ট্রাম্প নিয়ে উল্লাস নেতানিয়াহুকে দুয়ো

হামাসের কাছ থেকে জিম্মিদের মুক্ত করতে না পারায় দীর্ঘদিন ধরেই খোদ ইসরায়েলে চাপের মুখে আছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। চলতি বছর বেশ কয়েকবার ইসরায়েলজুড়ে নেতানিয়াহুবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষকদের অনেকের ধারণা, নিজের ওপর থেকে অভ্যন্তরীণ চাপ কমাতেই ট্রাম্পের ২০ দফা প্রস্তাবনাতে সম্মত হয়েছেন নেতানিয়াহু এবং সেটি সরকারের কাছে অনুমোদনও পাইয়ে দিয়েছেন। কিন্তু তাতে যে সাধারণ ইসরায়েলিদের মন ভরেনি তা বলাই যায়। হামাসের হাতে থাকা ইসরায়েলি জিম্মিদের সম্ভাব্য মুক্তির আগে তেল আবিবের এক সমাবেশে অংশ নিয়েছে লাখ লাখ মানুষ। সেই সমাবেশে নিজ দেশের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে দুয়ো দিয়ে ট্রাম্পের নামে সেøাগান দিয়েছেন লাখ লাখ ইসরায়েলি।

গত শনিবার রাতে তেল আবিবে এই বিশাল সমাবেশে বক্তব্য দেন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ, ট্রাম্পের কন্যা ইভাঙ্কা ও জামাতা জ্যারেড কুশনার। নিজ বক্তব্যে উইটকফ বলেন, জিম্মিরা ঘরে ফিরে আসছে। তিনি গাজা যুদ্ধবিরতি ও জিম্মিদের ফেরানোর বিষয়টিকে সম্ভব করে তোলায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশংসা করেন। সমাবেশে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়ে ব্যানার নিয়ে এসেছিলেন ইসরায়েলিরা। তবে পরিস্থিতি পাল্টে যায় যখন উইটকফ চুক্তির আলোচনায় নেতানিয়াহুর ভূমিকার প্রশংসা করতে শুরু করেন। তিনি ‘প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু’, বলতেই জনতা দুয়োধ্বনি দেয় এবং নেতানিয়াহুর সমালোচনা করে ট্রাম্পের নামে সেøাগান দিতে শুরু করে। উইটকফ পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, আমি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একত্রে কাজ করেছি, তিনি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ ছিলেন। পরে তিনি নেতানিয়াহু এবং স্ট্র্যাটেজিক অ্যাফেয়ার্সমন্ত্রী রন ডার্মারের দীর্ঘ প্রশংসা করেন। যখনই তিনি ট্রাম্পের নাম উল্লেখ করেন, তখনই উল্লাসধ্বনি শোনা যায়।

প্রধানমন্ত্রীর নামে এমন দুয়োধ্বনি দেওয়ায় ক্ষেপেছেন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির মন্ত্রীরা। তারা বিক্ষোভকারীদের সমালোচনা করেছেন। শিক্ষামন্ত্রী ইয়োভ কিসচ প্রতিবাদকারীদের ‘ইসরায়েলি সমাজের চরমপন্থি অংশ’ বলে অভিহিত করেন। আর বিচারমন্ত্রী ইয়ারিভ লেভিন এটিকে ‘বিরাট কলঙ্ক’ এবং ‘অকৃতজ্ঞতার লজ্জাজনক প্রদর্শন’ বলে বর্ণনা করেন। লিকুদ পার্টি এক বিবৃতিতে বলেছে, যতটা চিৎকারই করুন না কেন, আপনারা সত্যকে দুয়ো দিচ্ছেন। তেল আবিবের সমাবেশে অংশ নেওয়া আভিভ হাভরনের পরিবারের বেশ কয়েক সদস্যকে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরে হামাসের হামলার সময় হত্যা করা হয়েছিল। তার পরিবারের আরও ৭ জনকে অপহরণ করা হয়েছিল তখন। বিবিসিকে তিনি বলেন, এটা কমিউনিটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ যে তারা ফিরে আসছে। এটা ছাড়া আমরা আমাদের জীবন আবার শুরু করতে পারি না। আমার বোনেরা ও দুই ভগ্নিপতি খুন হয়েছিল। পরিবারের ৭ জনকে অপহরণ করা হয়েছে, আমার সবচেয়ে বড় বোন অপহৃত, তার কন্যা, তার নাতি। কমিউনিটির চার জনের মৃতদেহ এখনো গাজায়। সমাবেশে অংশ নেওয়া শুলামিট ও ডেভিড গিনাট বলছেন, সব জিম্মিদের অবশ্যই রক্ষা করা দরকার। তারা আমাদের ভাই ও বোন। আমরা ক্ষত কাটিয়ে ওঠতে চাই। আমরা যুদ্ধ বন্ধ করে ক্ষত উপশম করতে চাই।

এদিকে, ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা বলছেন, ইসরায়েলি সেনা সরে যাওয়ার পর গত দুই দিনে প্রায় ৫ লাখ মানুষ গাজার উত্তরাঞ্চলে ফিরে এসেছে। যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি মুক্তি সমঝোতার আওতায় হামাসকে  আজ সোমবার স্থানীয় সময় বারোটা পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছিল ৪৮ জিম্মির সবাইকে মুক্তি দেওয়ার জন্য। এর মধ্যে ২০ জন জীবিত বলে মনে করা হয়। হামাসের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা ওসামা হামদান এএফপিকে বলেছেন, সমঝোতা অনুযায়ী সোমবার সকালে বন্দি বিনিময় শুরু হবে। গাজায় ইসরায়েলি সেনারা যেসব এলাকা ছেড়ে গেছে, সেখানকার নিয়ন্ত্রণের জন্য হামাস তাদের যোদ্ধাদের মোতায়েন করেছে। অবশ্য কে গাজা শাসন করবে এই অনিশ্চয়তা ও অভ্যন্তরীণ সহিংসতার আশংকার মধ্যে এটাই প্রত্যাশিত ছিল। হামাস ও গাজার কিছু গোষ্ঠীর মধ্যে সশস্ত্র সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।

যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি মুক্তি সমঝোতা অনুযায়ী গাজায় আরও ত্রাণবাহী লরি যাওয়ার কথা। কিন্তু বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানিয়েছে, বিপুলসংখ্যায় ত্রাণবাহী লরি এখনো গাজায় প্রবেশ করেনি। সংস্থাটি বলছে, তাদের লক্ষ্য শহরজুড়ে ১৪৫টি জায়গায় নিয়মিত খাদ্য বিতরণ আবার শুরু করা। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী বলেছে, বৃহস্পতিবার ৫০০ ট্রাক ত্রাণ গাজায় প্রবেশ করেছে। জাতিসংঘের মতে, গাজার প্রায় ৫ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষের মধ্যে আছে।

অন্যদিকে গাজায় যুদ্ধ অবসানের সমঝোতা চূড়ান্ত করতে একটি শীর্ষ বৈঠক আয়োজনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে মিসর। দেশটির প্রেসিডেন্টের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইমানুয়েল মাখোঁ ও কিয়ার স্টারমারসহ প্রায় ২০ নেতা শারম আল-শায়েখে আজ ওই বৈঠকে অংশ নেবেন।