২১ বছরে সর্বনিম্ন পাস

২০২৫ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষায় নজিরবিহীন ফল বিপর্যয় হয়েছে। দেশের ৯টি সাধারণ, কারিগরি ও মাদ্রাসাসহ ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। অর্থাৎ ফেল করেছে ৪১ দশমিক ১৭ শতাংশ। গত বছর এই হার ছিল ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ। সেই হিসাবে পাসের হার কমেছে ১৮ দশমিক ৯৫ শতাংশ।

অন্যদিকে মোট জিপিএ ৫ পেয়েছেন ৬৯ হাজার ৯৭ জন শিক্ষার্থী। গতবছর এই সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯১১ জন, যা গত বছরের চেয়ে ৭৬ হাজার ৮১৪ জন কম। এই ফল গত ২১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে শিক্ষা বোর্ডগুলোর ওয়েবসাইট, সংশ্লিষ্ট পরীক্ষাকেন্দ্র ও এসএমএসের মাধ্যমে ফল প্রকাশ করা হয়।

এবার মোট উত্তীর্ণ হয়েছেন ৭ লাখ ২৬ হাজার ৯৬০ জন। মোট পরীক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্র ছিলেন ৬ লাখ ১১ হাজার ৪৪৭, উত্তীর্ণ ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৬৪, জিপিএ ৫ পেয়েছেন ৩২ হাজার ৫৩ জন, পাসের হার ৫৪ দশমিক ৬০ শতাংশ। অন্যদিকে ছাত্রী অংশ নিয়েছেন ৬ লাখ ২৪ হাজার ২১৫, উত্তীর্ণ ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৯৬, জিপিএ ৫ পেয়েছেন ৬৯ হাজার ৯৭ জন। ছাত্রীদের পাসের হার ৬২ দশমিক ৯৭ শতাংশ।

এবার সবচেয়ে বেশি জিপিএ ৫ পেয়েছেন ঢাকা বোর্ডের শিক্ষার্থীরা। সংখ্যা হিসাবে ২৬ হাজার ৬৩ জন। রাজশাহী বোর্ডে ১০ হাজার ১৩৭ জন, কুমিল্লা বোর্ডে ২ হাজার ৭০৭, যশোর বোর্ডে ৫ হাজার ৯৯৫, চট্টগ্রাম বোর্ডে ৬ হাজার ৯৭, বরিশাল বোর্ডে ১ হাজার ৬৭৪, সিলেট বোর্ডে ১ হাজার ৬০২, দিনাজপুর বোর্ডে ৬ হাজার ২৬০, ময়মনসিংহ বোর্ডে ২ হাজার ৬৮৪, মাদ্রাসা বোর্ডে ৪ হাজার ২৬৮ এবং কারিগরি বোর্ডে ১ হাজার ৬১০ শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ অর্জন করেছেন।

২০২টি প্রতিষ্ঠানের সবাই ফেল : ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ বছর ফেল করেছেন ৪১ দশমিক ১৭ শতাংশ পরীক্ষার্থী। এ বছর সারা দেশের ৯ হাজার ৩০২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষার্থীরা অংশ নেন। তার মধ্যে ২০২টি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেননি।

ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. খন্দোকার এহসানুল কবির বলেন, এ বছর ২০২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কেউই উত্তীর্ণ হয়নি। ২০২৪ সালে শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৬৫টি।

অন্যদিকে, ৩৪৫টি প্রতিষ্ঠানে শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছেন। ২০২৪ সালে শতভাগ পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৩৮৮টি। সে অনুযায়ী এবার শতভাগ পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে ১ হাজার ৪৩টি।

২১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার : এবার ২১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার। এর চেয়ে কম পাসের হার ছিল ২০০৪ সালে। ওই বছর পাস করেছিলেন ৪৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ শিক্ষার্থী। ২০০৫ সালে পাসের হার ছিল ৫৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। এরপর এইচএসসিতে পাসের হার আর কখনো এর চেয়ে নিচে নামেনি। সেই হিসাবে গত ২০ বছরের মধ্যে এবারই পাসের হার সবচেয়ে কম।

পূর্ববর্তী বছরের ফলে দেখা যায়, ২০০২ সাল পর্যন্ত এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ডিভিশন পদ্ধতি চালু ছিল। ২০০৩ সাল থেকে চালু হয় জিপিএ পদ্ধতি, যেখানে প্রথম বছর পাসের হার ছিল ৩৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ। ২০০৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৭ দশমিক ৭৪ শতাংশে। এরপর থেকে পাসের হার ক্রমে বৃদ্ধি পায়। ২০০৫ সালে ৫৯ দশমিক ১৬ শতাংশ, ২০০৬ সালে ৬৫ দশমিক ৬৫, ২০০৭ সালে ৬৫ দশমিক ৬০, ২০০৮ সালে ৭৬ দশমিক ১৯ এবং ২০০৯ সালে ৭২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

২০২০ সালে করোনাভাইরাসের কারণে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি। তখন সব শিক্ষার্থীকে অটোপাস দেওয়া হয়, ফলে পাসের হার দাঁড়ায় ১০০ শতাংশ। পরবর্তী বছরগুলোতে সংক্ষিপ্ত সিলেবাস ও সীমিত বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়। ২০২১ সালে পাসের হার ছিল ৯৫ দশমিক ২৬ শতাংশ, ২০২২ সালে ৮৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৭৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ।

২০২৪ সালে পূর্ণ নম্বর ও পূর্ণ সিলেবাসে পরীক্ষা ফিরলেও কোটা সংস্কার আন্দোলনের কারণে কিছু পরীক্ষা স্থগিত হয়ে যায়। পরে অন্তর্বর্তী সরকার অনুষ্ঠিত পরীক্ষাগুলোর ফল প্রকাশ করে, যেখানে পাসের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

ক্যাডেট কলেজে ঈর্ষণীয় ফলাফল : চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষায় দেশের ১২টি ক্যাডেট কলেজ থেকে অংশ নেয় ৫৮৯ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ৫৮৭ জনই জিপিএ ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন। এ বছর পাসের হার শতভাগ এবং জিপিএ ৫ প্রাপ্তির হার ৯৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ। বিগত বছরেও (২০২৪) ক্যাডেট কলেজগুলোর জিপিএ ৫ প্রাপ্তির হার ছিল একই।

বিদেশ কেন্দ্রেও ভালো ফলাফল : ২০২৫ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় বিদেশ থেকেও পরীক্ষা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। দেশের বাইরে অবস্থিত আটটি কেন্দ্রে ২৯১ পরীক্ষার্থী অংশ নেন। এর মধ্যে ২৭৯ জন পাস করেছেন, পাসের হার ৯৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ। বিদেশ কেন্দ্র থেকে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠান আছে দুটি।

দীর্ঘ পাঁচ বছর পর এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা স্বাভাবিক ধারায় ফেরায় ফল নিম্নমুখী হয়েছে বলে মনে করেন শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে অতিরঞ্জিত ফল এড়াতে গ্রেস মার্কস না দেওয়ায় ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলেও তাদের ধারণা।

ফল পুনর্নিরীক্ষণ আবেদন ১৭-২৩ অক্টোবর : ফল পুনর্নিরীক্ষণ আবেদন করা যাবে আগামী ১৭ থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত অনলাইনে যঃঃঢ়ং://ৎবংপৎঁঃরহু.বফঁনড়ধৎফৎবংঁষঃং.মড়া.নফ ওয়েবসাইটে। শিক্ষা বোর্ড বা অন্য কোনো অফিসে সরাসরি আবেদন গ্রহণ করা হবে না।

এ বছর দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১২ লাখ ৫১ হাজার ১১১ জন শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেন। তাদের মধ্যে ৬ লাখ ১৮ হাজার ১৫ জন ছাত্র এবং ৬ লাখ ৩৩ হাজার ৯৬ জন ছাত্রী। সারা দেশে ২ হাজার ৭৯৭টি কেন্দ্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। তবে প্রায় ২৭ হাজার শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেননি।