আজ শহীদ মিনারে আহমদ রফিকের মরদেহে শ্রদ্ধা

ভাষাসৈনিক, শিক্ষাবিদ, কবি, প্রবন্ধকার, গবেষক, মুক্তমনা সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আহমদ রফিকের মৃত্যুতে দেশে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা।

গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর বারডেম হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯৬ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। আজ শনিবার সকাল ১১টায় তার মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেওয়া হবে সর্বস্তরের জনগণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। এরপর তার মরদেহ রাজধানীর শাহবাগে বারডেম হাসপাতালে দান করা হবে।

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এক শোকবার্তায় বলেন, ‘আহমদ রফিক ছিলেন ভাষা আন্দোলনের এক অগ্রগণ্য সাক্ষী ও সংগ্রামী কণ্ঠস্বর। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন একজন অনন্য কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও রবীন্দ্রতত্ত্ব চর্চার দিশারি।’

তিনি বলেন, ‘শতাধিক গ্রন্থ রচনা ও সম্পাদনার মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছেন। রবীন্দ্রচর্চার ক্ষেত্রে তার অবদান দুই বাংলায় সমানভাবে শ্রদ্ধার আসন পেয়েছে। কলকাতার টেগর রিসার্চ ইনস্টিটিউট তাকে ‘রবীন্দ্রতত্ত্বাচার্য’ উপাধি দিয়ে সম্মানিত করেছে, যা তার বিদগ্ধতার স্বীকৃতি।’

প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘দেশের সংস্কৃতি ও মুক্তচিন্তার জগতে আহমদ রফিকের প্রয়াণ এক অপূরণীয় ক্ষতি। দৃষ্টিশক্তি ও শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি শেষ দিন পর্যন্ত জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে গেছেন। আহমদ রফিকের জীবন ও কর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে। জাতি কৃতজ্ঞচিত্তে তাকে স্মরণ করবে।’ প্রধান উপদেষ্টা শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজন, শুভানুধ্যায়ী ও সাহিত্য-সংস্কৃতিমনা জনগণের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

অপর এক শোক বার্তায় সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, ভাষা আন্দোলনের একজন অগ্রণী সংগ্রামী হিসেবে আহমদ রফিক মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছেন। পাশাপাশি সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমাজচিন্তায় তার অবদান ছিল অনন্য।

সংস্কৃতি উপদেষ্টা আরও বলেন, আহমদ রফিক আজীবন মুক্তচিন্তা, মানবিক মূল্যবোধ ও প্রগতির পক্ষে কলম চালিয়েছেন এবং প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। তার প্রয়াণে জাতি এক সত্যিকারের জ্ঞানী মানুষকে হারাল। তবে তার চিন্তা, কর্ম ও আদর্শ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দিকনির্দেশনা জোগাবে।

পৃথক শোকবার্তায় ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, ‘ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক ছিলেন আমাদের ভাষা আন্দোলনের সাহসী যোদ্ধা। তার অবদান বাঙালি জাতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার মৃত্যু জাতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়াজ আহমদ খান এক শোকবার্তায় বলেন, ‘মহান ভাষা আন্দোলনে আহমদ রফিক অসামান্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। ভাষা আন্দোলনে তার এই অবদান জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। তিনি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, কবিতা ও প্রবন্ধসহ শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার এসব লেখা নতুন প্রজন্মকে প্রেরণা জোগাবে।’

আহমদ রফিকের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল শুক্রবার এক শোকবার্তায় বিএনপি মহাসচিব বলেন, আহমদ রফিক ছিলেন মহান ভাষা আন্দোলনের একজন বীরসেনানী। মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষায় ও সাহিত্য সংস্কৃতি বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি একজন চিকিৎসক ছিলেন। সাহিত্য সংস্কৃতি বিকাশসহ নানা সেক্টরে অসামান্য অবদান রেখেছেন। আহমদ রফিকের কর্মময় জীবন দেশের মানুষকে সবসময় প্রেরণা জুগিয়ে যাবে।

তিনি বলেন, আমি আহমদ রফিকের মৃত্যুতে তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গ, আত্মীয়স্বজন, ভক্ত, গুণগ্রাহী ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি জানাচ্ছি গভীর সমবেদনা।

ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিকের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)। গতকাল শুক্রবার পাঠানো এক শোকবার্তায় সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, আহমদ রফিক ছিলেন ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক, প্রাবন্ধিক, লেখক ও গবেষক। একই সঙ্গে তিনি একজন বিশিষ্ট রবীন্দ্র গবেষক হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন। শতাধিক গ্রন্থ রচনা ও সম্পাদনা করেছেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, শিক্ষাজীবন থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের প্রায় প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আহমদ রফিক সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। তার প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনা ও কর্ম সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনে নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এক বিবৃতিতে প্রবীণ ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিকের প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং বলেছেন তার মৃত্যুতে দেশ তার এক কৃতী সূর্যসন্তানকে হারিয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের সাম্যভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি নির্মাণে গত সাত দশক ধরে  আহমদ রফিক অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।

ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী আহমদ রফিকের জন্ম ১৯২৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শাহবাজপুর গ্রামে। মুন্সীগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। এরপর রসায়নে পড়তে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু ফজলুল হক হলের আবাসিক সুবিধা না পাওয়ায় পরে ভর্তি হন ঢাকা মেডিকেল কলেজে।

১৯৫২ সালে তৃতীয়বর্ষে পড়ার সময় ফজলুল হক হল, ঢাকা হল এবং মিটফোর্ডের ছাত্রদের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করে চলার কাজ করেছেন তিনি। পাশাপাশি সভা-সমাবেশ মিছিলে ছিলেন নিয়মিত। ১৯৫৪ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের আন্দোলনকারী ছাত্রদের মধ্যে একমাত্র তার নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। ১৯৫৫ সালের শেষ দিকে প্রকাশ্যে বেরিয়ে এসে পড়াশোনায় ফেরেন আহমদ রফিক। এমবিবিএস ডিগ্রি নিলেও চিকিৎসকের পেশায় যাননি।

১৯৫৮ সালেই আহমদ রফিকের প্রথম প্রবন্ধের বই ‘শিল্প সংস্কৃতি জীবন’ প্রকাশ হয়। তারপর লেখালেখিতেই জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। পেয়েছেন একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, রবীন্দ্রত্ত্বাচার্য উপাধিসহ অনেক সম্মাননা। গত বৃহস্পতিবার ৯৬ বছর বয়সে মারা যান তিনি।

ভাষাসৈনিক আহমদ রফিকের মৃত্যু অপূরণীয় ক্ষতি সাদা দল : ভাষাসৈনিক, শিক্ষাবিদ, কবি, প্রবন্ধকার, গবেষক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আহমদ রফিকের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল। গতকাল শুক্রবার সংগঠনের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. মোর্শেদ হাসান খান এবং যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম ও অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম সরকার এক যৌথ বিবৃতিতে এই শোক প্রকাশ করেন।

শোকবার্তায় মরহুম আহমদ রফিকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে নেতারা বলেন, আহমদ রফিক ছিলেন মহান ভাষা আন্দোলনের একজন বীর সেনানী। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণসহ এদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছেন। বিশেষ করে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষায় ও সাহিত্য-সংস্কৃতি বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি একজন চিকিৎসক ছিলেন। তিনি সাহিত্য-সংস্কৃতি বিকাশসহ নানা সেক্টরে অসামান্য অবদান রেখেছেন। আহমদ রফিকের কর্মময় জীবন দেশের মানুষকে সবসময় প্রেরণা জোগাবে।

সাদা দলের নেতারা বলেন, মরহুম আহমদ রফিক একজন রবীন্দ্র গবেষক হিসেবেও সুপরিচিত। তিনি শতাধিক গ্রন্থ রচনা ও সম্পাদনা করেছেন। তিনি ছিলেন প্রগতিশীল বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার মানুষ। তার চিন্তা ও কর্মের মাধ্যমে সমাজ প্রগতির সংগ্রামে নিয়োজিত নেতাকর্মীদের ও সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করেছেন। তার মৃত্যুতে দেশের অপূরণীয় ক্ষতি হলো। আমরা তার জীবন-সংগ্রামের প্রতি আবারও শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।