প্রধান সহকারীর কাছে জিম্মি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান সহকারী মোজাম্মেল হক। এক যুগ ধরে কর্মরত আছেন একই কার্যালয়ে। এর সুবাদে এখানকার নাড়ি-নক্ষত্র সবই তার নখদর্পণে। দীর্ঘদিন ধরে একই কার্যালয়ে কর্মরত থাকার সুবাদে অনুসারী ও সুবিধাভোগীদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন আলাদা সিন্ডিকেট। তিনিই যেন সর্বেসর্বা। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বিভিন্ন সময় নাজেহাল করতেন অফিসের বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। বড় বড় কর্তাবাবুরাও তার কাছে বাধ্য হয়ে ধরা দিতেন নিজেদের সুযোগ-সুবিধা ও কাজ আদায় করে নিতে। মোজাম্মেল হকের ক্ষমতার দাপটে তারাও তখন ছিলেন অসহায়। ঘুষ না দিলে কারোই কাজ করতেন না তিনি। দুর্নীতি-অনিয়ম আর ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে নিজের নামে গড়েছেন অঢেল সম্পদ। কিনেছেন বিলাসবহুল গাড়ি, ফ্ল্যাট। মোজাম্মেল হকের অত্যাচার ও নির্যাতন বাড়তে থাকায় বাধ্য হয়ে সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান সহকারী মোজ্জামেল হক বিভিন্ন সময়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিভাগীয় পরিচালক ও সিভিল সার্জনের নাম ভাঙিয়ে হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের থেকে নানা কৌশলে হাতিয়ে নিতেন মোটা অঙ্কের টাকা। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরি স্থায়ীকরণ, বদলি ফরোয়ার্ডিং, মাতৃত্বকালীন ছুটি মঞ্জুর, ছুটি পরবর্তী যোগদান বাবদও তাকে দিতে হতো নগদ টাকা। কর্মচারীদের উচ্চতর গ্রেড মঞ্জুরির কাজ সম্পাদনে জনপ্রতি তাকে দিতে হয় ৩ হাজার ৫০০ টাকা। জিপিএফ ঋণ উত্তোলনের জন্য সুবিধাভোগীদের প্রত্যেকের কাছ থেকে নিতেন গড়ে ১৫০০-২০০০ টাকা করে। বিনোদন ছুটি, ল্যামগ্র্যান্ড, পেনশন, পিআরএল মঞ্জুর করার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বাজেট শাখার মোহাম্মদ হানিফের নাম ভাঙিয়ে কর্মচারীদের থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য পরিদর্শক পদ থেকে পিআরএলে যান আবুল বাশার। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পেনশন পাওয়ার কথা ছিল। আবুল বাশার তার স্ত্রীর মৃত্যুর পর পরিবারের সমস্যার কথা জানিয়ে বারবার অফিসে ধরনা দিয়েও টাকা আদায় করতে পারেননি। হাসপাতালের প্রধান সহকারী মোজাম্মেলের সঙ্গে মোটা অঙ্কের টাকার (১৪ হাজার) চুক্তি না করায় হাসপাতালের বারান্দায় বারান্দায় ঘুরতে হচ্ছে তাকে। দুই বছর ধরে ঘুরেও এখনো পাননি পেনশনের টাকা। তার ফাইল আটকে রেখেছেন অভিযুক্ত মোজাম্মেল। এভাবেই পেনশন মঞ্জুর করার সময় টাকার জন্য কর্মচারীদের জিম্মি করেন মোজাম্মেল হক। একপর্যায়ে টাকা পেলে পেনশন মঞ্জুর করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন।

ভুক্তভোগী আবুল বাশার জানান, ‘হাসপাতালের প্রধান সহকারী মোজাম্মেল হকের হয়রানির কারণে যথাসময়ে পিআরএল ও পেনশনের টাকা আমরা পাচ্ছি না। এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’

চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (সেক্মো) আবুল হাশেম সবুজ বলেন, টাকার লেনদেন ছাড়া তার কাছ থেকে কোনো অফিশিয়াল কাজ সম্পাদন করা যায় না। একজনের বদলির জন্য ৩০ হাজার টাকা দিয়েও কাজ করেননি তিনি। তার হয়রানি ও অত্যাচারে সবাই দিশেহারা।

উপজেলা সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক জসিম উদ্দিন বলেন, ‘১২ বছর ধরে বেশ ভোগান্তিতে আছেন হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অফিসের যেকোনো কাজ আদায়ে প্রধান সহকারী মোজ্জামেল হককে প্রকাশ্যে ঘুষ দিতে হয়। অবৈধ সম্পদে তিনি কুমিল্লা শহরে একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনেছেন বলে শুনেছি। হরহামেশা চড়েন দামি গাড়িতে। আমরা তার দুর্নীতি থেকে মুক্তি চাই।’

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান সহকারী মোজ্জাম্মেল হক বলেন, ‘আমি কোনো দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নই। ঘুষ গ্রহণের কোনো প্রমাণ কারও কাছে নেই। আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো ডাহা মিথ্যা।’

চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রশিদ আহমেদ চৌধুরী তোফায়েল বলেন, ‘আমি যোগদানের পরই প্রধান সহকারী মোজ্জামেল হকের নামে কিছু অভিযোগ পেয়েছি। প্রাথমিকভাবে তাকে সংশোধন হতে বলেছি।’

এ বিষয়ে কুমিল্লা জেলা সিভিল সার্জন ডা. আলী নূর মোহাম্মদ বশির আহমেদ বলেন, ‘অভিযোগের তদন্ত চলমান। আপাতত এসব বিষয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে আরও ভালো হয়। তদন্ত সাপেক্ষে দোষী সাব্যস্ত হলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’