ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি শুক্রবার সকালে কার্যকর হওয়ার পর গাজার বিভিন্ন অংশ থেকে আংশিকভাবে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেওয়ার কথা জানিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। ফলে ছেড়ে যাওয়া বাড়িঘরে ফিরছেন বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা। সমঝোতা অনুযায়ী গাজার ভেতরেই অন্য স্থানে সেনা সরিয়ে আনা হয়েছে বলে জানিয়েছে আইডিএফ। এরপরও গাজার অর্ধেকের বেশি অংশ এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণেই থাকছে। যুদ্ধ-পরবর্তী গাজার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে প্যারিসে বৈঠক করেছে ইউরোপীয় ও আরব দেশগুলো। এদিকে, গাজায় হামাস ও অন্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি ইসরায়েলি নাগরিকরা আগামীকাল সোমবার ঘরে ফিরবেন বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে ওই দিন ২০ জন জীবিত ও ২৮ জন মৃত জিম্মির দেহ হস্তান্তর করা হবে। অন্যদিকে, গাজায় ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করা হচ্ছে একের পর এক মরদেহ। বার্তাসংস্থা ওয়াফা নিউজ জানিয়েছে, শুক্রবার গাজার বিভিন্ন হাসপাতালে ১৫৫টি মরদেহ আনা হয়। যার মধ্যে ১৩৫টি মরদেহই ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে হাজারো ফিলিস্তিনিকে উত্তর গাজার পথে ছুটতে দেখা গেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইসরায়েলি বাহিনীর তুমুল বোমাবর্ষণের সাক্ষী হয়েছে এ এলাকাটি। প্রথম পর্যায়ের চুক্তি অনুযায়ী, হামাস সব ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দিতে আগামীকাল সোমবার স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা পর্যন্ত (বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টা) পর্যন্ত সময় পাচ্ছে। এ জিম্মিদের মধ্যে ২০ জন এখনো জীবিত বলে অনুমান করা হচ্ছে। বাকি ২৮ জিম্মির মৃতদেহ ফেরত দিতে হবে। এর পাল্টায় ইসরায়েলও তাদের কারাগারগুলোতে যাবজ্জীবন সাজা ভোগ করতে থাকা প্রায় আড়াইশ ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দেবে। গাজা থেকে আটক আরও ১ হাজার ৭০০ ফিলিস্তিনিকেও ছেড়ে দেওয়ার কথা তাদের। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ত্রাণবাহী লরিরও গাজায় বাধাহীনভাবে ঢুকতে পারার কথা। বিবিসি জানিয়েছে, শুক্রবার থেকে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডটিতে প্রতিদিন প্রায় ৬০০টি ত্রাণবাহী লরি প্রবেশের কথা থাকলেও এর বিস্তারিত জানা যায়নি। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর অতিরিক্ত ত্রাণ ফিলিস্তিনিদের কাছে পৌঁছেছে কি না তাও নিশ্চিত হতে পারেনি তারা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ইসরায়েলি সেনারা গাজার সিটির উত্তর-পশ্চিম প্রান্ত থেকে পূর্বে দিকে সরে গেছে। দক্ষিণে খান ইউনিস থেকেও কিছু সেনা প্রত্যাহারের খবর মিলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) বলেছে, নতুন মোতায়েন লাইন বরাবর সেনাদের সরিয়ে নেওয়া শুরু করেছে। তবে দক্ষিণ কমান্ডের আইডিএফ সেনারা ওই এলাকায় মোতায়েন আছে এবং যেকোনো তাৎক্ষণিক হুমকি মোকাবিলার কাজ চালিয়ে যাবে, বিবৃতিতে বলেছে তারা। ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ বলেছেন, আইডিএফের সেনাদের ‘হলুদ দাগ’ বরাবর সেনা সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড নিশ্চিত করছে।
এদিকে, গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পর ভূখ-টির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে বৈঠক করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ইউরোপীয় ও আরব দেশগুলো। বৃহস্পতিবার তারা এই বৈঠক করে। ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, গাজায় যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে কীভাবে অবদান রাখা যায় সে বিষয়গুলো নিয়েই বৈঠকে দেশগুলো আলোচনা করেছে। এই আলোচনা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রকেও জানানো হবে যাতে তারা সমন্বয় করতে পারে, বলেন তিনি। তবে ইউরোপীয় ও আরব দেশগুলোর কর্মকর্তারা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, এখনো কিছু ফাঁক রয়ে গেছে যেগুলো পূরণ করা প্রয়োজন। কর্মকর্তারা বলেছেন, লক্ষ্য হচ্ছে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা যাতে যুদ্ধবিরতির এবং স্থায়ী শান্তির পথে আগানোর সুযোগ হারিয়ে না যায়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এর পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কায়া কাল্লাস সাংবাদিকদের বলেছেন, আমাদের যুদ্ধের পরের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করা দরকার। যাতে সেটি টেকসই হয়। প্যারিসের বৈঠকে যারা অংশ নিয়েছেন তাদের মধ্যে ছিলেন গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তির মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতারের প্রধানমন্ত্রী, মিসর ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও, যারা হামাসকে চুক্তিতে রাজি করাতে ভূমিকা রেখেছেন। বৈঠকে আরেকটি যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে তা হলো গাজায় আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েন এবং শান্তিরক্ষী বাহিনীর জন্য জাতিসংঘের ম্যান্ডেট পাওয়া। কূটনীতিকরা বলছেন, ইন্দোনেশিয়াসহ আরও অনেক দেশেই এই বাহিনীতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
অন্যদিকে, বোমাবর্ষণ বন্ধ ও ইসরায়েলি সেনারা জনবহুল এলাকা থেকে সরে যাওয়ার পর উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা মরদেহ উদ্ধার করছেন। বার্তাসংস্থা ওয়াফা নিউজ জানিয়েছে, গতকাল শুক্রবার গাজার বিভিন্ন হাসপাতালে ১৫৫টি মরদেহ আনা হয়। যার মধ্যে ১৩৫টি মরদেহই ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করা হয়েছে। ওয়াফার তথ্য অনুযায়ী, ৪৩টি মরদেহ পাঠানো হয়েছে গাজা সিটির আল-শিফা হাসপাতালে। ৬০টি মরদেহ একই অঞ্চলের আল-আহলি আরব হাসপাতালে, চারটি নুসেইরাতের আল-আওদা হাসপাতালে, ১৬টি দেঈর এল-বালার আল-আকসা শহীদ হাসপাতালে এবং ৩২টি মরদেহ খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।