শিশুদের শেখার ধরনে, আচরণে এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণে যদি অস্বাভাবিক পরিবর্তন আসে তবে বুঝতে হবে তার কোনো মানসিক সমস্যা তৈরি হচ্ছে। শিশুর বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তার আচরণ এবং আবেগ পরিবর্তিত হতে পারে। অনেক শিশু মূলত দুঃখিত, উদ্বিগ্ন, খিটখিটে বা আক্রমণাত্মক হয়ে পড়ে। আবার মাঝে মাঝে স্থির হয়ে বসে থাকা, মনোযোগ দেওয়া বা অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করাটাকে কঠিন বলে মনে করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এগুলো শুধু সাধারণ বিকাশের পর্যায়গুলো। তবে এ ধরনের আচরণগুলো কিছু শিশুর মধ্যে গুরুতর সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়। ভয় না পেয়ে বাবা-মায়ের উচিত সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা। বিভিন্ন কারণে শিশুদের মানসিক সমস্যা বা রোগ দেখা দেয়।
কারণ
পরিবারে সমস্যা থাকলে, বংশগত মানসিক সমস্যা থাকলে, শারীরিক কোনো রোগ থেকে, বাবা-মায়ের অতিরিক্ত শাসন, পারিপার্শি^ক পরিবেশ, অপ্রত্যাশিত কোনো দুর্ঘটনা।
কীভাবে বুঝবেন শিশুর মানসিক সমস্যা
শিশুর বুদ্ধিমত্তা কম হয় এবং সে অস্বাভাবিক ব্যবহার করলে। মনোযোগের ঘাটতি এবং ভুলে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হলে। বয়সের তুলনায় দৃষ্টিকটু, অগ্রহণযোগ্য এবং নেতিবাচক আচরণ করা। মানসিক রোগে আক্রান্ত শিশুটি সমবয়সী শিশুদের থেকে ভিন্ন এবং অস্বাভাবিক আচার-আচরণ করে থাকে। দিনের অধিকাংশ সময়ই বিষণœতায় থাকলে। দুঃখ বা কষ্টে স্থায়ী হলে। একা থাকার চেষ্টা করা। বাচ্চা অনেক দেরিতে কথা বলা শেখা। বয়স অনুযায়ী ঠিক আচরণ না করা। নিজেকে আঘাত করা। মৃত্যু বা আত্মহত্যার কথা বলা। চরম বিরক্তি। শিশু অতিরিক্ত দুষ্ট হলে এবং বিরক্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করলে। খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন। ওজন কমে যাওয়া। ঘুমাতে অসুবিধা। ঘন ঘন মাথা বা পেটব্যথা, মনোযোগ দিতে অসুবিধা, স্কুলের প্রতি অনাগ্রহ, অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ ও নিজের অনুভূতিগুলো নিয়ন্ত্রণ না করা।
শিশুদের যেসব মানসিক রোগ
শিশুদের বিভিন্ন ধরনের মানসিক রোগ যেমন অটিজম, এডিএইচডি, ডিসলেক্সিয়া, কনডাক্ট ডিজঅর্ডার, শর্ট টার্ম মেমোরি লস, ক্লেপটোম্যানিয়া এবং অপজিশনাল ডেফিয়েন ডিজঅর্ডার প্রভৃতি রোগে ভুগতে পারে।
অটিজম : অটিজম নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার অর্থাৎ মানসিক বিকাশঘটিত সমস্যা। অপর নাম অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার (অঝউ)। এক্ষেত্রে নার্ভ বা নার্ভাস সিস্টেম অর্থাৎ স্নায়ু বা স্নায়ুতন্ত্রের গঠন ও পরিবর্ধন জনিত অস্বাভাবিকতা থাকে। সাধারণত দেড় বছর থেকে ৩ বছর সময়ের মধ্যেই রোগের লক্ষণগুলো দেখা যায়। অটিজমে আক্রান্ত শিশুর স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে অসুবিধা, সামাজিক আচরণে দুর্বল হয়, পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে কম সক্ষম হয়। অটিজমের কারণে কথাবার্তা, অঙ্গভঙ্গি ও আচরণ নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকে আবার অনেক ক্ষেত্রে শিশুর মানসিক ও ভাষার ওপর দক্ষতাও কম থাকে। অটিজমে আক্রান্তদের মাঝে বধিরতা, সেরিব্রাল পালসি, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা, ডাউন সিনড্রোম ইত্যাদি শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের অটিজম হওয়ার আশঙ্কা চার গুণ বেশি।
হাইপার অ্যাকটিভিটি ডিজঅর্ডার : এটেনশন ডেফিসিট হাইপার অ্যাকটিভিটি ডিজঅর্ডার শিশুদের মানসিক রোগ। আক্রান্ত বাচ্চারা অসামাজিক এবং বিশৃঙ্খল আচরণ করে থাকে। এক্ষেত্রে এরা অনেক দুষ্টামি করে, জিনিসপত্র ভাঙচুর করে, খেলায় নিজেই নিয়ম বানায় এবং অন্যদের মানতে চাপ দেয়। পড়ালেখায় অমোযোগী হয়, রুটিন মানতে চায় না, বিনা কারণে, কান্নাকাটি, রাগারাগি এবং চিৎকার চেঁচামেচি করে থাকে।
মস্তিষ্কেনিউরোট্রান্সমিটারের সক্রিয়তা কম থাকার কারণে এমন হতে পারে। কেননা এতে মস্তিষ্ক সঠিক সংবাদ গ্রহণ করতে পারে না। শিশুরা ভালো-মন্দ, সঠিক-বেঠিক ইত্যাদির পার্থক্য করতে পারে না। তাদের আচার-আচরণ দৃষ্টিকটু এবং অগ্রহণযোগ্য হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে জেনেটিক, দূষণজনিত কারণ ও বিভিন্ন মানসিক চাপের ফলে এডিএইচডি রোগটি দেখা দেয়।
ডিসলেক্সিয়া : ডিসলেক্সিয়া শিশুর পড়াশোনার জগতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এই রোগটির কারণে শিশুর পড়ালেখা করতে সমস্যা হয়। বইয়ের অক্ষরগুলো এলোমেলোভাবে নড়তে কিংবা উল্টো করে দেখে থাকে। ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্তদের সেই ক্ষমতা থাকে না এবং যার কারণে ঠিকভাবে অক্ষরগুলো চিনতে পারে না। এমনকি অনেক সময় তারা ক্লাস টিচারদের কথাও সেভাবে বুঝতে পারে না। আবার তাদের একসঙ্গে অনেক প্রশ্ন করা হলে, তারা বিভ্রান্ত হয়ে যায় কিছু বুঝতে পারে না। ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্তরা লাজুক, কাজকর্মে আনাড়ি, আত্মমগ্ন এবং অমিশুক হয়ে থাকে। মনের ভাবও প্রকাশ করতে কিংবা গুছিয়ে কিছু বলতে পারে না।
কনডাক্ট ডিজঅর্ডার : কনডাক্ট ডিজঅর্ডার আচরণগত সমস্যা। শিশুদের ক্রমাগত বাড়তে থাকা দুরন্ত স্বভাব বা অবাধ্যতাকে কনডাক্ট ডিজঅর্ডার বলে। সন্তানের ভেতর যদি দীর্ঘকাল ধরে মিথ্যাচারিতা, নিয়ম না মানা, আক্রমণাত্মক এবং ধ্বংসাত্মক আচরণ বাড়তে দেখা দেয়, বুঝবেন সে কনডাক্ট ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত । কনডাক্ট ডিজঅর্ডার রোগের আসল কারণ অজানা। তবে কিছু বিষয় যেমন জিনগত কারণ, অতিরিক্ত কঠোরতা, প্রতিশোধপরায়ণতা, অত্যধিক আদর, শারীরিক-মানসিক নির্যাতন, উগ্র আচরণ প্রত্যক্ষণ, রোগের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, পরিবেশগত বিষয়ের কারণে এই রোগটি হতে পারে।
ক্লেপটোম্যানিয়া : এই রোগে আক্রান্ত শিশুরা কোনো কারণ ছাড়াই চুরি করে। চুরি করতে না পারলে অনেক বেশি অস্বস্তিতে ভুগে থাকে। ক্লেপটোম্যানিয়া রোগের কোনো স্পষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। গবেষকদের মতে, মস্তিষ্কে সেরোটোনিনের মাত্রা কমবেশি হলে এই সমস্যা দেখা দেয়। বেড়ে উঠার সময়কালের আচরণ এবং ধারণাগত বিবর্তনের ফলেও এমনটা হতে পারে। সঠিক পরিচর্যা করলেই ক্লেপটোম্যানিয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব।
চিকিৎসা
মানসিক রোগের আধুনিক এবং কার্যকর চিকিৎসার মাধ্যমে শিশু সুস্থ-স্বাভাবিক ও সুন্দর জীবনযাপন করতে পারবে। সেক্ষেত্রে সাইকিয়াট্রিক ডাক্তার এবং ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টদের যথাযথ চিকিৎসা প্রয়োজন। নিয়মিত কাউন্সিলিং করা। নিয়ম করে ওষুধ খাওয়াতে হবে। বাচ্চার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করা। শিশুকে পুষ্টিকর ও সুষম খাবার খাওয়াতে হবে। ব্যায়াম করতে উৎসাহিত করা। নিয়মিত পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমাচ্ছে কিনা লক্ষ্য রাখা। বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করতে দিতে হবে। শিশুর আগ্রহ বুঝে, তাকে বিভিন্ন কাজকর্মে উৎসাহ করা। রুটিন অনুযায়ী জীবনযাপন করতে উৎসাহিত করা। শিশুর মানসিক বিকাশে সৃজনশীল কাজ করতে সাহায্য করে।