পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে হিমাগারে সংরক্ষিত প্রায় ৯ লাখ বস্তা (৫৫ হাজার মেট্রিক টন) আলু এখন চাষীদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারে আলুর দাম না থাকায় চাষীরা কোল্ড স্টোরেজ থেকে আলু বের করতে অনাগ্রহী। এতে একদিকে চাষীরা লোকসানের মুখে, অন্যদিকে বিপাকে পড়েছেন কোল্ডস্টোরেজ মালিকরা।
বুধবার (১৫ অক্টোবর) উপজেলার বিভিন্ন কোল্ড স্টোরেজে গিয়ে বিভিন্ন আলুচাষী ও কোল্ডস্টোরেজ মালিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, দেবীগঞ্জের ৫টি হিমাগারে এ বছর প্রায় ৫৫ হাজার মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে। প্রতি কেজি বীজ আলু উৎপাদনে চাষীদের খরচ হয়েছে ২৫ থেকে ২৮ টাকা। হিমাগারের ভাড়াসহ এক কেজি আলুর খরচ ৩১ থেকে ৩৪ টাকা। প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৯ টাকা। এতে চাষীদের লোকসান দাঁড়াতে পারে প্রায় ১৩৭ কোটি টাকা।
আলুচাষী মো. আইবুল হক বলেন, ‘৬ হাজার ২০০ বস্তা আলু রেখেছি। উৎপাদন ও সংরক্ষণ খরচ মিলিয়ে প্রতি কেজিতে খরচ ২৯ টাকা। এখন আলু বিক্রি করলে কোনমতে কোল্ড স্টোরেজের ভাড়া মেটানো যাচ্ছে। স্টোরেজের ভাড়া মিটিয়ে প্রতি কেজি আলু বিক্রিতে মিলছে ৩ টাকা। আমি ৭০ লাখ টাকা লোকসানের ঝুঁকিতে আছি।’
আরেক চাষী মো. নাঈমুল ইসলাম জানান, ‘৩ হাজার বস্তা বীজ আলু এখনো স্টোরে আছে। প্রতি কেজিতে লোকসান হচ্ছে ২৫ টাকারও বেশি।’
এদিকে আলু চাষীরা নির্ধারিত সময়ে আলু বের না করায় দুশ্চিন্তায় আছেন স্টোরেজ মালিকেরা। অন্যান্য বছর এতোদিনে সংরক্ষিত আলুর ৭০ শতাংশ বের করতেন চাষীরা কিন্তু এখন পর্যন্ত মাত্র ৩০ শতাংশ আলু কোল্ডস্টোরেজ থেকে বের হয়েছে। চাষীরা অবশিষ্ট আলু বের না করলে ক্ষতি হবে প্রায় ২০ কোটি টাকা।
উপজেলার দেবীডুবা ইউনিয়নে অবস্থিত মুয়াজ অ্যান্ড মাহি কোল্ড স্টোরেজের মালিক আবুল বাশার খান বলেন, ‘১ লাখ ৮০ হাজার বস্তার মধ্যে এখন পর্যন্ত বের হয়েছে ৬০ হাজার। বাকি আলু বের না করলে প্রায় ৫ কোটি টাকা লোকসান হবে।’
পৌর সদরের অবস্থিত মদিনা কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থাপক সাজ্জাদ হোসেন জানান, ‘২ লাখ ৮ হাজার বস্তার মধ্যে বের হয়েছে ৬৫ হাজার। আলু বের না করায় স্টোরেজের বিদ্যুৎ বিল ষোলআনা যাচ্ছে। প্রতি মাসে তাদের প্রায় ১৫ লাখ টাকা করে বিদ্যুৎ বিল দিতে হচ্ছে। অন্যান্য বছর এই সময়ে বিদ্যুৎ বিল অর্ধেকে নেমে আসতো। চাষীরা আলু না তুললে আনুমানিক ৬ কোটি টাকার ক্ষতি হবে।’
এছাড়াও ফ্রেন্ডস কোল্ড স্টোরেজে ১ লাখ ২৫ হাজার বস্তার মধ্যে ৪২ হাজার, এসবি-১ স্টোরে ২ লাখ ২৪ হাজারের মধ্যে ৭১ হাজার, এসবি-২ স্টোরে ১ লাখ ৭০ হাজারের মধ্যে ৭০ হাজার বস্তা আলু বের করেছেন চাষীরা।
হিমাগার মালিকেরা জানিয়েছেন, আগামী ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত তারা আলু সংরক্ষণ করবেন। এরপর আলু রাখার সুযোগ থাকবে না।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাঈম মোর্শেদ বলেন, লক্ষ্যমত্রার চেয়ে বেশি উৎপাদন হওয়ায় আলুর চাহিদা কম। গত ২০২৪-২০২৫ রোপণ মৌসুমে দেবীগঞ্জে আলু চাষের লক্ষ্যামাত্রা ছিল ৫৭১০ হেক্টর, এর বিপরীতে চাষ হয়েছে ৬৯৬০ হেক্টর। অর্থাৎ ১২৫০ হেক্টর জমিতে বেশি চাষ হয়েছে।
পঞ্চগড় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আব্দুল মতিন বলেন, আমরা সব সময় লাভজনক ফসল আবাদে উদ্বুদ্ধ করি। কিন্তু কৃষকরা আমাদের পরামর্শ উপেক্ষা করে আলুর আবাদে ঝুঁকে পড়ে। লক্ষ্যমাত্রার ডবল জমিতে আলুর আবাদ করে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বাম্পার ফলন হয়েছে। চাহিদা কম সরবরাহ বেশি। স্বাভাবিক ভাবেই দাম কমে গেছে। সে সময়ে সার সরবরাহ করতে আমাদের হিমশিম খেতে হয়েছে। সরকার ভর্তুকি মূল্যে এসব আলু সংগ্রহ করে টিসিবির মাধ্যমে বিক্রি করতে পারে। নেপালে রপ্তানি না হলে আলুতে ধস নামত।