ভারতকে সমর্থন আফগান তালেবানের

এ যেন আক্ষরিক অর্থেই শত্রুর শত্রুর সঙ্গে বন্ধুত্বের গল্প! সম্প্রতি আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কোন্নয়নের প্রচেষ্টাকে তাই এই বিশেষণে বিশেষায়িত করাই যায়। একই কথা খাটে আফগান তালেবানদের ক্ষেত্রেও। ২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবানের ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে পাকিস্তানের সমর্থন থাকলেও, গত চার বছরে ইসলামাবাদ ও কাবুলের সম্পর্ক নেমে এসেছে সর্বনিম্ন স্তরে। সীমান্ত সংঘর্ষে শত শত মানুষের প্রাণহানি এবং হাজার হাজার মানুষের বাস্তুচ্যুতির ঘটনার পর কাবুলের বর্তমান কূটনৈতিক অবস্থান এই অঞ্চলে নতুন অস্থিরতা তৈরি করেছে। এক বিস্ময়কর কূটনৈতিক পটপরিবর্তনে, আফগানিস্তানের তালেবান-নেতৃত্বাধীন সরকার ভারত-শাসিত কাশ্মীরের সার্বভৌমত্বের ওপর নয়াদিল্লির দাবিকে সমর্থন করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পদক্ষেপ পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের উত্তেজনা আরও বাড়াবে এবং ইতিমধ্যে অস্থিতিশীল অঞ্চলটিকে নতুন করে নাজুক করবে।

গত ১০ অক্টোবর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্করের সঙ্গে এক যৌথ বিবৃতিতে আফগান অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মৌলভি আমির খান মুত্তাকি কাশ্মীরকে ভারতের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন। এর প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করে বিবৃতি দেয়। কাশ্মীর বৃহত্তর হিমালয় অঞ্চলের একটি অংশ, যা দিল্লি এবং ইসলামাবাদ উভয় দেশই নিজেদের বলে দাবি করে। যদিও উভয় দেশই অঞ্চলটির কিছু অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। কয়েক দশক ধরে এই দুই দেশ কাশ্মীর ইস্যুতে কয়েকটি যুদ্ধে জড়িয়েছে। সর্বশেষ গত মে মাসে চার দিনব্যাপী সংঘর্ষকে বিশ্লেষকরা সাম্প্রতিক সময়ে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিমান যুদ্ধ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, যৌথ বিবৃতিটি আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের জন্য লড়াই করা অবৈধভাবে অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরের জনগণের আত্মত্যাগ ও অনুভূতির প্রতি ‘চরম অসংবেদনশীল’।

ইসলামাবাদের আশঙ্কা, কাবুলের এই নীতিগত পরিবর্তন সীমান্তে পাকিস্তান-বিরোধী শক্তিগুলোকে আরও উৎসাহিত করতে পারে এবং নিরাপত্তা সংঘাত বাড়িয়ে তুলতে পারে। তালেবানের ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যা যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহারে সহায়ক হয়েছিল। পাকিস্তানের উদ্দেশ্য ছিল, পশ্চিমে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীর প্রতিষ্ঠা, যারা ইসলামাবাদকে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-এর মতো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাহায্য করবে। অথচ বাস্তবে পাকিস্তান-আফগান সম্পর্ক উন্মুক্ত শত্রুতায় পরিণত হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে সম্প্রতি পাকিস্তান বিমান হামলা চালিয়ে আফগানিস্তানে টিটিপি-র আস্তানাগুলোতে আঘাত হানে, যেখানে ‘২০০ জনেরও বেশি আফগান যোদ্ধা’ নিহত হয়। এর পাল্টা হামলায় আফগান পক্ষ থেকে ২৩ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়, যার ফলে তোরখাম ও চমন-এর প্রধান সীমান্ত ক্রসিংগুলো বন্ধ করে দেয় ইসলামাবাদ।

করাচি-ভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক আমির জিয়া বলেন, ইসলামাবাদের সাম্প্রতিক বিমান হামলা এবং সীমান্ত বন্ধের কৌশল অতীতের ‘গাজর ও লাঠি’ পদ্ধতির সম্পূর্ণ বিপরীত। এই পুরনো কৌশলে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনকে কাজে লাগিয়ে চাপ সৃষ্টি করা হতো। আমির জিয়ার মতে, এই পরিবর্তনের ফলস্বরূপ অনাস্থার ফারাক আরও বেড়েছে, যা কাবুলকে নয়াদিল্লির দিকে ঠেলে দিয়েছে। ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরে এটি এড়াতে চেয়েছিল। তিনি আরও বলেন, এটি আফগানিস্তানের কূটনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন টিটিপি-কে আরও উৎসাহিত করবে। গত এক বছরে এই গোষ্ঠীটি পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর প্রায় ৬০০টি হামলা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, জঙ্গিরা এখন দুর্বল বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত না করে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু করছে। এটি এক অশুভ লক্ষণ।

করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুনিস আহমার এই নীতিগত পরিবর্তনে ঐতিহাসিক প্রতিধ্বনি দেখতে পান। তিনি বলেন, আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের সমস্যা ১৯৪৭ সাল থেকেই রয়েছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, কীভাবে সীমান্ত বিরোধ এবং পশতুন পুনর্মিলনবাদ (জাতিগত কারণে অন্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ড দখলের আকাক্সক্ষা) ইসলামাবাদ ও কাবুলের মধ্যে অনাস্থা বাড়িয়েছে। আহমার মনে করেন, যখন আপনি কাশ্মীরের সার্বভৌমত্বে ভারতের পক্ষ নেন, তখন এর অর্থ দাঁড়ায় যে আপনি পাকিস্তানকে আঘাত করার চেষ্টা করছেন। তিনি তালেবানের এই বিবৃতিকে সুচিন্তিত আক্রমণ হিসেবে দেখেন।

কী করবে পাকিস্তান : পাকিস্তান বরাবরই জোর দিয়ে আসছে যে কাশ্মীর সমস্যার সমাধান ১৯৪৮ সালের জাতিসংঘের প্রস্তাব অনুসারে গণভোটের মাধ্যমে হওয়া উচিত। তবে নয়াদিল্লি বরাবরই এটিকে অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে দাবি করে, বিশেষত ২০১৯ সালে ভারত-শাসিত কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন বাতিলের পর। বিশ্লেষকরা বলছেন, কাশ্মীর বিতর্কে ভারতের পক্ষে তালেবানের সমর্থন স্পষ্টতই তাদের পূর্বের অবস্থান (১৯৯৬-২০০১ সাল) থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়, যখন তারা পাকিস্তানের পাশে ছিল। এই নীতিগত পরিবর্তন কৌশলগতভাবে কাবুলের সঙ্গে নতুন করে সম্পৃক্ততার সুযোগ এনে দিয়েছে। ২০২১ সালে দূতাবাস বন্ধ করার পর নয়াদিল্লি এখন কাবুলের মিশনকে উন্নত করার মাধ্যমে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করেছে। ফলে পাকিস্তানের জন্য সাম্প্রতিক এই ঘটনাগুলোর কৌশলগত পতন ভয়াবহ হতে পারে। আমির জিয়া বলেন, আফগান তালেবানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি মানেই হলো, সন্ত্রাসী হুমকি দেশকে তাড়া করে যাবে, এবং ভারত অবশ্যই কাবুলের সঙ্গে পাকিস্তানের এই বিচ্ছিন্ন সম্পর্কের সুযোগ নেবে। তার মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হলে চীন, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বন্ধুদের মাধ্যমে কার্যকর কূটনীতির প্রয়োজন। জিয়ার সঙ্গে একমত হয়ে আহমার সতর্ক করে বলেছেন, আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। তিনি আফগানিস্তান ও ভারতের দিক থেকে দ্বিমুখী হুমকির আশঙ্কা করছেন। এমন একটি পরিস্থিতি যা পাকিস্তান ২০২১ সালে বন্ধুত্বপূর্ণ শাসনের আশা নিয়ে তাদের শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে কাবুলে পাঠানোর সময় প্রত্যাশা করেনি।

২০০১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে ভারতের ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ একটি লাইফলাইন হিসেবে কাজ করেছে, যা ঘন ঘন সীমান্ত বন্ধের কারণে পাকিস্তানের দুর্বল বাণিজ্যিক সম্পর্ক থেকে অনেক আলাদা। তবুও আমির জিয়া পাকিস্তানের প্রভাব নিয়ে আশাবাদী। তিনি বলেন, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ পরস্পর জড়িত। ভারতের চেয়ে ইসলামাবাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখলে কাবুলেরই বেশি সুবিধা হবে। জিয়া পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, পাকিস্তানের উচিত তার পুরনো খেলার কৌশল ফিরিয়ে আনা তালেবানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয়ভাবে এবং চীন ও সৌদি আরবের মতো মিত্রদের মাধ্যমে কাজ করা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, পাকিস্তানকে একটি ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি তৈরি করতে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে একটি ইতিবাচক প্রভাব হিসেবে ব্যবহার করা উচিত। তিনি আফগান শরণার্থীদের ওপর দমন-পীড়ন এবং আন্তঃসীমান্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্ক ছিন্ন করার নীতি বন্ধ করার আহ্বান জানান। জিয়া সতর্ক করে বলেন, পাকিস্তানের বিমান হামলাগুলো কৌশলগতভাবে কার্যকর হলেও কেবল সংঘাতকেই দীর্ঘায়িত করবে, যা ভারতকে বিশৃঙ্খলার সুযোগ দেবে। তার আহ্বান, ডুরান্ড লাইনের উভয় পাশের বিভক্ত জাতিগোষ্ঠী ও পরিবারগুলোকে একে অপরের সঙ্গে মিলিত হতে দিন। এই জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্কই আমাদের শক্তি, দুর্বলতা নয়।