তিন গোয়েন্দা শুধু বই নয় ছিল এক অলিখিত শপথ

ছেলের বাবাকে ডেকে বলছিলাম, ‘রকিব হাসান স্যার আর নেই’

- কোন রকিব হাসান?

- তিন গোয়েন্দার লেখক।

এ কথা শুনে আমার সঙ্গে তারও ভীষণ মন খারাপ হলো। আমরা দুজনেই স্মৃতিচারণ করতে লাগলাম শৈশব-কৈশোরের। তখন রকিব হাসান কোন জাদুবলে আটকে রাখতেন আমাদের বইয়ের পাতায়? তিন গোয়েন্দা পড়ার জন্য কে কেমন পাগলামি করেছি, কীভাবে বইয়ের ভেতর লুকিয়ে তিন গোয়েন্দা পড়তাম আমরা, বই কীভাবে কোথা থেকে সংগ্রহ করতাম, এসব নানান স্মৃতিচারণ হচ্ছিল।

আর এতক্ষণ ছেলে আমাদের কথা মন দিয়ে শুনছিল। বাবা-মায়ের ছোটবেলার কথা। অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল, বইও তোমরা লুকিয়ে পড়তে? আমি হলে সারাদিন কার্টুন দেখতাম আর খেলতাম গেম!

আসলে এই প্রজন্ম চিন্তাই করতে পারবে না কি মজার কৈশোর ছিল আমাদের!

যাদের কাছে কৈশোর মানেই ছিল সেবা প্রকাশনীর পাতা উল্টানো আর হলুদ মলাটের ওপরের সেই তিনজনের ছবি। কিশোর পাশা, মুসা আমান আর রবিন মিলফোর্ড। ‘তিন গোয়েন্দা’ ছিল আমাদের কাছে শুধু বই নয়, ছিল এক অলিখিত শপথ!

চোখ বন্ধ করলেই আমি এখনো সেই দিনগুলোতে চলে যাই। লোডশেডিংয়ের রাতে হারিকেনের আবছা আলোতে বা স্কুলের টিফিনের ফাঁকে, আমরা যেন বুঁদ হয়ে থাকতাম রকিব হাসান স্যারের সৃষ্টি করা ‘রকি বীচের’ মায়াবী জগতে। বইয়ের পাতা খুললেই যেন চারপাশের সব শব্দ, সব বাস্তবতা একেবারে উধাও যেত!

তখন নাওয়া-খাওয়ার হুঁশ থাকত না! আম্মা কতবার ডাকত, ‘আয় খেয়ে যা, ভাত বেড়েছি। বইটা এখন রাখ, আয় শিগগির!’ কিন্তু আমি তো তখন আর এই বাড়িতেই নেই, শুনবো কী করে আম্মার কথা! আমি তো তখন ডুবে আছি ‘কঙ্কাল দ্বীপ’-এর রহস্যে।

আসলে, রকিব হাসান স্যার আমাদের শুধু গোয়েন্দা গল্প দেননি, তিনি আমাদের ‘চরিত্র’ দিয়েছিলেন।

এই যে এখন মাঝ বয়সে চলে এসেছি। এখনো পেছন ফিরলে, কিশোরীবেলার সব স্মৃতি ভিড় করে। তার মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে থাকে হাতে গোনা কয়েকটি হলুদ মলাটের বই। আমরা যারা মেয়ে, তাদের কাছে ‘তিন গোয়েন্দা’ হয়তো ছেলেদের অ্যাডভেঞ্চার বলে পরিচিত ছিল, কিন্তু এর আবেদন ছিল সর্বজনীন। আমাদের প্রজন্ম তো জানে, মুসা-কিশোর-রবিন, জিনা ও রাফিয়ান এদের আকর্ষণ কোনো বাঁধ মানে না।

আমার স্মৃতিতে, তিন গোয়েন্দা পড়াটা ছিল এক গোপন অভিযানের মতো। আম্মা ভাবত, আমি কতই না পড়ছি! কত আদর যতœ করত দিনভর পড়ায় ডুবে থাকতাম বলে। কোনো কাজের জন্যও ডাকত না। কিন্তু আমি? আমি তো তখন ‘রকি বীচে’! ভুলেই যেতাম বই নিয়ে আমার বিছানায় যে গড়াচ্ছি। আসলে, এই সিরিজ আমাদের শিখিয়েছিল, গোয়েন্দাগিরি শুধু ছেলেদের কাজ নয়। আর আমার মতো ডানপিটে বালিকার তো এটা মানতেই মন চাইত না। নিজেকে কিশোর পাশার মতো বুদ্ধিমান মনে হতো। মনে হতো ছেলেদের মতো শারীরিক শক্তি না থাকুক, মগজের শক্তি দিয়েই আমি সব উৎরে যাব। মেয়ে হিসেবে সমাজ আমাদের একটু শান্ত থাকতে বললেও, আমি কিশোরের মতো যুক্তি দিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি করতে চাইতাম।

মুসা আমানের বাঁধভাঙা সাহস আর ‘খাইছে’ বলার কায়দাটা ছিল আমার কাছে এক অদ্ভুত মুক্তির প্রতীক। আমি হয়তো জোরে হাসতে পারতাম না, কিন্তু মনে মনে মুসার মতো বলতাম, ‘খাইছে! এই রহস্য তো আজ ভেদ করবই!’

আর রবিন মিলফোর্ড তো ছিল আমাদের ভেতরের ‘আমি’। বই আর জ্ঞানের প্রতি রবিনের গভীর মনোযোগ দেখে বুঝতাম, শান্ত থাকা মানে দুর্বলতা নয়, বরং জ্ঞানই আসল অস্ত্র।

তবে এই সিরিজে আমাকে সবচেয়ে বেশি টানত যে চরিত্রটি সে হলো জিনা পার্কার। জিনা যখন রাফিকে নিয়ে অভিযানে যোগ দিত, তখন মনে হতো যেন আমি নিজেই ওদের দলের সদস্য হয়ে গেছি। জিনা যেন প্রমাণ করত, গোয়েন্দা দলে মেয়েদেরও সমান ভূমিকা থাকতে পারে, তারাও অ্যাডভেঞ্চার ভালোবাসে।

রকিব হাসান স্যার আমাদের মনকে এমন এক জাদুবলে টেনে ধরে রেখেছিলেন যে, পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে ভুলে যেতাম, চুল আঁচড়ানো বা সাজগোজ ফেলে বইয়ে মুখ গুঁজে থাকতাম। সেই সময় বইয়ের পাতায় লেখা প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি রহস্য, প্রতিটি ভয়, সবটাই ছিল সজীব। আজও যখন সেই হলুদ মলাটের বইগুলো দেখি, মনে হয় যেন সেই কিশোরী আমি, বই হাতে নিয়ে, চেনা জগৎ ছেড়ে এক অচেনা রহস্যের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ছি।

এই স্মৃতিগুলো শুধু বই পড়ার স্মৃতি নয়, এগুলো সেই সময়ের স্মৃতি, যখন আমরা কল্পনার ডানায় ভর করে নিজের ভেতরের গোয়েন্দা সত্তাটিকে খুঁজে নিয়েছিলাম।

লেখক : সহকারী শিক্ষক, আফরোজ খান

মডেল স্কুল, ময়মনসিংহ