প্রধান উপদেষ্টা বললেন

আমরা বর্বরতা থেকে সভ্যতায় এসেছি

এক বছরের আলোচনার ভিত্তিতে রাষ্ট্র সংস্কারে বিভিন্ন উদ্যোগ এবং সেগুলো বাস্তবায়নের অঙ্গীকার সংবলিত ঐতিহাসিক জুলাই সনদ অবশেষে স্বাক্ষরিত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজনৈতিক দলের নেতাদের পাশাপাশি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসও এ রাজনৈতিক সমঝোতার দলিলে স্বাক্ষর করেছেন। সনদে স্বাক্ষরের পর প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘রাজনৈতিক দল ও ঐকমত্য কমিশন অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। সারা বিশ্বের কাছে এটি উদাহরণ হয়ে থাকবে।’

এ সনদের মাধ্যমে ‘বড় কাজ’ হয়েছে মন্তব্য করে ড. ইউনূস বলেন, ‘আমরা বর্বরতা থেকে সভ্যতায় এসেছি। আমরা এক বর্বর জগতে ছিলাম, যেখানে আইনকানুন ছিল না। এখন আমরা সভ্যতায় এসেছি। আমরা এমন সভ্য হব, যাতে বিশ্ব আমাদের প্রতি ঈর্ষা করে। বিশ্ব আজ আমাদের দিকে বিস্ময়ের সঙ্গে তাকিয়ে আছে।’ জুলাই সনদে স্বাক্ষরের পর প্রধান উপদেষ্টা তার বক্তব্যে সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘আল্লাহর রহমতে আজ আমরা সফল হতে পেরেছি। এটি একটি মহান দিবস এবং এর মধ্যে বিশেষ একটি ক্ষণ, যা আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন। সমগ্র জাতি ও রাজনৈতিক নেতারা একসঙ্গে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছেন।’

রাজনৈতিক মতানৈক্যের মধ্যে ঐকমত্যে পৌঁছানোর বিষয়টি তুলে ধরে ড. ইউনূস বলেন, ‘এটি একটি বিস্ময়কর ঘটনা। সারা দেশ দেখেছে, সব রাজনৈতিক দল শুধু বসেনি, চমৎকার আলোচনা করেছে। গভীরভাবে জ্ঞানের সঙ্গে, সৌহার্দ্যরে সঙ্গে আলোচনা করেছে। না দেখলে বিশ্বাস হতো না। সরাসরি সম্প্রচারে সবাই দেখেছে। সবাই শুনতে পেয়েছে, মনে মনে সবাই অংশ নিয়েছে। সারা জাতিকে এ আলোচনায় শরিক করা হয়েছে।’

ক্রমান্বয়ে দলগুলোর ঐকমত্যে পৌঁছানোর কথা তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা ‘অসম্ভবকে সম্ভব করার জন্য’ রাজনৈতিক দলের সদস্য এবং ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি ও সদস্যদের ধন্যবাদ জানান। তার ভাষায়, তারা ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে, তাদের নাম অমর হয়ে থাকবে।

অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, প্রথমে মনে হচ্ছিল বেশিরভাগ বিষয়ে ঐক্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো সেই অসম্ভব কাজকে সম্ভব করেছে। এটি ইতিহাস হয়ে দেশ এবং সারা পৃথিবীতে উদাহরণ হয়ে থাকবে। গণঅভ্যুত্থানের সেই নায়করা, যারা শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন, তাদের কারণেই আজ আমরা একমত হতে পেরেছি উল্লেখ করে ড. ইউনূস তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, ‘নতুন বাংলাদেশ গঠনে তাদের বিশাল ভূমিকা রয়েছে। এ পরিবর্তন সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। আমাদের নবজন্ম হয়েছে। এ স্বাক্ষরের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ গড়ার যাত্রা শুরু হয়েছে। আমরা যেন সঠিকভাবে এগোতে পারি, এ পথ থেকে যেন বিচ্যুত না হই।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাই। আমরা কারও দয়া-দাক্ষিণ্যে চলি না। আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াব। আজ যে সনদে স্বাক্ষর হলো, তা শিখতে বহু মানুষ আমাদের কাছে আসবে। কীভাবে ঐকমত্যে পৌঁছানো হয়েছে, তা তরুণদের জানাতে পাঠ্যপুস্তকে থাকবে।’

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘এ পরিবর্তনের জন্য দেশের আনাচে-কানাচে তরুণরা জীবন দিয়েছে। তরুণরাই বাংলাদেশকে গড়বে, এই দেশের নেতৃত্ব দেবে, পথ দেখাবে। এই দেশ তরুণদের। দেশের অর্ধেক মানুষের বয়স ২৭ বছরের নিচে। এটি দেশের সম্পদ। সারা দুনিয়ায় তরুণদের অভাব, তারা বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে আছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীকে পরিবর্তন করার সুযোগ তাদের এসেছে।’

বঙ্গোপসাগরের সম্পদের ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশ পরিবর্তন আনতে পারে মন্তব্য করে ড. ইউনূস বলেন, ‘মাতারবাড়ী, কক্সবাজার, মহেশখালী সব মিলিয়ে একযোগে বন্দর উন্নয়ন করলে পুরো এলাকা নতুন সিঙ্গাপুরে পরিণত হবে। সব দেশের মানুষ এখানে আসবে।’

তিনি বলেন, ‘আজ যে ঐক্যের সুর রচিত হলো, সেই সুরেই আমরা নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাব। ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন। সেই নির্বাচন বিশ্বের জন্য উদাহরণ হবে। ভবিষ্যতে যেন এই ঐক্য থাকে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।’

প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের পর ৭ মিনিটের একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হয়। যেখানে জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং এর পরবর্তী কার্যক্রম তুলে ধরা হয়। তুলে ধরা হয় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের নানা দুঃশাসন ও নির্যাতনের চিত্র। পরে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে রাজনৈতিক দলের নেতাদের কুশল বিনিময় ও ফটোসেশনের মাধ্যমে শেষ হয় জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠান।