সুইডিশ একাডেমি ২০২৫ সালে সাহিত্যের নোবেলজয়ী হিসেবে ঘোষণা করেছে হাঙ্গেরির কথাসাহিত্যিক লাসলো ক্রাশনোহোরকাইর নাম। পুরস্কার কমিটি তাদের দাপ্তরিক অভিমতে উল্লেখ করেছে, ‘বিশৃঙ্খলা ও ভয়ের মধ্যে মানবতার শিল্পসত্তাকে যে গদ্য পুনরুজ্জীবিত করে তুলতে সক্ষম, সেই দৃষ্টিনন্দন, বিষণœ অথচ মহিমান্বিত গদ্যরচনার জন্য তিনি এই স্বীকৃতির অধিকারী হলেন।’ এ ঘোষণা বিশ্বের সাহিত্যমহলে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে কেননা, কয়েক বছর ধরে তিনি এবং তার সহযোগী হাঙ্গেরিয়ান লেখক পিটার নাদাস নোবেল পুরস্কারের সবচেয়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় ছিলেন। সাহিত্যে নোবেলের জুয়ার সাইটগুলোর পূর্বাভাসেও তিনি এগিয়ে ছিলেন। ২০২৩ সালেও তিনি ছিলেন নরওয়ের নোবেলজয়ী নাট্যকার ইয়ুন ফসসের ঠিক পরেই। এবার নোবেল বিজয়ের মাধ্যমে লাসলো পাবেন ১০ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার, যা প্রায় ৮ লাখ ৬২ হাজার ১৩৭ ইউরো এবং বাংলাদেশি টাকায় ১২ কোটি টাকার কিছুটা বেশি।
কথাসাহিত্যিক লাসলো ক্রাশনোহোরকাইর জন্ম ১৯৫৪ সালের ৫ জানুয়ারি হাঙ্গেরির ছোট্ট শহর জিউলাতে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি নিভৃতচারী এবং সাধারণ যাপন পছন্দ করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করলেও পরবর্তী জীবনে সাহিত্যই হয়ে ওঠে তার চূড়ান্ত আশ্রয়। প্রায়ই হাঙ্গেরির পাহাড়ি অঞ্চলে একাকী সময় কাটান তিনি, সেখানে লেখালেখি করেন, ঘুরে বেড়ান এবং চীনা ও জাপানি সংস্কৃতির দর্শন নিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন থাকেন। এ নিঃসঙ্গতা ও দার্শনিক অনুসন্ধানই তার রচনাকে দান করেছে একটি অনন্য মাত্রা।
১৯৮৫ সালে প্রকাশিত তার প্রথম উপন্যাস ‘সাতান্তাঙ্গো’ ইউরোপীয় সাহিত্যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এ দুর্বোধ্য অথচ মন্ত্রমুগ্ধকর গদ্যে রচিত উপন্যাসটি একটি গ্রামীণ কাহিনি বর্ণনা করে, যা অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত ও আধ্যাত্মিকভাবে চূড়ান্ত নিঃশেষ-প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল। পরবর্তীকালে খ্যাতনামা পরিচালক বেলা তার (ট) এ উপন্যাসটি চলচ্চিত্রে রূপান্তর করেন, যা আজও বিশ্ব সিনেমার একটি কাল্ট ক্ল্যাসিক হিসেবে বিবেচিত। উল্লেখ্য, তিনি তার ছয়টি বই থেকে চলচ্চিত্র তৈরি করেছেন।
১৯৮৯ সালে প্রকাশিত ‘দ্য মেলানকলি অব রেজিস্ট্যান্স’ নামক তার উপন্যাসকে মানবসভ্যতার পতন ও নৈতিক শূন্যতার এক দার্শনিক কাব্য হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত ‘ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার’ উপন্যাসে একজন সরকারি কেরানির দৃষ্টিকোণ থেকে যুদ্ধ, ইতিহাস ও ভাষার মধ্য দিয়ে টিকে থাকার মানবতার চূড়ান্ত সংগ্রামের চিত্র ফুটে উঠেছে। ২০১৩ সালে প্রকাশিত ‘সেইওবো দেয়ার বিলো’তে তিনি প্রাচ্যের শিল্প, বিশেষত জাপানি নন্দনতত্ত্বকে কেন্দ্র করে এক আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান চালিয়েছেন।
লাসলো ক্রাশনোহোরকাইয়ের গদ্যকে সাহিত্য সমালোচকরা ‘অবিরাম বাক্যের নদী’ বলে আখ্যা দিয়েছে। তিনি প্রায়ই কয়েক পৃষ্ঠা জুড়ে বিস্তৃত দীর্ঘ বাক্যের মাধ্যমে মানবচিন্তা ও সময়ের প্রবাহকে এক সূত্রে গাঁথেন। তার রচনায় গভীর দার্শনিক প্রেরণা এবং একপ্রকার মহাজাগতিক বিষণœতা বিদ্যমান, যেখানে ইতিহাস, ধর্ম, রাজনীতি, প্রকৃতি ও মৃত্যুর ধারণা নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকে। অনেক সমালোচক মনে করেন, ক্রাশনোহোরকাই কেবল শব্দ নয়, বরং বাক্যের মধ্য দিয়েই ‘সময়’কে বুনে তোলেন একজন সূক্ষ্ম শিল্পীর মতো।
২০১৫ সালে ইংরেজি ভাষায় অনূদিত তার সাহিত্যকর্মের জন্য ম্যান বুকার পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। এর আগে তিনি হাঙ্গেরি সরকারের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘কোসুথ পুরস্কার’ও লাভ করেন। সাহিত্যিকমহল তাকে প্রায়ই ফ্রানজ কাফকা, স্যামুয়েল বেকেট বা গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতায় স্থান দেন, যদিও তিনি নিজে কারও সরাসরি অনুকরণ করেন না; বরং ভাষাকেই তিনি এক অস্তিত্ববাদী সংগ্রামের মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করেন। সমকালীন বিশ্বসাহিত্যে লাসলোই এক অনন্য ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর। তিনি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, ভাষা শুধু ভাব প্রকাশের মাধ্যমেই নয়, বরং তা মানবাত্মার গভীরতম অনুরণন। নোবেল কমিটির এ সিদ্ধান্ত শুধু একজন লেখককে স্বীকৃতি দেওয়া নয়, বরং সাহিত্যের মাধ্যমে মানব অভিজ্ঞতার সেই গহিন স্তরকে সম্মান জানানো, যেখানে তিনি নিরন্তর অনুসন্ধান চালিয়ে যান।
* (বিবিসি, নিউ ইয়র্ক টাইমস, সিএনএন ও হাঙ্গেরি টুডে অবলম্বনে)
লেখক : সাহিত্য সম্পাদক, দেশ রূপান্তর