দেশে বড় ধরনের অগ্নিকান্ড ঘটলেই সামনে আসে বিষাক্ত রাসায়নিক গুমামের আদ্যোপান্ত। বেশিরভাগ আগুনেই প্রাণহানি ঘটছে রাসায়নিক গুদাম থেকে। এ নিয়ে কিছুদিন চলে হইচই। চলে তদন্তের পর তদন্ত। তবে আলোতে আসছে না তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য। নেওয়া হচ্ছে না কোনো ব্যবস্থা। প্রতিটির গুদামের কর্ণধাররাই প্রভাবশালী। তারা সব সংস্থার ওপর প্রভাব বিস্তার করছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এসব অপকর্ম হলেও এখনো সে পথেই হাঁটছেন তারা। গত এক বছরে একশর বেশি কারখানা বেড়েছে ঢাকা, আশুলিয়া, গাজীপুর, টঙ্গী, চট্টগ্রামসহ আরও কয়েকটি এলাকায়। ইতিমধ্যে একটি গোয়েন্দা সংস্থা সরকারের হাইকমান্ডকে বিষয়টি অবহিত করেছে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার ঢাকার মিরপুরে একটি রাসায়সিক গুদাম ও পোশাক কারখানায় আগুনের ঘটনায় ১৬ জনের প্রাণহানিতে বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি অনির্ধারিত বৈঠক হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, বিগত সরকারের আমলে পুরান ঢাকা, মিরপুর, খিলগাঁও, শাহজাহানপুর, টঙ্গী ও গাজীপুর এবং চট্টগ্রামসহ আরও কিছু এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল গোডাউন ‘রহস্যজনকভাবে’ উচ্ছেদ অভিযান চালানো যাচ্ছে না। সিটি করপোরেশন, ফায়ার সার্ভিস, থানা-পুলিশ ও অন্যান্য সংস্থার নজরদারি নেই বললেই চলে। যারা ‘ক্ষমতা দেখিয়ে’ এসব অপকর্ম করছে, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না। এসব অপকর্ম করার পেছনে যারা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করে দ্রুত গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নিতে হবে। এসব না করলে রাসায়নিক কারখানা বাড়বেই। পাশাপাশি মৃত্যুর হার রোধ করা সম্ভব হবে না। দিনে দিনে ঢাকা শহর বোমার নগরীর মতো হয়ে উঠছে। এসব গুদাম সরানো পদক্ষেপ বারবার ব্যর্থ হয় আর শ্রমজীবী ও আপনজনদের হারাতে হচ্ছে। বিশে^র কোথাও এসব অপকর্ম হয় না।
মন্ত্রণালয়ে বিশেষ বৈঠকেও নানা প্রশ্ন : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিমতলী ও চুড়িহাট্টাসহ অন্য যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেই বিষয়ে বুধবারের বৈঠকে বিশদ আলোচনা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনগুলো কেন আলোতে আসছে না, তার ব্যাখ্যাও চাওয়া হয়েছে। বৈঠকে বলা হয়েছে, পুরান ঢাকাসহ যেসব স্থানে বিষাক্ত কেমিক্যাল গোডাউন আছে সেগুলো সরানো যাচ্ছে না। প্রভাবশালীদের চাপের কাছে কুলিয়ে উঠতে পারছে না প্রশাসন। উচ্ছেদ অভিযান চালাতে গেলে পিছিয়েও আসতে হচ্ছে। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চুড়িহাট্টায় আগুনে নারী-শিশুসহ ৭১ জনের প্রাণহানি হয়েছে। ২০১০ সালের ৩ জুন নিমতলী ভয়াবহ আগুনে ১১৭ জন মারা যান। এত মৃত্যু ঘটনায় দেশ-বিদেশে তোলপাড় শুরু হয়। ওইসব বাড়িতে ছিল কেমিক্যাল-ঠাসা। এ ঘটনায় মামলা হলেও আসামিরা আছেন বহাল তবিয়তে। নিমতলীর ট্র্যাজেডির ঘটনাতেও কাউকে আটক করা হয়নি। এত প্রাণহানির পরও প্রশাসন গুদাম মালিকদের ধারেকাছেও যেতে পারছেন না। পুরান ঢাকার পাশাপাশি নতুন করে ঢাকার বিভিন্ন স্থান, আশুলিয়া, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে রাসায়নিক গুদামের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। গণবসতিপূর্ণ এলাকার এসব সর্বনাশা গুদাম গড়ে তুললে প্রশাসন দেখেও না দেখার ভান করছে। ঝুঁকির মধ্যে আছেন সবাই।
ঝুঁকির মধ্যেই বসবাস : নাম প্রকাশ না করে কয়েকজন ব্যবসায়ী দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা ঝুঁকির মধ্যে আছি। এতগুলো ঘটনার পর রাসায়নিক কারখানাগুলো সরানো হলো না। বিষয়টি নিয়ে আমরা মর্মাহত। রাজনৈতিক নেতাদের কারণে এসব সরেনি। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হওয়ার পরও গোডাউনগুলো সরছে না। পুরান ঢাকা এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ। ওই ব্যবসায়ীরা আরও বলেন, সেখানে আবার ছোট-বড় কয়েকশ কেমিক্যাল কারখানা আছে। সেখানে কোনো নিয়ম মানা হয় না। বিষয়টি আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করব নতুন করে। সব সংস্থাকে ম্যানেজ করেই ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। একই কথা বলেছেন একটি গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, প্রভাব ও টাকার জোরে রাসায়নিক কারখানা বেড়ে চলেছে। এমনকি গত এক বছরেও একশর বেশি কারখানা গড়ে উঠেছে বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। বিষয়টি সরকারের হাইকমান্ডকে অবহিত করা হয়েছে।
সুপারিশগুলো মানলে এত প্রাণহানি হতো না: জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের পর ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে গঠিত তদন্ত কমিটি বেশ কিছু সুপারিশ জানায় কিন্তু এসব কেউ আমলে নেয়নি। যদি আমলে নিত তাহলে এসব ঘটনা অনেকটাই কমে আসত। তিনি বলেন, আমরা আগে থেকে বলে এসেছি ও আমাদের সুপারিশ ছিল বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে আবাসিক এলাকায় যেকোনো ধরনের রাসায়নিকের দোকান বা গুদাম স্থাপন করা যাবে না। এসব সুপারিশে ও ফায়ার সার্ভিসের পরিকল্পনাগুলো কেউ তেমন আসলে নেয় না। আমরা কেউ এসব বিষয়ে সতর্ক নই। বরং নিজের মতো সবকিছু গড়ি এবং আইন না মেনেই অনেকেই বছরের পর বছর চলছে যার কারণে ঘটছে এসব বড় বড় দুর্ঘটনা।
সারা দেশে ৩৭ হাজার গুদাম : পুলিশ সূত্র জানায়, ঢাকাসহ সারা দেশে ৩৭ হাজার রাসায়নিক গোডাউন রয়েছে। তার মধ্যে ১৮ হাজার আছে খোদ বাসাবাড়িতেই। ফায়ার সার্ভিসসহ অনান্য সংস্থা ৮ হাজার ৮৫০টিরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ২০১০ সালে নিমতলীতে অগ্নিকাণ্ডের পর দুর্ঘটনা রোধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব ইকবাল খান চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত কমিটি কেমিক্যাল গুদাম অপসারণসহ ১৭ দফা নির্দেশনা দেয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই সুপারিশমালা ১৬ বছর ধরে ফাইলবন্দি। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে নিমতলীর ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে চকবাজারের চুড়িহাট্টায়। ওই সময় কিছু সুপারিশ করে ফায়ার সার্ভিস। এতে আগুনের জন্য ওয়াহেদ ম্যানশনের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থতলায় গুদামজাত করাকে দায়ী করা হয়েছে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ২৭ হাজার ৬২৪টি বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল। এতে ৭৯২ কোটি টাকার বেশি সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। মারা গেছে ১০২ জনের মতো। ২০২৪ সালে সারা দেশে ২৬ হাজার ৬৫৯টি বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এসব আগুনে প্রাণ হারিয়েছেন ১৪০ জন, আহত হয়েছেন ৩৪১ জন। ২০২৫ সালের সাত মাসে ১৫৪ জন আগুন ও বিস্ফোরণের ঘটনায় মারা গেছেন। তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্যমতে, রাসায়নিক গোডাউন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করলেও দুর্ঘটনা এড়াতে হাতে নেওয়া হয়েছিল অনেক পদক্ষেপই। কিন্তু আলোর মুখ দেখেনি কোনোটিই।
বাসাবাড়িতে রাসায়নিক ঠাসা : পুরান ঢাকাসহ কয়েকটি এলাকায় সরেজমিন দেখা গেছে, রাসায়নিক দোকানগুলোতে সারি সারি প্লাস্টিকের ড্রাম আর দাহ্য রাসায়নিক পদার্থে ঠাসা। কোনো কোনোটিতে আবার বস্তাভর্তি দাহ্য কেমিক্যাল। তার ঠিক ওপরই এলোমেলোভাবে ঝুলছে অসংখ্য বৈদ্যুতিক তার। দোকানের ওপরই রয়েছে বাসাবাড়ি। পুরান ঢাকার আরমানিটোলা, লালবাগ, কোতোয়ালি, বংশাল, চকবাজারসহ বেশিরভাগ এলাকার কেমিক্যাল দোকানগুলোর এমন দৃশ্য চোখে পড়ে। আরমানিটোলা, বাবুবাজার, মিটফোর্ড, চকবাজার, লালবাগ, ইসলামপুর, চানখাঁরপুলসহ আশপাশ এলাকার আবাসিক ভবনে গড়ে উঠেছে ঝুঁকিপূর্ণ গুদামগুলো। এসব গুদাম ও কারখানার অধিকাংশেরই বৈধ কাগজপত্র ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের অনুমোদন নেই। এসব গুদামে রয়েছে গ্লিসারিন, সোডিয়াম অ্যানহাইড্রাস, সোডিয়াম থায়োসালফেট, হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড, মিথাইল ইথাইল কাইটন, থিনার, আইসোপ্রোইলসহ বিভিন্ন দাহ্য পদার্থ। এগুলো আগুনের সংস্পর্শে এলে ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। তদন্ত কমিটির সুপারিশগুলো বাস্তবায়নও সম্ভব হয়নি। ইসলামবাগেই আছে ছোট-বড় কয়েকশ কেমিক্যাল, পলিথিন ও প্লাস্টিক তৈরির কারখানা। ভবনের মালিকরা বেশি ভাড়া পাওয়ার লোভে বাসার পরিবর্তে গুদাম বা কারখানা হিসেবে ভাড়া দিচ্ছেন। অনেক স্থানে ভবন জুড়েই রয়েছে গুদাম। যেসব কারখানা সরাতে হবে, এর একটি তালিকাও করা হয়। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির নির্দেশ উপেক্ষা করে বহাল তবিয়তে ব্যবসা কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন ব্যবসায়ীরা। অভিযোগ উঠেছে, কেমিক্যাল ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক নেতাদের বলয়ে থাকার কারণে তাদের সরানো যাচ্ছে না। এমনকি ব্যবসায়ীদের মধ্যে কেউ কেউ রাজনৈতিক নেতাও। চুড়িহাট্টা ও নিমতলী ট্র্যাজেডির পর সিটি করপোরেশন, শিল্প মন্ত্রণালয়, আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা, বিস্ফোরক পরিদপ্তরসহ বেশ কয়েকটি সংস্থার সমন্বয়ে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। কেমিক্যাল কারখানার তালিকা গত সরকারের মন্ত্রিসভায়ও জমা দেওয়া হয়েছিল। ২০১৫ সালে কেরানীগঞ্জের সোনাকান্দায় ২০ একর জমিতে কেমিক্যাল পল্লী গঠনের কথা থাকলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে ওই জমি আইটি পার্ক করার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ প্লাস্টিক ব্যবসায়ী সমিতির নেতা ও কেমিক্যাল ব্যবসায়ী পলাশ আহমেদ বলেন, ‘পুরান ঢাকা থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিকর কেমিক্যাল দ্রুত সরানো দাবি জানাচ্ছি। আর না হয় মিরপুরের মতো ফের কোনো বড় ঘটনা ঘটুক, সেটা দেশের মানুষ দেখতে চায় না। আমরাও চাই না।’
ঘটনার পরও সতর্ক না হওয়ার আক্ষেপ : বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন বলেন, ‘সারা ঢাকায় আমাদের গবেষণায় উঠে এসেছে ৩০ হাজারের বেশি অবৈধ রাসায়নিক গোডাউন রয়েছে। এগুলো না সরালে কিছুতেই বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমানো সম্ভব নয়।’ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ আশিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা কোনো ঘটনার পরও সতর্ক হই না। সতর্ক না হওয়ার কারণে আবারও বিস্ফোরণ বা অগ্নিকাণ্ডের শিকার হয়ে দিনের পর দিন আপনজনদের হারাচ্ছি। সবচেয়ে দুর্ভাগ্য আমাদের দেশে একটি ঘটনা ঘটার পর মানুষ কিছুদিন সতর্ক থাকেন। পরে আর এসব ঘটনাকে কিছু মনে করেন না। আমরা নিমতলী, চুড়িহাট্টাসহ অনেক ঘটনা ভুলে গিয়েছি। মিরপুরের রাসায়নিক বিস্ফোরণের ঘটনাও সতর্ক না হয়ে ভুলে যাব।’