এ বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কার নিয়ে বিশ্বের আগ্রহ এখন চরমে। শুক্রবার (১০ অক্টোবর) স্থানীয় সময় বেলা ১১টায় (০৯০০ জিএমটি) নরওয়ের নোবেল কমিটি বিজয়ীর নাম ঘোষণা করবে। তবে একটি বিষয় প্রায় নিশ্চিত—যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ পুরস্কার পাচ্ছেন না, যতই তিনি নিজেকে শান্তির দূত দাবি করুন না কেন।
নরওয়ের স্যোশালিস্ট লেফট পার্টির বৈদেশিক নীতির মুখপাত্র বলেন, ‘ট্রাম্প এমন একজন ব্যক্তি যিনি যেকোনো কিছু করতে পারেন। তাই আমাদের সব রকম পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।’
দেশটির নোবেল কমিটি স্বাধীনভাবে কাজ করলেও, ট্রাম্প পুরস্কার না পেলে কী ঘটতে পারে তা নিয়ে নরওয়েতে কিছুটা আতঙ্ক বিরাজ করছে।
বিশ্ব এখন অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৬ সালে তারা বৈশ্বিক সংঘাত পর্যবেক্ষণের কাজ শুরু করার পর থেকে ২০২৪ সালের মতো এত বিপুলসংখ্যক রাষ্ট্র-সম্পৃক্ত সশস্ত্র সংঘাত আর দেখা যায়নি।
ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার দাবি করেছেন, তিনি অন্তত আটটি সংঘাতের সমাধান করে নোবেল শান্তি পুরস্কারের যোগ্যতা অর্জন করেছেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্তত এ বছর তাঁর নাম ঘোষণার কোনো সম্ভাবনাই নেই।
সুইডেনের আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক পিটার ভ্যালেনস্টিন এএফপিকে বলেন, ‘না, এ বছর ট্রাম্প নোবেল পাচ্ছেন না। হয়তো পরের বছর তাঁর নানা উদ্যোগ, বিশেষ করে গাজা সংকট নিয়ে পদক্ষেপের ফলাফল স্পষ্ট হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।’
অসলো পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান নিনা গ্রেগার মনে করেন, ট্রাম্পের বহু নীতি নোবেল শান্তি পুরস্কারের মূল দর্শনের পরিপন্থি। তিনি বলেন, ‘আলফ্রেড নোবেলের উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, জাতিগুলোর ভ্রাতৃত্ব ও নিরস্ত্রীকরণকে উৎসাহিত করা। কিন্তু ট্রাম্পের অনেক কর্মকাণ্ড এই নীতির বিপরীত।’
গ্রেগারের মতে, ট্রাম্পের এমন কর্মকাণ্ডের তালিকা দীর্ঘ—তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা ও চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করেছেন, মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেছেন, ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড বলপ্রয়োগে দখলের হুমকি দিয়েছেন, মার্কিন শহরগুলোতে ন্যাশনাল গার্ড পাঠিয়েছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত হেনেছেন।
নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ইয়োরগেন ওয়াতনে ফ্রিডনেস বলেন, ‘আমরা কোনো ব্যক্তিকে বিচার করি তাঁর সামগ্রিক ভূমিকার ভিত্তিতে। শান্তির জন্য বাস্তবে কী অর্জন করা হয়েছে, সেটিই আমাদের বিবেচনায় মূল বিষয়।’
এ বছর শান্তি পুরস্কারের জন্য ৩৩৮ ব্যক্তি ও সংস্থাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। মনোনয়ন তালিকা ৫০ বছর পর্যন্ত গোপন রাখা হয়। সংসদ সদস্য, মন্ত্রিসভার সদস্য, আগের বিজয়ী, নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও কমিটির সদস্যরা মনোনয়ন দিতে পারেন।
২০২৪ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিল জাপানে পারমাণবিক বোমা হামলায় বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের সংগঠন নিহোন হিদানকিও, যারা পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধে কাজ করে আসছে।
চলতি বছর স্পষ্ট কোনো পছন্দের প্রার্থী না থাকায় অসলোজুড়ে এখন নানা নাম ঘুরছে। আলোচনায় আছে সুদানের স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্ক ইমার্জেন্সি রেসপন্স রুমস, যারা যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত মানুষদের সহায়তা করছে।
তালিকায় রয়েছেন প্রয়াত রুশ বিরোধী নেতা অ্যালেক্সি নাভালনির স্ত্রী ইউলিয়া নাভালনায়া, নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা অফিস ফর ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউশনস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর, ফিলিস্তিনের সহায়তা সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ, এমনকি আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)।
অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা যেভাবে চাপে রয়েছে, তাতে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) বা রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স–এর মতো সংগঠনকেও পুরস্কারের সম্ভাব্য তালিকায় দেখা যাচ্ছে।
নরওয়ের ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক হালভার্ড লেইরা মনে করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নোবেল কমিটি আবারও ‘শান্তির ক্ল্যাসিক ধারণা’—মানবাধিকার, গণতন্ত্র, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নারী অধিকার—এর দিকে ফিরে গেছে। তাঁর ভাষায়, ‘আমার ধারণা, এ বছর পুরস্কার এমন কারও হাতে যাবে যিনি বিতর্কিত নন।’
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, নোবেল কমিটি চাইলে আগের অনেক বছরের মতো এবারও সবাইকে চমকে দিতে পারে একেবারে অপ্রত্যাশিত কোনো ব্যক্তিকে বা সংগঠনকে বিজয়ী করে।
সূত্র: এএফপি, দ্য গার্ডিয়ান