শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচনের প্রার্থীরা। শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে ব্যতিক্রমী প্রচারণাপত্র নিয়ে হাজির হয়েছেন তারা। ভোটারদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ প্রার্থীরা। নিজেদের মেধা ও সৃজনশীলতার বহুমাত্রিক রূপ দিয়েছেন প্রচারণাপত্র তৈরিতে। বাস, শাটল ট্রেন, প্রজাপতি, ফুটবল, দেশি-বিদেশি মুদ্রার অবয়বসহ বিভিন্ন আকৃতিতে প্রচারণাপত্র তৈরি করেছেন প্রার্থীরা। সাধারণ শিক্ষার্থীরাও খুব আগ্রহ নিয়েই প্রার্থীদের এসব প্রচারণাপত্র সংগ্রহ করেছেন।
গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেলওয়ে স্টেশনে প্রচারণা চালাতে দেখা যায় একজন প্রার্থীকে। তিনি মো. ইকরম হোসেন। ভিজিটিং কার্ডের আদলে প্রচারণাপত্র তৈরি করেছেন তিনি। কেন্দ্রীয় সংসদে নির্বাহী পদে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্রচারণাপত্রে নিজের সাদাকালো ছবির পাশে লিখেছেন ‘ভোট ফর ইকরম’। নির্বাচনী প্রচারণার কাজে ২ টাকার নোটকে বেছে নিয়েছেন ইউনুস মিয়া। তিনি কেন্দ্রীয় সংসদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দপ্তর সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তার ব্যালট নম্বর-২। তার ব্যালট নম্বরকে চিত্রায়িত করতে তিনি ২ টাকার নোটের আকৃতিকে বেছে নিয়েছেন। প্রার্থীদের উদ্দেশে তার প্রচারণাপত্রে লেখা রয়েছে ‘২ নম্বর ব্যালটে ভোট দিন’। তার প্রচারণাপত্রটি টাকার আদলে হওয়ায় এতে লেখা রয়েছে ‘চাকসু ভোট ব্যাংক’।
কেন্দ্রীয় সংসদে এজিএস পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ছাত্রদল মনোনীত প্যানেলের প্রার্থী আইয়ুবুর রহমান তৌফিক। নির্বাচনে তার ব্যালট নম্বর-১। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিজের ব্যালট সম্পর্কে পরিচিত করতে ইংরেজি সংখ্যা ওয়ান-এর আদলে প্রচারণাপত্র ছাপিয়েছেন তৌফিক। নিজের সাদাকালো ছবিসহ এতে যুক্ত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো। এতে ইংরেজিতে লেখা রয়েছে ‘এজিএস ক্যান্ডিডেট’। ‘বিনির্মাণ শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেল থেকে চাকসু নির্বাচনে সহ-যোগাযোগ ও আবাসনবিষয়ক সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন শহিদুল ইসলাম সামি। বিশ্ববিদ্যালয়ের একতলা বাসের আদলে তিনি নিজে প্রচারণাপত্র তৈরি করেছেন। বাসের ওপরেই নিজের সাদাকালো ছবির অবয়ব। তার প্রচারণাপত্রের প্রতীকী বাসের ওপরে লেখা হয়েছে ‘সামির অঙ্গীকার, চক্রাকার বাস হবে সবার।’
চলমান ভ্যাপসা গরমে শিক্ষার্থীদের স্বস্তির সুবাতাস দিতে ব্যতিক্রমী প্রচারপত্র করেছেন বাংলা বিভাগের ২০১৯-২০ সেশনের শিক্ষার্থী মো. শুভ হোসেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তিনি ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলনে গিয়ে ঘাতকের গুলিতে চোখ হারান। দৃষ্টি হারানো এই প্রার্থী সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে অধিকার আদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নেমেছেন ভোটের মাঠে। চাকসু নির্বাচনে শুভ কেন্দ্রীয় সংসদে সমাজসেবা ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক পদে ১২ নম্বর ব্যালটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। হাতপাখার আদলে করা তার প্রচারণাপত্রে তিনি লিখেছেন, আমি ‘২৪-এর জুলাইয়ে দৃষ্টি হারিয়েছি, আমার অন্ধত্ব তখনই সার্থক হবে যখন আপনার দলান্ধতা ও আবেগ পরিহার করে যোগ্য ব্যক্তিকে ভোট দেবেন।
ছবির ফ্রেমের আকৃতিতে প্রচারণাপত্র সাজিয়েছেন কেন্দ্রীয় সংসদের প্রার্থী আশরাফুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট ও আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তার ব্যালট নম্বর-২। তার সাদাকালো ছবির পেছনে দেওয়া আছে সাদা গ্লোবের আকৃতি। প্রচারণাপত্র তৈরিতে সাদাকালো ফুটবলের আকৃতিকে বেছে নিয়েছেন মো. সজিব। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল মনোনীত প্যানেলের হয়ে সোহরাওয়ার্দী হল সংসদে খেলাধুলা ও ক্রীড়া সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
শাটল বাসের আদলে প্রচারণাপত্র সাজিয়েছে সায়েম উদ্দিন আহমেদ। তিনি ছাত্রদল মনোনীত প্যানেলের যোগাযোগ ও আবাসনবিষয়ক সম্পাদক পদে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তার ব্যালট নম্বর-১৭। সায়েমের প্রচারণাপত্রের একপাশে দেখা যায়, দোতলাবিশিষ্ট একটি শাটল বাসের আবরণ। আর প্রচারণাপত্রের অন্য পিঠে তার ছবিযুক্ত নির্বাচনী ইশতেহার। ভোটারদের পরামর্শ নেওয়ার জন্য রয়েছে একটি বারকোড।
বাংলাদেশের মানচিত্রের আদলে প্রচারণাপত্র সাজিয়েছে মুহাম্মদ রায়হান উদ্দিন। তিনি শাহাজালাল হল সংসদে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। বারকোডে দিয়ে রেখেছেন তিনি নির্বাচনী ইশতেহার। টাকার নোটের আদলে প্রচারণাপত্র তৈরি করেছেন একাধিক প্রার্থী। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন কেন্দ্রীয় সংসদের স্বতন্ত্র সাধারণ সম্পাদক (জিএস) প্রার্থী নূর মোহাম্মদ বাপ্পী। ব্যালট নম্বর-৭-এর সঙ্গে মিল রেখে করেন ৭ টাকার নোট। নোটের একপাশে দিয়ে রেখেছেন বারকোড, যার মাধ্যমে জানা যাবে নির্বাচনী ইশতেহার। সোহরাওয়ার্দী হল সংসদের এজিএস প্রার্থী রেসালাত লিছানও করেছেন একই আদলে প্রচারণাপত্র। বাস্তবে ৩ টাকার নোট না থাকলে ব্যালট নম্বরের সঙ্গে মিল রেখে করেছেন ৩ টাকার নির্বাচনী প্রচারণাপত্র।
প্রজাপতির আদলে প্রচারণাপত্র করেছেন আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি কেন্দ্রীয় সংসদে স্বতন্ত্র থেকে এজিএস পদে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। জুলাইয়ে পোস্টারবয় হিসেবে খ্যাত মামুনের ব্যালট নম্বর-৩। বাদ যাননি বন্দুকের আকৃতিও। বন্দুকের আদলে প্রচারণাপত্র বানিয়ে আলোচনায় রয়েছেন মো. মাহবুবুল হাসান। তিনি কেন্দ্রীয় সংসদে নির্বাহী সদস্য পদে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তার ব্যালট নম্বর-৪৭।
ফার্মাসি বিভাগের শিক্ষার্থী এ কে এম হাসিবুল কবির। তিনি কেন্দ্রীয় সংসদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তার ব্যালট নম্বর-২। স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক পদের সঙ্গে মিল রেখে তিনি নিজের প্রচারণাপত্রে অন্যন্যতার ছোঁয়া দিয়েছেন। ওষুধের কৌটার সঙ্গে মিল রেখে তিনি তার প্রচারপত্র তৈরি করেছেন। এতে বিভিন্ন রোগের ওষুধের বিবরণসহ নানা রকম দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য তিনি লিখেছেন। এ কে এম হাসিবুল কবিরের বন্ধু ফার্মাসি বিভাগের শিক্ষার্থী আহনাফ জামান তমাল। তিনি বন্ধুর প্রচারণাপত্র হাতে নিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। ব্যতিক্রমী প্রচারণাপত্র তৈরির পেছনের গল্প বলতে গিয়ে তিনি জানান, আমার বন্ধু চাকসু নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। তাকে আমি সমর্থন জানাই। সাধারণ শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে এবং তাদের ভোটে টানতে ব্যতিক্রমী প্রচারণাপত্র তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে বন্ধু হাসিবুল।
ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে আচরণ বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ : চাকসু নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থী জিহাদ হোসাইনের বিরুদ্ধে আচরণ বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচনী প্রচারণায় পাহাড়ি নারীদের পোশাক পরা ছবি নিজের ফেসবুক আইডিতে আপলোড করার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। অবশ্য সমালোচনার মুখে সেই ছবি নিজের আইডি থেকে ডিলিট করে ক্ষমা চেয়েছেন তিনি। আপলোড করা সেই ছবির নিচে লেখা ছিল ‘সম্প্রীতির বাংলাদেশ’। জিহাদ হোসাইনের ওই পোস্টের কারণে নির্বাচনের আচরণবিধি লঙ্ঘিত হয়েছে বলে অভিযোগ গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট সমর্থিত ‘বৈচিত্র্যের ঐক্য’ প্যানেলের প্রার্থীদের।
গতকাল শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নির্বাচন কমিশনকে এ বিষয়ে বৈচিত্র্যের ঐক্য প্যানেলের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। বৈচিত্র্যের ঐক্য প্যানেলের সহসভাপতি ভিপি প্রার্থী ধ্রুব বড়ুয়া বলেন, ‘সংস্কৃতি ও প্রকাশনা সম্পাদক প্রার্থী জিহাদ হোসাইন গতকাল শুক্রবার নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে দুটি ছবি পোস্ট করেছেন। পোস্টে পাহাড়ি সংস্কৃতিকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এটি একটি সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক অনুভূতিতে আঘাত আনে। এ ধরনের কাজ আচরণবিধির ৫ এর ‘গ’ ও ১০ এর ‘ক’ ধারার লঙ্ঘন।
বৈচিত্র্যের ঐক্য প্যানেলর জিএস প্রার্থী সুদর্শন চাকমা বলেন, ‘পাহাড়ি নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পুরুষদের দিয়ে পরিয়ে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা একটি জাতির সংস্কৃতিকে অবমাননা করার শামিল। এটা যেকোনো জাতির জন্য মানহানিকর এবং আমাদের সম্প্রদায়ের অনুভূতির ওপর সরাসরি আঘাত, যা চাকসু নির্বাচন আচরণবিধি লঙ্ঘন।’ অভিযোগের বিষয়ে নির্বাচনের প্রধান কমিশনার অধ্যাপক মনির উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আমরা অভিযোগ পেয়েছি। এ বিষয়ে আমাদের আচরণবিধি কমিটির পরিচালক নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক আমির মুহাম্মদ নসরুল্লাহর সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন।’
জানতে চাইলে শিবির সমর্থিত প্যানেলের সহসাহিত্য, সংস্কৃতি ও প্রকাশনা সম্পাদক প্রার্থী জিহাদ হোসাইন সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘পাহাড়িদের পোশাক সম্পর্কে তার সম্পূর্ণ জানা ছিল না। তিনি ছবির মাধ্যমে সম্প্রীতির বার্তা দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার অজ্ঞতার কারণে বিষয়টি ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। এ ঘটনায় ইতিমধ্যে তিনি ক্ষমা চেয়েছেন।
উল্লেখ্য, চাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের আচরণবিধিতে ‘ব্যক্তিগত আক্রমণ, ধর্মীয় বা বর্ণবৈষম্যমূলক উসকানি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয় এমন বক্তব্য বা পোস্টও আচরণবিধিতে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়, ‘নির্বাচনী প্রচারণার সময় ব্যক্তিগত চরিত্র, লিঙ্গ বা সম্প্রদায় নিয়ে আক্রমণাত্মক, উসকানিমূলক বা মানহানিকর মন্তব্য করা যাবে না। এ ছাড়া ‘শ্রেণিকক্ষ বা করিডরে কোনো ধরনের নির্বাচনী প্রচারণা বা মিছিল করা যাবে না’ বলে উল্লেখ রয়েছে।’