মৃত ইসরায়েলি জিম্মিদের মরদেহ হস্তান্তরকে গাজায় যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় পর্ব বলে ঘোষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে করা এক বার্তায় এ ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। তবে এখনো সব মৃত জিম্মিদের মরদেহ ফিরিয়ে না দেওয়ায় নিজের হতাশার কথাও জানান ট্রাম্প। গত মঙ্গলবার গভীর রাতে হামাস আরও চার জিম্মির মরদেহ ইসরায়েলের কাছে হস্তান্তর করেছে। দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, তাদের পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছে। এ নিয়ে আট মৃত জিম্মির মরদেহ হস্তান্তর করল হামাস। এদিকে, নিহত চার জিম্মির মরদেহ ফেরত পাওয়ার পর গাজা ও মিসরের মধ্যবর্তী রাফা ক্রসিং খুলে দেওয়া এবং গাজায় মানবিক সহায়তা স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসরায়েল। এ ছাড়া ইসরায়েল হামাসের বিরুদ্ধে যে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ছিল যার মধ্যে ছিল গাজায় ত্রাণবাহী ট্রাকের সংখ্যা অর্ধেক করা তাও বাতিল করা হয়েছে। অন্যদিকে, গাজায় যুদ্ধের অবসানে শান্তিচুক্তির পর হামাসের বর্তমান অবস্থা নিয়ে প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান,হামাসকে নিরস্ত্র হতে বাধ্য করা হবে।
গাজায় কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপের শর্ত অনুযায়ী গাজায় থাকা ২০ জীবিত জিম্মিকে মুক্তি দিয়েছে হামাস। বিপরীতে ৩ হাজার ৭০০ ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দিয়েছে ইসরায়েল। তবে ইসরায়েল মৃত জিম্মিদের সবার মৃতদেহ না পাওয়ায় পরিস্থিতি খানিকটা ঘোলাটে হয়ে ওঠে। যার পরিপ্রেক্ষিতে গাজায় সহায়তা প্রবেশে ইসরায়েলের নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেয়। তবে মঙ্গলবার রাতেই হামাস আরও চার জিম্মির মরদেহ হস্তান্তর করলে ইসরায়েল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়ে রাফা ক্রসিং খুলে দেওয়ার কথা জানায়। মঙ্গলবার ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, গাজায় আটক জীবিত ২০ জন জিম্মির সবাই ফিরে এসেছে। এটা খুবই ভালো হয়েছে, কারণ আমরা এমনটাই প্রত্যাশা করছিলাম। তিনি আরও বলেন, যদিও একটি বড় সংকট কেটে গেছে, তবে কাজ এখনো শেষ হয়নি। কারণ সমঝোতা চুক্তির প্রতিশ্রুতি ছিল মৃত সব জিম্মির মরদেহ ফিরিয়ে দেওয়া হবে তা এখনো ঘটেনি। তাদের অবশ্যই ফেরত দিতে হবে এবং যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় পর্যায় এখন থেকে শুরু হলো।
হামাস মঙ্গলবার রাতে আরও চার জিম্মির মরদেহ ইসরায়েলের কাছে হস্তান্তর করেছে। রেডক্রস কফিনে করে মরদেহগুলো পরে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে। এক বিবৃতিতে রেডক্রস জানায়, মঙ্গলবার ইসরায়েল ৪৫ জন ফিলিস্তিনির মরদেহ গাজায় ফেরত দিয়েছে। সোমবার হামাসের কাছ থেকে ফেরত পাওয়া প্রথম চার নিহত জিম্মির পরিচয় জানিয়েছে ইসরায়েল। তারা হলেন ড্যানিয়েল পেরেটজ (২২), ইয়োসি শারাবি (৫৩), গাই ইলুজ (২৬) ও নেপালের নাগরিক বিপিন জোশি (২৩)। ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সর্বশেষ পাওয়া চার জিম্মির মরদেহের পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছে। নিহত চার জিম্মির মরদেহ ফেরত পাওয়ার পর গাজা ও মিসরের মধ্যবর্তী রাফা ক্রসিং খুলে দেওয়া এবং গাজায় মানবিক সহায়তা স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসরায়েল। এর আগে জাতিসংঘকে ইসরায়েল জানিয়েছিল, বুধবার থেকে প্রতিদিন মাত্র ৩০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় ঢুকতে দেওয়া হবে, যা যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে নির্ধারিত সংখ্যার অর্ধেক।
এদিকে, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের নিরস্ত্রীকরণের প্রশ্নের নিজের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শান্তিচুক্তির পর হামাসের বর্তমান অবস্থা নিয়ে প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, হামাসকে নিরস্ত্র হতে বাধ্য করা হবে। প্রয়োজনে সহিংস উপায় অবলম্বন করা হবে বলেও হুমকি দিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, যদি তারা অস্ত্র না বাদ দেয়, তাহলে আমরাই তাদের নিরস্ত্র করব। আর তা হবে দ্রুত, প্রয়োজনে সহিংসভাবে। তবে তারা নিরস্ত্র হবেই। চলতি সপ্তাহে গাজায় ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় করা যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর অন্যতম হলো, হামাসকে কীভাবে নিরস্ত্র করা হবে? এ ছাড়া তারা কবে গাজা ছাড়বে, বিশেষ করে ২০ দফা শান্তিচুক্তির দ্বিতীয় ধাপ কার্যকর হলে। তবে ট্রাম্পের আগের বক্তব্যগুলো থেকে ধারণা পাওয়া যায়, গাজায় হামাসকে সীমিত ভূমিকায় থাকতে দেওয়া হতে পারে। এর মধ্যে হোয়াইট হাউজের দূতদের সঙ্গে হামাস নেতাদের সরাসরি বৈঠক হয়েছে, যা দুপক্ষের মধ্যে অনুষ্ঠিত সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈঠক।
অন্যদিকে, দীর্ঘ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর গাজায় নিজেদের কর্র্তৃত্ব পুনরায় প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে হামাস। গত শুক্রবার যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত হামাস বিভিন্ন গোষ্ঠীর ওপর দমন অভিযান চালিয়ে অন্তত ৩৩ জনকে হত্যা করেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, এরা হামাসের কর্র্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছিল। হামাস যুদ্ধবিরতির পর থেকে ধীরে ধীরে তাদের সদস্যদের গাজার রাস্তায় ফিরিয়ে আনছে। গাজার দুটি নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, পরিস্থিতি যেকোনো মুহূর্তে পাল্টে যেতে পারে এমন আশঙ্কায় তারা সতর্কভাবে অগ্রসর হচ্ছে। তবে যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও মঙ্গলবার গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানে অন্তত ৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।