাযজ্ঞ চালানোর অস্ত্র ও অর্থের জোগান বন্ধসহ আইডিএফকে দ্রুত একটি টেররিস্ট সংগঠন হিসেবে আখ্যায়িত করতে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানান তারা। এ ছাড়া ফ্লোটিলায় অংশ নেওয়া বাংলাদেশি আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানান তারা।
‘ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়াতে মুসলমান নয়, হতে হবে মানুষ’, ‘আমার ভাই মরল কেন জবাব চাই’, ‘লেগেছে রে লেগেছে, রক্তে আগুন লেগেছে, বীর বাঙালি জেগেছে’, ‘ট্রাম্পের দুই গালে জুতা মারো তালে তালে’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, ফিলিস্তিনি মুক্ত করো’ এমন নানান সেøাগানে মুখর হয়ে ওঠে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ।