রাকসুতে প্রথমবার জয় পেল শিবির

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনের ২৩ পদের ভেতর ভিপি ও এজিএসসহ ২০ পদেই জয় পেয়েছেন শিবির মনোনীত প্যানেলের প্রার্থীরা। সিনেটে ছাত্র প্রতিনিধির পাঁচ পদের মধ্যে তিনটিতেও জয় পেয়েছে ছাত্রশিবির মনোনীত প্যানেল ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’। এ ছাড়া ১৭টি হল সংসদের শীর্ষ ৫১ পদে বিপুল ভোটে বিজয় হয়েছেন শিবির ও ছাত্রী সংস্থা মনোনীত প্রার্থীরা। তবে জিএস পদে নির্বাচিত হয়েছেন সাবেক সমন্বয়ক সালাহউদ্দিন আম্মার। এ পদে শিবির প্যানেলের প্রার্থী সাবেক সমন্বয়ক ফাহিম রেজা দ্বিতীয় অবস্থানে।

৩৫ বছর পর আয়োজিত এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ছাত্রশিবির প্রথমবারের মতো রাকসুতে নিজেদের জায়গা করে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। রাবিতে শিবিরের কোনো নেতা প্রথমবার রাকসুর ভিপি হয়েছেন।

গত বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণের পর গণনা শেষে গতকাল শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক এফ নজরুল ইসলাম।

ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়, ভিপি পদে সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছেন মোস্তাকুর রহমান জাহিদ। তার প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ১২ হাজার ৬৮৭। প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের প্যানেলের শেখ নূর উদ্দিন আবীর পেয়েছেন ৩ হাজার ৩৯৭ ভোট।

জিএস পদে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন আধিপত্যবিরোধী প্যানেলের জিএস প্রার্থী সালাহউদ্দিন আম্মার। তার প্রাপ্ত ভোটসংখ্যা ১১ হাজার ৫৩৭টি। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ফাহিম রেজা পেয়েছেন ৫ হাজার ৭২৯টি। এজিএস পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে। ছাত্রশিবির মনোনীত প্যানেলের প্রার্থী এসএম সালমান সাব্বির নির্বাচিত হয়েছেন ৬ হাজার ৯৭১ ভোট পেয়ে। তার নিকটতম প্রার্থী ছাত্রদল মনোনীত প্যানেলের প্রার্থী জাহিন বিশ্বাস এষা পেয়েছেন ৫ হাজার ৯৪১ ভোট।

ছাত্রশিবির মনোনীত প্যানেলের অন্য বিজয়ীরা হলেন সহকারী ক্রীড়া ও খেলাধুলা সম্পাদক আবু সাঈদ মোহাম্মাদ নুন, সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক পদে জায়িদ হাসান জোহা, সহকারী সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক মো. রাকিবুল ইসলাম, মহিলাবিষয়ক সম্পাদক সাইয়িদা হাফছা, সহকারী মহিলাবিষয়ক সম্পাদক সামিয়া জাহান, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক পদপ্রার্থী বিএম নাজমুছ সাকিব, সহকারী তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সিফাত আবু সালেহ, মিডিয়া ও প্রকাশনা সম্পাদক মো. মুজাহিদ ইসলাম, সহকারী মিডিয়া ও প্রকাশনা সম্পাদক আসাদুল্লাহ গালিব, সহকারী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদে মুজাহিদুল ইসলাম সাঈম, বিতর্ক ও সাহিত্যবিষয়ক সম্পাদক ইমরান লস্কর, সহকারী বিতর্ক ও সাহিত্যবিষয়ক সম্পাদক মো. নয়ন হোসেন, পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক পদে আবদুল্লাহ আল মাসুদ, সহকারী পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক মাসুমা ইসরাত মুমু। এ ছাড়া কার্যনির্বাহী সদস্য পদে মো. দ্বীপ মাহবুব, সুজন চন্দ্র, মো. ইমজিয়াউল হক কামালি ও এবিএম খালেদ নির্বাচিত হয়েছেন।

ছাত্রদল মনোনীত প্যানেলের একজন প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। তিনি হলেন ক্রীড়া ও খেলাধুলা সম্পাদক পদের প্রার্থী নারগিস খাতুন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদে বিজয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী তোফায়েল আহমেদ।

এদিকে সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনে পাঁচজনের মধ্যে শিবির মনোনীত তিনজন নির্বাচিত হয়েছেন। তারা হলেন মোস্তাকুর রহমান জাহিদ, ফাহিম রেজা ও এসএম সালমান সাব্বির। অন্য দুজন সিনেট সদস্য হলেন সালাহউদ্দিন আম্মার ও আরেক সাবেক সমন্বয়ক আকিল বিন তালেব।

ছাত্রশিবিরের ইতিহাস সৃষ্টি : রাকসুর ইতিহাসে ছাত্রশিবির অতীতে কখনোই নিজেদের জায়গা করে নিতে পারেনি। এবারই পুরো প্যানেল জুড়েই তারা বিজয়ী হয়ে চমক দেখিয়েছে। এর আগে রাকসু নির্বাচন হয়েছে ১৬ বার। ওই নির্বাচনগুলোতে বিজয়ী হয়েছে বামপন্থি ধারার রাজনৈতিক দলগুলো। এর মধ্যে অন্তত ছয়বার শীর্ষ পদে বিজয়ী হয়েছে ছাত্র ইউনিয়ন, সাতবার বিজয়ী হয়েছে ছাত্রলীগ; ১৯৮৯ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হন ছাত্রদল প্যানেলের রুহুল কবীর রিজভী। এ নির্বাচনগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেনি শিবির। তবে রাবিতে শিবিরের শক্ত অবস্থান তৈরির পর আর রাকসুর নির্বাচনই হয়নি। সময়ের পরিক্রমায় বামপন্থি দলগুলো এখন দুর্বল। এ বছরের নির্বাচনে তাদের মধ্য থেকে কেউ কোনো পদে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাই করতে পারেনি।

এবারের নির্বাচনে ইতিহাস সৃষ্টি করে জয় পেয়েছেন ছাত্রশিবির মনোনীত প্যানেলের প্রার্থীরা। কেন্দ্রীয় সংসদের ভিপি ও এজিএসসহ ২৩ পদের মধ্যে ২০টিতেই তাদের জয় হয়েছে। ১৭টি হল সংসদের সবকটিতেই ভিপি, জিএস এবং এজিএসের ৫১ পদের সবটিতে তারা জয় পেয়েছে। সিনেটেও তাদের আধিক্য।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাহিদ বলেন, ‘এ ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ওপর বিভিন্ন সময়ে অনেক জুলুম নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। অনেক রক্তক্ষরণ হয়েছে। আমরা আর এগুলো দেখতে চাই না। আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি। এই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নতুন ইতিহাস তৈরি হলো। শিক্ষার্থীরা ৩৫ বছরের অচলাবস্থা ভেঙে দিয়েছে।’

                        বিজিতদের পরামর্শ নিয়েই ক্যাম্পাস গড়ে তুলব : রাকসু ভিপি

ফল ঘোষণা শেষে শুক্রবার সকালে রাকসুর নবনির্বাচিত সহসভাপতি (ভিপি) মোস্তাকুর রহমান জাহিদ সংবাদিকদের বলেন, ‘নির্বাচনে এক পদে অনেক যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। একজনই যেহেতু পাস করবে, তাই বাকিরা পরাজিত হয়েছে। যারা জয়ী হতে পারেনি তাদের সংখ্যা বেশি। আমরা বিজিতদের পরামর্শ, সহযোগিতা নিয়েই ক্যাম্পাস গড়ে তুলব। শিক্ষার্থীরা আমাদের জয়ী করেছেন। আমরা শিক্ষার্থীদের ম্যান্ডেট অনুযায়ী কাজ করব।’ তারাও সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

                        শিক্ষার্থীদের ম্যান্ডেটের বাইরে আমি একমুহূর্ত থাকব না : রাকসুর জিএস

চূড়ান্ত ফল ঘোষণার পর নবনির্বাচিত নেতারা একসঙ্গেই সংবাদ সম্মেলনে প্রতিক্রিয়া জানান। সেখানেই নবনির্বাচিত জিএস সালাউদ্দিন আম্মার বলেছেন, ‘আমার ম্যান্ডেট শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের ম্যান্ডেটের বাইরে আমি একমুহূর্ত থাকব না, ইনশাআল্লাহ। আজ থেকে এক বছর পর দায়িত্ব পালন শেষে আপনারা আমাকে জিজ্ঞাসা করবেন যে কেমন লাগছে। যদি দায়িত্বটা সঠিকভাবে পালন করতে পারি, তাহলে হয়তো এভাবে সম্মানের সঙ্গে আপনাদের কাছে এসে বলতে পারব যে, আমি এই এই দায়িত্ব পালন করেছিলাম। যে সম্মান নিয়ে আজকে ঢুকছি, সেই সম্মানটা নিয়ে বের হতে চাই।’

এ সময় আম্মারের পাশে বসেছিলেন তার মা। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে যে আদর্শ ও শিক্ষা দিয়ে তাকে মানুষ করেছি, আমি চাই যে, সে সেই আদর্শ ও শিক্ষাটা পূর্ণ করে শিক্ষার্থীদের ম্যান্ডেট অনুযায়ী সামনে কাজ করবে।’

হল সংসদে শীর্ষ পদে বিজয়ী যারা : নির্বাচনে ১৭টি হল সংসদে শীর্ষ পদ ৫১টি। যারা জয়ী হয়েছেন মাদার বখশ হল সংসদে ভিপি পদে মো. রুবেল আলি ও জিএস পদে ইব্রাহিম হোসাইন, শেরেবাংলা ফজলুল হক হলে ভিপি রানা হোসাইন ও জিএস তানজীল হোসাইন, শাহ মখদুম হলে ভিপি শামীম পাটোয়ারী ও জিএস বায়জিদ, নবাব আব্দুল লতিফ হলে ভিপি নেয়ামত উল্যাহ ও জিএস নুরুল ইসলাম শহীদ, সৈয়দ আমির আলি হলে ভিপি নাঈম ইসলাম ও জিএস সাব্বির ইসলাম, শহীদ শামসুজ্জোহা হলে ভিপি আশিকুর রহমান ও জিএস সোয়াইব হোসেন, হবিবুর রহমান হল সংসদে ভিপি আহমাদ আহসান উল্লাহ ফারহান ও জিএস আশিক শিকদার, মতিহার হলে ভিপি তাজুল ইসলাম ও জিএস আরিফুল ইসলাম, সোহরাওয়ার্দী হলে ভিপি কাউসার হাবিব ও জিএস সাচ্ছু হোসেন এবং বিজয়-২৪ হলে ভিপি রাছেল মিয়া ও জিএস ইমরুল হাসান মিশকাত নির্বাচিত হয়েছেন।

এ ছাড়া নারী শিক্ষার্থীদের হলগুলোর সংসদেও বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছে ছাত্রী সংস্থা সমর্থিত প্রার্থীরা। বেগম খালেদা জিয়া হল সংসদে ভিপি সাবরিনা মারজান ও জিএস জারিন তাসনিম রিফা, জুলাই-৩৬ হলে ভিপি সৈয়দা সমাপিকা আহমেদ সিমি ও জিএস তাসফিয়া তাবাসসুম, রহমতুন্নেসা হলে ভিপি সাইফুন নাসিরা ও জিএস হাবিবা আক্তার রিয়া, মন্নুজান হলে ভিপি সুমাইয়া জাহান ও জিএস তাসমেরি জাহান তন্বী, রোকেয়া হলে ভিপি অর্পণা হক মুগ্ধ ও জিএস মোসা. লায়লা খাতুন এবং তাপসী রাবেয়া হলে ভিপি মরিয়ম খাতুন ও জিএস তাওহিদা আক্তার বিজয়ী হয়েছেন।

ছাত্রদলের প্যানেলের একমাত্র বিজয়ী কে এই নার্গিস : নির্বাচনে ছাত্রদল সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নতুন প্রজন্ম’ প্যানেল থেকে ক্রীড়া সম্পাদক পদে নির্বাচনে অংশ নিয়ে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন মোছা. নার্গিস খাতুন। তিনিই ছাত্রদল প্যানেল থেকে একমাত্র বিজয়ী প্রার্থী। মোছা. নার্গিস খাতুন জাতীয় মহিলা ফুটবল দলের সাবেক একজন খেলোয়াড়। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। ২০১৪ সাল থেকে পেশাদার ফুটবলার হিসেবে খেলেন নার্গিস। বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দল ছাড়াও অনূর্ধ্ব-১৪, অনূর্ধ্ব-১৬, অনূর্ধ্ব-১৭ ও অনূর্ধ্ব-১৯ জাতীয় নারী দলের হয়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি।

নার্গিস বলেন, ‘রাকসুতে আমি ক্রীড়া সম্পাদক পদে জয়ী হয়েছি, আলহামদুলিল্লাহ। এটা আমার জন্য গর্বের, সম্মানের। এখানে শুধু আমি জয়ী হইনি, জয়ী হয়েছেন আমাকে ভোট দেওয়া প্রত্যেকটি ভোটার, জয়ী হয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা, যারা দলবল নির্বিশেষে যোগ্যতার মূল্যায়ন করেছেন।’

কৃতিত্ব শিক্ষার্থীদের, বললেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার : নির্বাচনে আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক এফ নজরুল ইসলাম। তিনি এ নির্বাচন আয়োজনের সব কৃতিত্ব শিক্ষার্থীদের প্রতি উৎসর্গ করেন।

তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে অনেক সমস্যা ছিল। মনে হয়েছিল এ নির্বাচন আর হবে না। কিন্তু আমাদের উপাচার্য স্থিরচিত্তে বলেছেন, নির্বাচন হতেই হবে। আমরা সেই নির্বাচন আয়োজন করতে সক্ষম হয়েছি। এজন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। ৩৫ বছর পর বহুল প্রতীক্ষিত এ নির্বাচনের ফল। এ নির্বাচন আমি আমার প্রিয় শিক্ষার্থীদের জন্য উৎসর্গ করলাম।