চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচনের প্রচারণা শেষ হয়েছে। দিনভর প্রচারণার পর প্রার্থীরা এখন ভোটের হিসাবনিকাশে ব্যস্ত। নিজেদের সবল-দুর্বল দিক বিশ্লেষণ করে শক্ত অবস্থান তৈরির চেষ্টায় তারা মগ্ন। দলীয় প্রার্থীরা বিভাগ, আঞ্চলিক প্রভাব ও সাংগঠনিক শক্তির ওপর ভরসা করলেও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মেধা, দক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতার জোরে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন। সবাই একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রত্যাশা করছেন।
প্রচারণার শেষ দিনে উৎসবমুখর ক্যাম্পাস : গতকাল সোমবার ক্যাম্পাস জুড়ে প্রচারণার উৎসবমুখর পরিবেশ ছিল। শহীদ মিনার চত্বর, বুদ্ধিজীবী চত্বর, লেডিস ঝুপড়ি, কলা ঝুপড়ি, সমাজবিজ্ঞান ঝুপড়ি, অনুষদ প্রাঙ্গণ, আবাসিক হল এবং জিরো পয়েন্টে প্রার্থীদের ভিড় ছিল লক্ষণীয়। বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি সম্পাদক পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. হাসিবুল হোসাইন শান্ত (ব্যালট নম্বর ৯) আলাওল হলে প্রচারণা চালান। সাদাকালো প্রচারপত্র হাতে তিনি স্মার্ট ক্যাম্পাস গড়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে শিক্ষার্থীদের দ্বারে দ্বারে ভোট চেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘একা প্রচারণা চালালেও শিক্ষার্থীরা আমার মেধা ও গ্রহণযোগ্যতাকে বিবেচনা করে ভোট দেবেন বলে আশাবাদী। দীর্ঘদিন পর চাকসু নির্বাচন হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের রায় মেনে নেব।’
দলীয় প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ : ক্যাম্পাসে প্রভাবশালী দুই ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির নির্বাচনে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। ছাত্রদল মনোনীত সাধারণ সম্পাদক (জিএস) প্রার্থী মো. শাফায়াত হোসেন বলেন, ‘নির্বাচনের পরিস্থিতি নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট। নির্বাচন কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করলে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে। আমরা জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।’ অন্যদিকে, ছাত্রশিবির সমর্থিত সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট প্যানেলের ভিপি পদপ্রার্থী ইব্রাহিম রনি বুদ্ধিজীবী চত্বর, লেডিস ঝুপড়ি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রচারণা চালান। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের পরিবেশ ভালো। নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করলে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি।’
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ভূমিকা : ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনের বিপরীতে চাকসু নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন বলে অনেকে মনে করেন। স্বতন্ত্র ভিপি পদপ্রার্থী মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা আন্তরিকতা দেখাচ্ছেন, তবে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না।’
ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল : নির্বাচনের আগমুহূর্তে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রকট আকার ধারণ করেছে। কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে চবি শাখার সিনিয়র সহসভাপতি মোহাম্মদ মামুন উর রশিদকে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে আজীবন বহিষ্কার করা হয়। এই বহিষ্কারের পেছনে নির্বাচন কেন্দ্র করে বিদ্রোহী প্যানেল গঠনের বিষয়টি জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ ঘটনা ছাত্রদলের প্রার্থীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
শেষ দিনের প্রচারণায় ব্যস্ততা : শেষ দিনে প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে নিজেদের ইশতেহার তুলে ধরে ব্যস্ত সময় পার করেছেন। সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট প্যানেলের সহ-সাহিত্য, সংস্কৃতি ও প্রকাশনা সম্পাদক প্রার্থী জিহাদ আহনাফ বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা আমাদের কাজে আকৃষ্ট। আমরা দেশীয় সংস্কৃতি তুলে ধরে নতুন ধারা সৃষ্টি করতে চাই।’ একইভাবে, বৈচিত্র্যের ঐক্য প্যানেলের সমাজসেবা ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক প্রার্থী তাহসিনা রহমান শিক্ষার্থী ও পরিবেশবান্ধব গ্রিন ক্যাম্পাস গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
ভোটারদের প্রশ্নবাণ : শেষ দিনে ভোটাররা প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতির বাস্তবতা যাচাই করছেন। বুদ্ধিজীবী চত্বরে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির সমর্থিত প্রার্থীদের পাশাপাশি বৈচিত্র্যের ঐক্য এবং সার্বভৌম শিক্ষার্থী ঐক্য প্যানেলের প্রার্থীরা তুমুল প্রচারণা চালান। লেডিস ঝুপড়িতে সার্বভৌম শিক্ষার্থী ঐক্য প্যানেলের মো. শাহনেওয়াজ আল হাসান এবং ছাত্রদল সমর্থিত শাফকাত শফিকের প্রচারণা ছিল উল্লেখযোগ্য।
চাকসু নির্বাচন ঘিরে ক্যাম্পাসে উৎসাহ-উদ্দীপনা তুঙ্গে। তবে ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ নির্বাচনের ফলকে প্রভাবিত করতে পারে। সবার প্রত্যাশা, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের রায় প্রতিফলিত হবে।