রাজনৈতিক দলগুলো গণভোট আয়োজনের পক্ষে মত দিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সৃষ্ট জট খুলে দিলেও আবার নতুন জটে পড়তে যাচ্ছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সনদ বাস্তবায়নে সংস্কার প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলোর দেওয়া ‘নোট অব ডিসেন্ট’ তুলে নেওয়ার আশাবাদ বিষয়টি নতুন জটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কমিশন সূত্র জানায়, গতকাল সোমবার ঐকমত্য কমিশনের নিজেদের ভেতর অনুষ্ঠিত সভায় সংস্কার প্রস্তাবে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর ‘নোট অব ডিসেন্ট’ তুলে নেওয়ার ব্যাপারে আলোচনা করেছে। তাছাড়া, গণভোট নির্বাচনের দিনেই হবে, না নির্বাচনের আগে হবে সেটি নিয়েও আলোচনা করেছে কমিশন। অবশ্য গণভোট আয়োজনের বিষয়টি বড় কোনো জটিলতার সৃষ্টি করবে না বলে জানিয়েছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন,‘আমরা যেহেতু ঐকমত্যের অনেক কাছাকাছি চলে এসেছি, সেখানে গণভোটের দিনক্ষণ নিয়ে জটিলতার মুখে পড়তে হবে না।’
নোট অব ডিসেন্ট নিয়ে বদিউল আলম বলেন, ‘নোট অব ডিসেন্ট কি জনগণের মত? সেটিও রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে কমিশনের প্রশ্ন থাকবে। এসব ব্যাপারে সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে আগামীকাল বুধবার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে ওইদিন রাজনৈতিক দলগুলোর বৈঠকে পরিষ্কার হয়ে উঠবে সেটি।’
কমিশনের সঙ্গে সংলাপে অংশ নেওয়া একাধিক রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা ও কমিশনের একাধিক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর দেওয়া নোট অব ডিসেন্ট তুলে নেওয়ার যে প্রত্যাশা ঐকমত্য কমিশন করছে, সেটি নতুন জটিলতার সৃষ্টি হতে যাচ্ছে। তারা বলেন, গণভোট আয়োজনে মতভিন্নতাও নতুন জটে পড়তে যাচ্ছে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে।
এদিকে, জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট দাবি করেছে জামায়াতে ইসলামী। বিএনপির দাবি, নির্বাচনের দিন হতে পারে গণভোট, এটিও জট সৃষ্টির উপসর্গ তৈরি করতে পারে।
এ প্রসঙ্গে ড. বদিউল আলম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ঐকমত্যে প্রায় পৌঁছে গেছি। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোটে সব অংশীজন (রাজনৈতিক দল) একমত পোষণ করেছে।’ তিনি বলেন, ‘গণভোটের ব্যাপারে বিএনপির আপত্তি
থাকলেও তারাও শেষ পর্যন্ত গণভোটে সায় দিয়েছে।’ বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘এখন আমাদের প্রত্যাশা কয়েকটি দলের দেওয়া নোট অব ডিসেন্ট তুলে নেওয়া। বেশিরভাগ দলও চায় নোট অব ডিসেন্ট তুলে নেওয়া হোক।’
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুই নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কমিশনের নোট অব ডিসেন্ট তুলে নেওয়ার প্রত্যাশা সত্যিকার অর্থে বাড়াবাড়ির পর্যায়ে।’ তারা বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এখন বাধ্য করা নীতিতে হাঁটছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় দেড় ডজন সংস্কার প্রস্তাবে নোট অব ডিসেন্ট দেওয়া আছে। বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিসহ একাধিক রাজনৈতিক দল এগুলো দিয়েছে। তবে বেশিরভাগ নোট অব ডিসেন্ট এসেছে বিএনপির কাছ থেকে। ঐকমত্য কমিশন চায়, যেহেতু বড় ঐকমত্যে আমরা আসতে পেরেছি তাহলে নোট অব ডিসেন্ট সংস্কার প্রস্তাবে থাকা বেমানান। এ প্রসঙ্গে বদিউল আলম বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দল ছাড়া অন্য সব দলই তাদের দেওয়া নোট অব ডিসেন্ট তুলে নিতে চায়। সবার প্রত্যাশা সনদ বাস্তবায়নে থাকা নোট অব ডিসেন্ট উঠে যাক।’ তার দাবি, এগুলো তো জনগণের চাওয়া নয়। একটি রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিগত চাওয়া।
সুপ্রিম কোর্টের বিকেন্দ্রীকরণ ও সংস্কারে নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে। বিচারকদের পদেও মেয়াদ অপসারণ, ন্যায়পাল নিয়োগ, সরকারি কর্ম কমিশন নিয়োগ, মহাহিসাব নিরীক্ষক নিয়ন্ত্রক নিয়োগ, দুর্নীতি দমন কমিশন নিয়োগ, নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ, প্রধান বিচারপতি নিয়োগ, জাতীয় সংসদ নারী প্রতিনিধিত্বের বিধান, উচ্চকক্ষ গঠন, আইনসভা গঠন, উচ্চকক্ষের দায়িত্ব ভূমিকা, উচ্চকক্ষ গঠন, আইনসভা গঠন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদের মেয়াদ, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি, মূলনীতিগুলো ও জরুরি অবস্থা ঘোষণাসংক্রান্ত সংস্কারে নোট অব ডিসেন্ট এসেছে। অবশ্য এর কয়েকটির ওপর থাকা নোট অব ডিসেন্ট আগেই তুলে নিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এখন সব সংস্কার প্রস্তাব থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর দেওয়া নোট অব ডিসেন্ট তুলে নেওয়ার আশাবাদ প্রকাশ করছে।
এদিকে গণভোট নিয়ে ওঠা মতভিন্নতা নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সরকার অধ্যাদেশ জারি করে অথবা আরপিওতে সংশোধনী এনে একটি গণভোট পরিচালনা করার জন্য নির্বাচন কমিশনকে ক্ষমতা প্রদান করতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘গণভোট করা যাবে না এমন কোনো বিধান নেই। সুতরাং নির্বাচন কমিশন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে করতে পারবে। আগে হলেও ফল একই। তবে একই দিনে একটা সুবিধা আছে যে, একই আয়োজন, একই অর্থব্যয় এবং একই লজিস্টিক একবার ভোট সেন্টারে যাওয়া। তাতেই সুবিধা পাওয়া যাবে।’
গতকাল সোমবার সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘আগামী নির্বাচন গুণমানসম্পন্ন ও সবার জন্য গ্রহণযোগ্য করার চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন সালাহউদ্দিন আহমদ। একই আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এ সদস্য বলেন, ‘আমি কোনো দলের নাম নেব না, কেউ কেউ বলছেন, আগে গণভোট হতে হবে, কনস্টিটিউশন অর্ডার করতে হবে, এগুলো আমাদের মনে হয় পরিহার করা উচিত। যারা নির্বাচন বিলম্বিত করতে চায় বিভিন্ন কায়দা-কানুনের মধ্য দিয়ে, সেটাই হচ্ছে চ্যালেঞ্জ।’
এ প্রসঙ্গে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘গণভোটের বিষয়টি আলোচনায় থাকলেও পিআর প্রসঙ্গটি এখন আর আলোচনার কেন্দ্রে নেই। একই দিনে গণভোট ও নির্বাচন এতে কোনো বাধা নেই। শুধু ভোটের সংখ্যা নয়, প্রার্থীদের কর্মসূচি, দৃষ্টি ও প্রস্তাবনাই নির্বাচনের গুণমান নির্ধারণ করবে।’