উপেক্ষিত হতে পারে বিএনপির আপত্তিও

শুধু মত দেওয়া ও নেওয়ার জন্য বৈঠক আর দীর্ঘায়িত করতে চায় না জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। বরং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলো এবং ঐকমত্য কমিশনের মধ্যকার ঐক্যকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কাক্সিক্ষত ঐক্য শেষ পর্যন্ত না এলে ‘চাপিয়ে দেওয়া’র মতো সিদ্ধান্তও নিতে হতে পারে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সে ক্ষেত্রে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আপত্তিগুলো আর আমলে নাও নেওয়া হতে পারে। কমিশনের একাধিক সূত্র দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, এমন পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের দুটি সুপারিশ ও কমিশনের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে সনদ বাস্তবায়নে দিকনির্দেশনা দিয়ে আর বিলম্বিত না করে সমাধানে পৌঁছাতে চায় তারা।

কমিশনের একাধিক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, আজ রবিবারের বৈঠকই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে শেষ বৈঠক হতে পারে। রাজনৈতিক দলের অনড় অবস্থান ‘লেবু চিপার’ মতো হয়ে যাচ্ছে। কোনো ফল আসছে না কিন্তু প্রক্রিয়াটি ‘তিক্ত’ হয়ে উঠছে।

কমিশন সূত্র জানায়, দলগুলোর মতামত যতটা সম্ভব আমলে নিয়ে তার সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ গুরুত্ব দিয়ে কমিশন তার প্রতিবেদন শিগগিরই অন্তর্বর্তী সরকারকে দেবে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে কমিশন। ১৫ অক্টোবর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে কমিশন নিজেদের মধ্যে বৈঠকে বসতে পারে।

সূত্র জানায়, সরকারের কাছে জমা দেওয়ার আগে বিশেষজ্ঞদের এই প্রস্তাবটি আরও সুনির্দিষ্ট আকারে আজকের আলোচনায় তুলে ধরা হতে পারে। সেখানে সংবিধান আদেশ, সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের মতামত এবং গণভোট। বিকল্প হিসেবে গণপরিষদ বা সংবিধান সংস্কার সভা নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত জাতীয় সংসদ প্রথমে সংবিধান সংস্কার করবে। এ ছাড়া কমিশন তৃতীয় আরেকটি প্রস্তাবের বিষয়ে আলোচনা করছে বলে জানা গেছে। ঐকমত্য কমিশনের একাধিক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, সনদ বাস্তবায়নে অধিকাংশ দল একমতে পৌঁছালে সেখানে বিএনপির আপত্তি থাকলেও সিদ্ধান্ত নিতে ঐকমত্য কমিশন আর দেরি করবে না।

সূত্রে জানা গেছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সব রাজনৈতিক দলের মতামত প্রতিফলিত হয়, এমন বিকল্প প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত কমিশন জানাবে। সেখানে কারও মতামত পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিফলিত নাও হতে পারে।

এদিকে জুলাই জাতীয় সনদের চূড়ান্ত ভাষ্যের ভাষাগত ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকায় সংযোজন-বিয়োজন করছে কমিশন। এতে কিছু শব্দ যুক্ত করছে। সংশোধিত চূড়ান্ত ভাষ্যে অঙ্গীকারনামায় রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তির (নোট অব ডিসেন্ট) কথা যুক্ত করলেও পরিস্থিতি বিবেচনা করে সেটি বাদ দিয়েছে কমিশন। সংশোধিত ভাষ্যটি আজ দলগুলোর কাছে পাঠানো হতে পারে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঐকমত্য কমিশনও এখন অনড় অবস্থানে চলে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন ও আগামী জাতীয় নির্বাচন কী প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হতে পারে, সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো নিজ নিজ অবস্থান থেকে কিছুতেই সরে না আসায় বিশেষজ্ঞদের দুটি সুপারিশ গুরুত্ব দিয়ে সমাধানে পৌঁছাতে চায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে রবিবার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আবারও আলোচনা করবে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। রবিবার বেলা সাড়ে ১১টায় রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এ বৈঠক হবে বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়। এর আগে সকালে কমিশনের সদস্যরা প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে সূত্রে জানা গেছে।

এতে বলা হয়, রবিবার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আলোচনা শুরু হবে। সূত্রে জানা গেছে, রবিবার দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকের আগে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করবে কমিশন।

এদিকে ওই বৈঠকের বিষয়ে গতকাল শনিবার জাতীয় সংসদের কমিশনের কার্যালয়ে কমিশন সভা হয়। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের সম্ভাব্য উপায় নিয়ে এর আগে বিশেষজ্ঞদের প্রদত্ত মতামত, পরামর্শগুলো আবার পর্যালোচনা করা হয়। পাশাপাশি, এ বিষয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে পাওয়া অভিমতও পুনর্বিশ্লেষণ করা হয় বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রথম দুই ধাপের সংলাপের ভিত্তি ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে জুলাই জাতীয় সনদের চূড়ান্ত ভাষ্য তৈরি করে কমিশন। দলগুলোর পক্ষ থেকে সনদ বাস্তবায়নের উপায় বের করতে কমিশনকে আহ্বান করে। বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে ১১ সেপ্টেম্বর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তৃতীয় ধাপের বৈঠক শুরু করে কমিশন। তিন দিন আলোচনা হলেও এখনো ঐকমত্য হয়নি। আজ আবার আলোচনায় বসছে কমিশন।

বৈঠকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যে পৌঁছেছে কি না, সে বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে বলে জানিয়েছেন কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি না যে সব দল একমত হবে। কিন্তু অধিকাংশ দল একমত হয়ে যদি একটা প্রস্তাব আনতে পারে, তাহলে বিবেচনা করা হবে।’

সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাব বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে মোটাদাগে ছয়টি সুপারিশ পেয়েছিল কমিশন। সেগুলো হলো পূর্ণাঙ্গ সনদ বা তার কিছু অংশ নিয়ে গণভোট, বিশেষ সাংবিধানিক আদেশে বাস্তবায়ন, গণপরিষদ গঠনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন, ত্রয়োদশ সংসদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন, সংসদকে সংবিধান সংস্কার সভা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে সনদের বিষয়গুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা এবং সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের কাছে এই মর্মে মতামত চাওয়া যে, ‘অন্তর্বর্তী সরকার এই সনদ বাস্তবায়ন করতে পারবে কি না’।

এর আগে গত ১৭ সেপ্টেম্বর দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাব তুলে ধরেছিল কমিশন। সে প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবগুলো নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার একটি ‘সংবিধান আদেশ’ জারি করতে পারে। এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে। এরপর আদেশটি নিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে গণভোট করা যেতে পারে। তবে বিএনপিসহ বেশ কিছু দল এই প্রস্তাবে আপত্তি জানায়।

কমিশন সোমবার বিরতি দিয়ে মঙ্গলবার বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে সবশেষ বৈঠক কমিশন করতে চায় বলে জানিয়েছেন আলী রীয়াজ। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে পাওয়া মতামত নিয়ে সোমবার বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বৈঠক করতে চায় কমিশন। গতকাল আলী রীয়াজ বলেন, ‘কালকে (রবিবার) বৈঠকে যদি বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে একমত হতে না পারে, তাহলে ৬ অক্টোবর বিরতি দিয়ে ৭ অক্টোবর বৈঠকে বসব। সেখানে বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে সুপারিশ জানানো হবে।’

ঐকমত্য কমিশনের অন্যতম সদস্য বদিউল আলম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ব্যক্তিগত রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে পারলে দলগুলোর ঐকমত্যে আসা অসম্ভব নয়। সনদ বাস্তবায়নের বিষয়টি আটকে আছে রাজনৈতিক দলগুলো (বড় রাজনৈতিক দল) নিজ দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থ ছাড় না দেওয়ার কারণে।’