শিক্ষকদের ওপর ‘হামলা’ আজ থেকে কর্মবিরতি

২০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়াসহ তিন দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষকদের ওপর পুলিশের ব্যাপক হামলার ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান নিক্ষেপে অন্তত অর্ধশত শিক্ষক আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের মধ্যেই পুলিশ বেশ কয়েকজন শিক্ষককে আটক করেছে।

গতকাল রবিবার সকাল ১০টা থেকে প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান নেন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে শিক্ষকদের একটি প্রতিনিধিদল অর্থ মন্ত্রণালয়ের আহ্বানে সচিবালয়ে যান।  সেখানে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

তবে সুনির্দিষ্ট আশ্বাস না পাওয়ায় এ বৈঠক ফলপ্রসূ হয়নি বলে জানান শিক্ষক নেতারা। হামলা ও আটকের প্রতিবাদে আজ  সোমবার থেকেই লাগাতার কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা। গতকাল বিকেলে শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচিতে এ ঘোষণা দেন এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব অধ্যক্ষ দেলোওয়ার  হোসেন আজিজী।

সরেজমিনে দেখা গেছে, জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোটের আহ্বায়ক অধ্যক্ষ মাঈন উদ্দিন ও সদস্য সচিব অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন আজিজী প্রেস ক্লাবের সামনে দুইটি  ঘোষণা দেন। একটি হলো,  প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে সরে তারা শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন এবং দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ঢাকা ছাড়বেন না। দ্বিতীয়টি হলো, আজ থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস বর্জন করবেন। ঘোষণার পর দুপুর দেড়টার দিকে তাদের  নেতৃত্বে শিক্ষকদের একটি পক্ষ বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শহীদ মিনারের দিকে চলে যায়। অন্যদিকে আরেক পক্ষ প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান নিয়ে সচিবালয় অভিমুখে লংমার্চ কর্মসূচি  ঘোষণার দাবি তোলে। তারা শহীদ মিনারে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। শিক্ষকদের একাংশ শহীদ মিনারে চলে যাওয়ার পর দুপুর ১টা ৫০ মিনিটের দিকে প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান করা বাকি শিক্ষকদের সরাতে অ্যাকশনে যায় পুলিশ। প্রথমে জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে পুলিশ। এরপর লাঠিচার্জ শুরু করে। এতে বেশ কয়েকজন শিক্ষক রাস্তায় পড়ে যান এবং আহত হন। মূল বেতনের ২০ শতাংশ বাড়িভাড়া ভাতা, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের চিকিৎসাভাতা ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা করা এবং এমপিওভুক্ত কর্মচারীদের উৎসব ভাতা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭৫ শতাংশ করার দাবিতে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন শিক্ষক-কর্মচারীরা। দুপুর ১টা ৫৫ মিনিটে পুলিশ জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সড়ক থেকে শিক্ষকদের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে চলে যেতে বলে। কিন্তু শিক্ষকদের একটা অংশ তা মানতে রাজি হয়নি। তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে ভুয়া ভুয়া বলতে থাকে। একপর্যায়ে পুলিশ পর পর  বেশ কিছু সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে ও লাঠিচার্জ করে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সড়ক থেকে শিক্ষকদের সরিয়ে দেয়। প্রেস ক্লাবের সামনে জলকামানও আনা হয়। এতে কয়েকজন শিক্ষক গুরুতর আহত হন। আহতদের মধ্যে তিনজন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।

জানা গেছে, গতকাল বিকেলে শহীদ মিনারে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অবস্থান কর্মসূচিতে একাত্মতা জানান জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন, যুগ্ম সদস্য সচিব ফয়সাল মাহমুদ শান্ত, জয়নাল আবেদীন শিশির প্রমুখ। হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, রাস্তায় শিক্ষকদের যেভাবে পেটানো হয়েছে এটি কোনো সভ্য রাষ্ট্রীয় চরিত্র হতে পারে না। অনতিবিলম্বে এই হীনকাজের জন্য সরকারকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের শিক্ষক যারা আছেন তারা ১২ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে অনেকে চাকরি শুরু করেন। আমার পরিচিত একজন শিক্ষক আছেন, ৩২ বছর ধরে চাকরি করেন। এই সময় পরে ওনার বেতন হয়েছে ২২ হাজার টাকা। এক কেজি ইলিশ মাছের দাম ২ হাজার ৮০০ টাকা। ৩১ বছর চাকরি করে যে বেতন হয় তার ১৫ শতাংশ দিয়ে এক  কেজি ইলিশ কিনতে হয়। অথচ এই বেতনের ২০ শতাংশও বাড়িভাড়া দেওয়া হয় না।

এনসিপি নেত্রী সামান্তা শারমিন বলেন, অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রত্যেক উপদেষ্টা নিজের আখের গোছানোর কাজ করে  রেখেছেন। শুধু তাই নয়, এ ইন্টেরিম গভর্নমেন্টও আজ দেশের মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে। তারা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে। খবর পেলাম তারা নাকি ৩০০ কোটি টাকা দিয়ে কোনো কোনো মন্ত্রণালয়ে গাড়ি কিনছেন। অথচ শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর কথা বললেই তাদের কাছ  থেকে শুনতে হয় সরকারের কাছে টাকা নেই।

শিক্ষা উপদেষ্টার সমালোচনা করে সামান্তা শারমিন বলেন, বর্তমান শিক্ষা উপদেষ্টাকে নিয়োগের পর আমরা মনে করেছিলাম, তিনি নিজে যেহেতু শিক্ষক, সেজন্য শিক্ষকদের অবহেলার জায়গাটা বুঝবেন। তার বিষয়ে সব পক্ষের অভিযোগ তিনি কাউকে সময় দিতে চান না।

এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব অধ্যক্ষ দেলোওয়ার হোসেন আজিজী বলেন, আমাদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে পুলিশ হামলা করেছে। এর প্রতিবাদে  আজ (সোমবার) থেকে সারা বাংলাদেশের ৩০ হাজার এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত লাগাতার কর্মবিরতি চলবে। আমরা পুলিশি হামলার প্রতিবাদে কর্মবিরতি একদিন এগিয়ে নিয়ে এসেছি।

হাসাপাতাল সূত্র জানায়, আহত শিক্ষকদের মধ্যে মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম কাজলের (৪০) মাথায় লাঠির আঘাত, গণপতি হাওলাদারের (৩২) বাম পায়ে আঘাত ও মো. আক্কাস আলী (৫৫) ডান পায়ের উরুতে আঘাত লেগেছে।

পুলিশের হামলার শিকার খিলগাঁও মডেল স্কুলের শিক্ষক আজিবর আলী বলেন, ‘সরকার শিক্ষকদের দাবি পূরণে গড়িমসি করছে। চাকরি করছি ১৭ বছর। তার মধ্যে আন্দোলন করেই ১৫ বছর পার। এভাবে আর কতদিন আন্দোলনে আসা যায়?  সেজন্য আমরা চেয়েছিলাম আজই এর একটা সমাধান হোক। কিন্তু আমাদের নেতারা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মিটিং করে চা-নাশতা  খেয়ে প্রেস ক্লাবে আমাদের রেখে শহীদ মিনারে চলে গেছেন। আমরা খাইলাম মাইর। উনাদের কিছু হইলো না।’

জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব অধ্যক্ষ দেলোয়ার  হোসেন আজিজী শহীদ মিনার থেকে এক ভিডিওবার্তায় বলেন, হইচইয়ের মধ্যে অনেক শিক্ষক হয়তো মাইকে আমাদের  ঘোষণা শুনতে পাননি। এ জন্য আমরা দুঃখিত। এখন কেউ  প্রেস ক্লাবের সামনে না থেকে শহীদ মিনারে চলে আসুন। যতক্ষণ প্রজ্ঞাপন জারি না করা হবে, ততক্ষণ আমরা শহীদ মিনারে অবস্থান চালিয়ে যাব।

জানা যায়, দেশের ৩০ হাজার এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় চার লাখ শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত। তারা সরকারি বেতন স্কেলে মূল বেতনের পাশাপাশি মাত্র ১ হাজার টাকা বাড়িভাড়া ও ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান। আর উৎসব ভাতা পান মূল বেতনের অর্ধেক। শতাংশ হিসেবে বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা ১ হাজার ৫০০ টাকায় উন্নীত দাবিতে তারা দীর্ঘদিন আন্দোলন করে আসছেন। গত ৩০ সেপ্টেম্বর বাড়িভাড়া ১ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা করে আদেশ জারি করে অর্থ বিভাগ। তবে শিক্ষকরা তা প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনের মাঠে রয়েছেন।