ক্লাস সিক্সে উঠেছি। হাফ প্যান্ট ছেড়েই দিয়েছি প্রায়। সেই সুবাদেই কিনা কে জানে, একা একা বেড়াতে যাওয়ার অনুমতিও পেয়ে গেলাম বাড়ি থেকে। বেড়াতে গেলাম বড় আপার বাসায়। রহনপুর থেকে শিবগঞ্জ। মাঝে রাস্তা চল্লিশ কিলোমিটার। বাসে বসে মানুষের নানা গতি ও দুর্গতি দেখার যে এত আনন্দ, আগে কখনো পাইনি। তার ওপর, সঙ্গে নেই কোনো অভিভাবক। ফলে নিজের অভিভাবক নিজেই হয়ে ওঠা, বাসের টিকিট কাটা থেকে শুরু করে যাত্রাবিরতিতে কিছু একটা খেয়ে নেওয়া, মানুষকে সন্দেহ বা পছন্দ করা, সবই যখন নিজেকে করতে হচ্ছে, মনে হলো, বাহ! সত্যিই তো এবার বড় হয়ে গেলাম!
বিশাল এক আমবাগান। বেশিরভাগই ফজলি আমের গাছ। কত কত বছরের যে পুরনো, তার ইয়ত্তা নেই। এই মোটা মোটা গুঁড়ি। সূর্যের আলো অনেক কায়দা করে এই বাগানের ভেতরে ঢোকে। তারই মধ্যে বড় আপার বাড়ি। শান্ত স্নিগ্ধ ছায়াময় মায়াসজল বাড়ি। সময় যেন এখানে থমকে আছে। সব কিছু ঘটে যাচ্ছে নীরব উৎসাহে। সকালের তেড়ছা রোদের ভেতর বাড়িজুড়ে শ্যামল ভেজা ঘ্রাণ। আমার ‘মন মাতলো প্রাণ জুড়ালো’ অবস্থা। এমন স্নিগ্ধতার ভেতরই একদিন পেলাম এক গুপ্তধনের খোঁজ।
গুপ্তধন তো বটেই! এমন গুপ্তধন, যা আমার বাকিটা জীবন একেবারেই পাল্টে দিল। ঘটনাটা তাহলে পরিষ্কার করেই বলি। আপার বাড়ির দোতলার একটা ঘরে আমি থাকি। তারই পাশে ছোট্ট একটা ঘর। ওই ঘরে তেমন যে কেউ খুব বেশি যায়, তা না। আমিই একদিন অনেকটা কৌতূহলে ঘরটায় ঢুকলাম। টুকটাক আসবাব। ভারী পর্দার জানালা। আর একটা ছোট পুরনো তিন পেয়ে বুকশেলফ। কাছে যেতেই দেখলাম বুকশেলফ ভরে আছে ছোট ছোট বইয়ে। এমন বই, আমি পড়ুয়া হওয়া সত্ত্বেও, আগে দেখিনি। একটা তুলে নিলাম। মলাটে লেখা-তিন গোয়েন্দা!
গোয়েন্দা বই নাকি? পেছনে দেখলাম গোয়েন্দাদের পরিচয় দেওয়া আছে। কিশোর, মুসা আর রবিন। তারা মিলে তৈরি করেছে একটা গোয়েন্দা দল। ‘রকি বীচে’ তাদের আস্তানা। তিনজনই নায়ক। তবে রবিন আর মুসা ভিনদেশি। কিশোর বাংলাদেশের। থাকে চাচা-চাচির সঙ্গে। বাহ! দারুণ ব্যাপার তো!
বইটা খুলে পড়তে শুরু করলাম। কী যে আশ্চর্য জগৎ সে বইয়ের ভেতর। প্রায় এক টানে, বলতে গেলে হ্যাঁচকা টানেই, ঢুকে গেলাম সেই জগতে। আর বেরোতে পারলাম না।
অনেক পরে জেনেছি বইগুলোর বেশিরভাগ গল্পই আসলে বিদেশি কাহিনির ছায়াবলম্বনে। কিন্তু তাতে কী? আমি তো আমার ভাষাতে, আমার বয়সী চরিত্রদের মধ্যে, এমন দারুণ কিছু এর আগে পড়িনি। পড়তে পড়তে একেবারে মন্ত্রমুগ্ধের মতো একটা একটা করে শেষ করতে লাগলাম। মনে আছে, আমার যেদিন বাড়িতে ফেরার কথা, তারচেয়েও আরও কদিন বেশিই থাকলাম বড় আপার কাছে। এ কদিনে দিনে-রাতে দুইটা-তিনটা ওড়াতে শুরু করলাম তিন গোয়েন্দা। বাড়িতে এসেও কিশোর-মুসা-রবিনকে জোগাড় করতে থাকলাম। তখন ধীরে ধীরে পরিচয় হতে শুরু করল সেবা প্রকাশনীর অন্য বইগুলোর সঙ্গেও। গোয়েন্দা রাজু কিংবা সেবা ক্লাসিক। কিন্তু সত্যি বলতে কী, তিন গোয়েন্দার সঙ্গে যেন অন্য কিছুর তুলনাই হয় না। তিন গোয়েন্দার মেরি চাচি থেকে কত চরিত্রই যে আপন হয়ে উঠতে থাকল, খুলতে থাকল একেকটা ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার পৃথিবী। দেখার ভঙ্গি পালটে যেতে থাকল আমার। অন্ধকারে এখন আমি আগে চোখ বন্ধ করে নিই। তারপর খুলি। তিন গোয়েন্দার শেখানো বুদ্ধিতেই তখন একটু একটু দেখতে পাই ওই মিশমিশে কালোর মাঝেও। যে কোনো উদ্ভট ঘটনার মধ্যেও নিজেকে শান্ত রেখে, নিচের ঠোঁটটা দাঁতে চেপে, কিশোরের মতো ভাবার প্র্যাকটিসও শুরু করলাম। রবিনের মতো বইপাগল হলেও মুসার মতো ব্যায়ামবিদ হয়ে উঠতে পারছি না কিছুতেই। আমার শরীরবিদ্যা শুধু পুনর্ভবায় অক্লান্ত সাঁতারে জলবদ্ধ!
তবে এসবের ভেতরেই এক অদ্ভুত জিনিস খেয়াল করলাম আমি। মেরি চাচিকে সাহায্য করতে কিশোরেরা তাদের থালাবাসন মেজে দেয়। ব্যাপারটা অদ্ভুত না? কিশোরেরা কেন এটা করবে? আমি তখন যে জগতে, সেখানে বাড়ির এ সমস্ত কাজ মেয়েদের নামে স্বাক্ষরিত। কিশোররা তো ছেলে, তারা কেন এই কাজগুলো করছে? এই প্রশ্নই ধীরে ধীরে আমাকে আরও অনেক প্রশ্নের দিকে নিয়ে গেছে। এই প্রশ্নই আমাকে উত্তর দিয়েছে, ছেলের কাজ মেয়ের কাজ বলে আলাদা কিছু নেই এই পৃথিবীতে।
এই প্রশ্নের পত্তনই, আমি বিশ্বাস করি যে, ছেলেমেয়ে নারী-পুরুষের বিভক্তি পেরিয়ে নিজেকে ও অন্যকে মানুষ হিসেবে দেখার গুরুত্বপূর্ণ লেন্স আমাকে দিয়েছে। ফলে পরবর্তী জীবনে আমি যা, তার পেছনে তিন গোয়েন্দার আনন্দময় ভূমিকা রয়েছে। ভূমিকা রয়েছে রকিব হাসানের। রকিব হাসানের আরও অনেক পরিচয় রয়েছে, সেসব পরিচয়েও তিনি অনন্য। কিন্তু আমার কাছে তিনি তিন গোয়েন্দার লেখক, তিন গোয়েন্দার জনক। তার লেখনী ও সৃষ্ট চরিত্র আমাকে যেমন ভবিষ্যতের জন্য নিজের অজান্তেই তৈরি করেছে, তেমনি দিয়েছে উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি। আমার আনন্দময় শৈশবস্মৃতির বেশিরভাগ তারই দান।
রকিব হাসান মারা গিয়েছেন। তবে মৃত্যুকালে তিনি রেখে গেছেন আমাদের তীব্র আনন্দময় শৈশব।
লেখক : কথাসাহিত্যিক