পৃথিবীতে আট হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার পর্বত আছে মোট চৌদ্দটি। এই উচ্চতায় অক্সিজেন থাকে ভূপৃষ্ঠের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। তাই সাধারণত পর্বতারোহীরা কৃত্রিম অক্সিজেন ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু বাংলাদেশের স্বনামধন্য পর্বতারোহী ডা. বাবর আলী ইতিহাস গড়লেন—প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়াই আটহাজারি শৃঙ্গ জয় করে।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর ভোরে তিনি স্পর্শ করেন পৃথিবীর অষ্টম উচ্চতম পর্বত মাউন্ট মানাসলু (২৬,৭৮১ ফুট) এর চূড়া। এটি বাবরের চতুর্থ আটহাজারি পর্বত জয়। একই দিনে চূড়া ছুঁয়েছেন আরেক বাংলাদেশি পর্বতারোহী তানভীর আহমেদ—যার জন্য এটি ছিল প্রথম আটহাজারি অভিযান এবং প্রথম চেষ্টাতেই এসেছে সাফল্য।
‘মানাসলু অ্যাসেন্ট: ভার্টিক্যাল ডুয়ো’ শীর্ষক এই অভিযানের আয়োজন করে পর্বতারোহণ ক্লাব ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স। শনিবার চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের এস রহমান হলে অনুষ্ঠিত হয় অভিযান-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলন ও পতাকা প্রত্যর্পণ অনুষ্ঠান। এতে উপস্থিত ছিলেন পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান ‘সামুদা’ এর চিফ বিজনেস অফিসার বিকাশ কান্তি দাস, ভিজুয়াল নিটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ নুর ফয়সালসহ সংশ্লিষ্টরা।
বিকাশ কান্তি দাস বলেন, দেশের তরুণ অ্যাথলেটদের পাশে ভবিষ্যতেও আমরা থাকব। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই সামুদা এই অভিযানে সম্পৃক্ত হয়েছে।
অভিযানে সহায়তা করেছে আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান—গিগাবাইট বাংলাদেশ, চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন, সিনোভেস্ট, সিয়েরা-রোমিও, আদিবা ফুটওয়্যার, ফোরএস অ্যাডভান্স টেকনোলজিস, জেনোভার্স, সোর্স অ্যাসোসিয়েটস, আইলেট ব্যাংকার্স, কাজী এগ্রো এবং ফ্রিয়েসভা।
ভার্টিক্যাল ড্রিমার্সের পাবলিক রিলেশন্স সেক্রেটারি আশরাফুল আরেফীন আসিফ অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন, আর অভিযানের ব্যবস্থাপক ছিলেন ফরহান জামান।
আসিফ বলেন, নেপালের মানসিরি হিমাল রেঞ্জের মানাসলু শৃঙ্গে একই দিনে দুই বাংলাদেশির হাতে উড়েছে লাল-সবুজ পতাকা—এটি জাতি হিসেবে আমাদের জন্য বিশাল গৌরব। বাবর-তানভীরের এই সফলতা দেশের পর্বতারোহণ ইতিহাসে নতুন অধ্যায়।
বাবর আলীর অক্সিজেনবিহীন চূড়ায় আরোহন
দীর্ঘদিন ধরেই কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়াই আটহাজারি শৃঙ্গে ওঠার স্বপ্ন দেখতেন ডা. বাবর আলী। এর আগে তিনি সফলভাবে আরোহণ করেছেন বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্ট, চতুর্থ উচ্চতম লোৎসে এবং দশম অন্নপূর্ণা-১।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আমাদের পাশেই হিমালয়, কিন্তু সেখানে বাঙালির পদচিহ্ন খুবই কম। আমি চেয়েছিলাম সেই ধারণা বদলাতে। কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়াই আট হাজার মিটারের বেশি উচ্চতায় উঠতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। আশা করি, আমার পরের প্রজন্ম এই ধারা অব্যাহত রাখবে।বাবর আরও জানান, তার লক্ষ্য বিশ্বের সব ১৪টি আটহাজারি পর্বত জয় করা। এখন পর্যন্ত তিনি সফল হয়েছেন চারটিতে।
প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই তানভীরের সাফল্য
তানভীর আহমেদের পর্বতারোহণ যাত্রা আরও অনুপ্রেরণামূলক। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক মাউন্টেনিয়ারিং কোর্স ছাড়াই তিনি সীমিত সুযোগের মধ্যেও দেশে নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে এই কৃতিত্ব অর্জন করেছেন।
তিনি বলেন, আমাদের দেশে হিমবাহ বা বড় পর্বত না থাকায় বিদেশে গিয়ে প্রশিক্ষণের সুযোগ পাইনি। কিন্তু একাগ্রতা আর নিয়মিত অনুশীলন আমাকে অনেক দূর নিয়ে গেছে। আট হাজার মিটারের পাতলা বাতাসে নিশ্বাস নেওয়াটাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, সেটি অতিক্রম করতে পেরেছি বলেই ভবিষ্যতে আরও বড় পর্বতের দিকে চোখ রাখছি।
অভিযানপথের সারসংক্ষেপ
বাবর ও তানভীর ৫ সেপ্টেম্বর নেপালের উদ্দেশে রওনা দেন। কাঠমান্ডু থেকে তিলচে গ্রাম হয়ে পাঁচ দিনের হাঁটা শেষে তাঁরা পৌঁছান বেসক্যাম্পে। উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ধাপে ধাপে তাঁরা পৌঁছান ক্যাম্প-৪ (৭,৪০০ মিটার) পর্যন্ত।
রাতের আঁধারেই শুরু হয় চূড়ান্ত আরোহণ, এবং ২৬ সেপ্টেম্বর ভোরে তারা স্পর্শ করেন মানাসলুর চূড়া। দুজনেই ভার্টিক্যাল ড্রিমার্সের কর্মকর্তা
ডা. বাবর আলী ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এবং তানভীর আহমেদ ক্লাবটির মাউন্টেনিয়ারিং সম্পাদক। তানভীর গত বছর আরোহণ করেছিলেন আমা দাবলাম—যে শৃঙ্গে ২০২২ সালে প্রথম বাঙালি হিসেবে সামিট করেছিলেন বাবর।
পেশাগত জীবনে তানভীর ‘ভিএফ এশিয়া বাংলাদেশ’-এর অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার। তার জন্ম কিশোরগঞ্জ সদরের খরমপট্টিতে। বাবর আলী চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ৫১তম ব্যাচের ছাত্র, বর্তমানে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত এবং চট্টগ্রামের হাটহাজারীর সন্তান।