গাজায় যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপের শর্ত অনুযায়ী, আজ ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তি দেবে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস। যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি মুক্তি সমঝোতার আওতায় হামাসকে সোমবার স্থানীয় সময় ১২টা পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছিল ৪৮ জিম্মির সবাইকে মুক্তি দেওয়ার জন্য। এর মধ্যে ২০ জন জীবিত বলে মনে করা হয়। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর গাজায় ঢুকছে ত্রাণবাহী ট্রাক। গাজার বিভিন্ন স্থানে গতকাল রবিবার সকাল থেকেই ঢুকছে ডজন ডজন ত্রাণবাহী ট্রাক। মিসরের কাছে রাফা সীমান্ত ক্রসিংয়ে ট্রাকের সারি দেখা গেছে। এদিকে, গাজায় যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে একটি চুক্তি চূড়ান্ত করতে মিসরের লোহিত সাগর তীরবর্তী অবকাশযাপন শহর শারম আল-শেখে আজ একটি আন্তর্জাতিক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বিশ্বের ২০ জনেরও বেশি নেতা উপস্থিত থাকবেন বলে গত শনিবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন মিসরের প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র।
ট্রাম্পের পরিকল্পনার প্রথম ধাপে সব ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দেওয়ার বিষয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে হামাস ও ইসরায়েল। জিম্মিদের মুক্তির বিনিময়ে ইসরায়েল প্রায় দুই হাজার ফিলিস্তিনি বন্দিকে ছেড়ে দেবে। শনিবার এক সাক্ষাৎকারে হামাস কর্মকর্তা ওসামা হামদান এএফপিকে বলেন, সই হওয়া চুক্তি অনুযায়ী, সোমবার সকাল থেকে জিম্মি-বন্দিবিনিময় শুরু হবে। ধারণা করা হয়, হামাসের হাতে আটক ইসরায়েলি জিম্মির সংখ্যা ৪৮। এর মধ্যে ২০ জন জীবিত বলে মনে করা হয়।
জীবিত ও মৃত জিম্মিরা ছাড়াও ২০১৪ সালে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া এক ব্যক্তির দেহাবশেষ ফেরত দেওয়ার কথা রয়েছে। এর বিনিময়ে, ইসরায়েল ২৫০ জন ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেবে, যাদের মধ্যে কয়েকজন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি রয়েছেন। পাশাপাশি গাজার ১ হাজার ৭০০ বাসিন্দাকেও মুক্তি দেওয়া হবে। গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনী তাদের আটক করে। ইসরায়েলি কারা কর্র্তৃপক্ষ বলেছে, মুক্তি দেওয়ার আগে ২৫০ বন্দিকে দুটি কারাগারে জড়ো করা হয়েছে।
যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে একটি চুক্তি চূড়ান্ত করতে মিসরের লোহিত সাগর তীরবর্তী অবকাশযাপন শহর শারম আল-শেখে একটি আন্তর্জাতিক শীর্ষ সম্মেলন হবে। সোমবারের এ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বিশ্বের ২০ জনেরও বেশি নেতা উপস্থিত থাকবেন বলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন মিসরের প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র। বিবৃতিতে বলা হয়, গাজা যুদ্ধ শেষ করতে একটি চুক্তি সম্পন্ন করাই এ সম্মেলনের মূল কাজ হবে। গাজা ভূখণ্ডের যুদ্ধ শেষ করার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা অর্জনের প্রচেষ্টাগুলোকে শক্তিশালী করা এ সম্মেলনের লক্ষ্য। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, এ অঞ্চলে শান্তি অর্জনের জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্বব্যাপী সংঘাত নিরসনে তার নিরলস প্রচেষ্টার ফলশ্রুতিতে এ সম্মেলন হচ্ছে। বিবিসি জানিয়েছে, মিসরের এ বিবৃতির আগেই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ সম্মেলনে উপস্থিত থাকার কথা নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর গাজায় ঢুকছে ত্রাণবাহী ট্রাক। গাজার বিভিন্ন স্থানে রবিবার সকাল থেকেই ত্রাণবাহী ট্রাক ঢুকতে শুরু করে। মিসরের কাছে রাফা সীমান্ত ক্রসিংয়ে ট্রাকের সারি দেখা গেছে। ত্রাণ সংস্থাগুলো বলেছে, যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় তারা গাজায় খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সাহায্যের বন্যা বইয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। গাজায় ইসরায়েলের হামলায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এবং ত্রাণ প্রবেশের কড়াকড়ির কারণে এতদিন বহু ফিলিস্তিনি ক্ষুধার্ত ছিল। জাতিসংঘ ও অন্যান্য সংগঠনও ত্রাণ সরবরাহে বাধার মুখে পড়েছিল। জাতিসংঘের মতে, গাজায় মানবিক সংকট দূর করতে প্রতিদিন ন্যূনতম অন্তত ৬০০ ট্রাক ত্রাণ প্রবেশ করা প্রয়োজন। তবে এখনো এ পরিমাণ ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় প্রবেশ না করলেও সামনের দিনগুলোতে আরও ট্রাক ঢুকবে বলে জানানো হয়েছে বিবিসির খবরে। এতে গাজায় মানবিক ত্রাণ সহায়তা বাড়ার আশা সৃষ্টি হয়েছে।
অন্যদিকে, যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার পর উত্তর গাজার বাস্তুচ্যুত বাসিন্দারা নিজ এলাকায় ফিরতে শুরু করেছেন। দুই বছর ধরে চলা যুদ্ধে ইসরায়েলি বোমায় তাদের বাড়িঘর ও আশপাশের এলাকা পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ইসরায়েলকে সেখানে অবিলম্বে তাঁবু ও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র (ক্যারাভান) সরবরাহের অনুমতি দিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের আবাসন অধিকারবিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার বালাকৃষ্ণ রাজাগোপাল। তিনি বলেন, উত্তর গাজার যেসব এলাকা থেকে ইসরায়েলি সেনারা সরে গেছেন, সেখানে ফিরে ফিলিস্তিনিরা ধ্বংসস্তূপ ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পাচ্ছেন না। আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাজাগোপাল আরও বলেন, যুদ্ধের মানসিক প্রভাব ও আঘাতের মাত্রা ভয়াবহ। উত্তর গাজায় ফিরে আসা লোকজনের মধ্যে আমরা এখন সেটাই স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি।