‘ছাত্রলীগের তোফায়েলের’ হাতে ৬৩ পৌরসভার উন্নয়ন!

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী তোফায়েল আহমেদ কর্মক্ষেত্রে ছাত্রলীগের তোফায়েল নামে পরিচিত। ছাত্রজীবনে সক্রিয় রাজনীতি করায় সংশ্লিষ্টরা তাকে এ নামেই ডাকেন। চাকরিতে ঢুকেও তিনি রাজনীতি ছাড়েননি। পেশাভিত্তিক রাজনীতি করে কর্মক্ষেত্রে গত দেড় দশক তিনি এর ‘পূর্ণ’ সুবিধা নিয়েছেন। সরকার বদলের পরও সুবিধা পাওয়ার ধারা বদলায়নি। প্রধান প্রকৌশলীসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ম্যানেজ করে ৬ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্পের পরিচালক বনে গেছেন। তার হাতে বর্তমানে ৬৩টি পৌরসভার উন্নয়নের দায়িত্ব!

এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ‘ইমপ্রুভিং আরবান গর্ভনেন্স অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রজেক্ট’ (আইইউজিআইপি) এলজিইডির গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প, যা ২০২৩ সালের ২০ জুন একনেকে অনুমোদিত হয়েছে এবং এটি ২০২৮ সালের ৩০ জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। প্রকল্পের অধীনে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার, মেহেরপুরের গাংনী, কুমিল্লার লাকসাম, চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা, চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর, মুন্সীগঞ্জ, রাজশাহীর ভবানীগঞ্জ, যশোরের কেশবপুর, মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, লক্ষ্মীপুরসহ ৬৩টি পৌরসভা রয়েছে। এর আওতায় প্রায় ৯০০ কিলোমিটার ড্রেন, ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার রাস্তা এবং সাতটি কমিউনিটি সুবিধাসহ জলবায়ু সহনশীল এবং পাবলিক স্পেস নির্মাণ করা হবে।

এলজিইডির সবচেয়ে ‘ভালো’ প্রকল্পগুলোর এটি একটি। এ ধরনের প্রকল্পে সরকারের আস্থাভাজন প্রকৌশলী ছাড়া সচরাচর কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয় না। কিন্তু সবাইকে তাক লাগিয়ে গত ৪ এপ্রিল নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা তোফায়েলকে পিডি নিয়োগ দেওয়া হয়। এর আগে পিডি ছিলেন আব্দুল বারেক। তিনি দক্ষতার সঙ্গেই দায়িত্ব পালন করছিলেন। সাধারণত বড় প্রকল্পে হুটহাট পিডি বদলে বিরক্ত হয় উন্নয়ন সহযোগীরা। তারপরও আব্দুল বারেককে সরিয়ে তোফায়েল আহমেদকে পিডি করা হয়। দুই দিন পর আবার বারেককে পিডি করা হয়। তার প্রায় চার মাস পর ২৮ জুলাই বারেককে আবার সরিয়ে তোফায়েলকে পিডি করা হয়।

সাধারণরত উন্নয়ন সহযোগীদের প্রকল্পগুলোতে অভিজ্ঞ, দক্ষ ও চৌকস প্রকৌশলীদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু এই প্রকল্পে পিডি বদলের ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। অভিজ্ঞ ও সিনিয়রদের বাদ দিয়ে সাবেক ছাত্রলীগ নেতাকে দায়িত্ব দেওয়ায় প্রকৌশলীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।

এলজিইডির প্রকৌশলীরা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলোতে পরিচালক পরিবর্তনের নজির খুব একটা দেখা যায় না। পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যদি আগের পিডির চেয়ে দক্ষ বা অভিজ্ঞ কাউকে নেওয়া হতো, তাহলে আপত্তি ছিল না। কিন্তু এই প্রকল্পের পিডি নিয়োগের ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। নিয়োগকৃত পিডির চেয়ে অনেক দক্ষ প্রকৌশলী এলজিইডিতে আছেন। এমনকি যাকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তিনিও দক্ষ। পিডি নিয়োগের ক্ষেত্রে সিনিয়রিটি, দক্ষতা বা যোগ্যতার কোনো মানদ-ই অনুসরণ করা হয়নি। সদ্য বিদায়ী প্রধান প্রকৌশলীর ইচ্ছা হয়েছে, পিডি পরিবর্তন হয়েছে। এর পেছনে কী ঘটেছে তা এলজিইডির সবাই জানেন।

প্রকৌশলীরা আরও জানান, গত ১৫ বছর যারা বঞ্চিত ছিলেন, তারা এখনো বঞ্চিত। বড় প্রকল্পগুলোতে ছাত্রলীগ করা বা আওয়ামীপন্থিদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। বিগত সময়ে যারা বঞ্চিত হয়েছেন তাদের মূল্যায়ন করা উচিত। কিন্তু আগের সরকারের সুবিধাভোগীদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ এ দপ্তরটি। সিনিয়রিটি লঙ্ঘন করে আব্দুর রশিদ মিয়াকে যখন প্রধান প্রকৌশলী করা হয়, তখন থেকেই অনিয়মের শুরু। পিডি বদলেও আর্থিক লেনদেন হচ্ছে। বিষয়টি এখন ওপেন সিক্রেট। গত ১৫ বছর যারা সুবিধাভোগী ছিলেন তাদের হাতে কাড়িকাড়ি টাকা। সেই অবৈধ অর্থের বিনিময়ে তারা এখন বড় বড় প্রকল্প বাগিয়ে নিচ্ছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, তোফায়েল আহমেদ ডিপ্লোমা শেষ করে গাজীপুরের ‘ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়’ (ডুয়েট) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি করেন। ডুয়েট ক্যাম্পাসে তৎকালীন সময় তাকে সবাই ‘ছাত্রলীগের তোফায়েল’ হিসেবেই চিনতেন। তিনি বিভিন্ন সময়ের কমিটিতে একাধিক পদে দায়িত্ব পালন করছেন। এমনকি ২০০৫ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে এলজিইডিতে যোগ দেওয়ার পরও সহকর্মী-ব্যাচমেটরা তাকে ‘ছাত্রলীগের তোফায়েল’ হিসেবেই সম্বোধন করতেন। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের এক বছর আগে ২০২৩ সালে এলজিইডিতে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি প্রফেসর ড. প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী নুরুজ্জামান স্বাক্ষরিত আহ্বায়ক কমিটির ৫৮ নম্বর সদস্য তোফায়েল আহমেদ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের নেতা তোফায়েল আহমেদকে দলীয় অনুগত বিবেচনায় নিজ জেলা নওগাঁয় বদলি করে নিয়ে যান সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার। মন্ত্রীর ছত্রছায়ায় তার পরিকল্পনা অনুযায়ী সেখানে কাজ করেছেন তোফায়েল। সেই আনুগত্যের পুরস্কার আওয়ামী লীগ দিতে না পারলেও অন্তর্বর্তী সরকার দিয়েছে।

চব্বিশের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের বিপক্ষে তার জোরালো অবস্থানের কথা জেনেও কীভাবে এত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে প্রকৌশলীদের মধ্যে নানা গুঞ্জন চলছে। তোফায়েল আহমেদ নওগাঁ জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। সেখানেও নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। গত ২৫ এপিল নওগাঁ এলজিইডি নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে অভিযান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ সময় তার কাজের বেশ কিছু অসংগতি পায় দুদক টিম।

অভিযান শেষে দুর্নীতি দমন কমিশন সমন্বিত জেলা কার্যালয় নওগাঁর উপসহকারী পরিচালক মেহবুবা খাতুন রিতা সাংবাদিকদের বলেন, রাস্তার কাজে নিম্নমানের ইট, খোয়া, বালি ব্যবহার করা হচ্ছে এমন অভিযোগের ভিত্তিতে দুটি চলমান কাজ পরিদর্শন করা হয়। পরে রাস্তার কাজ পরিদর্শনে গিয়ে রাস্তার প্রশস্তকরণ ও গভীরতা শিডিউল অনুযায়ী পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়া নওগাঁয় দায়িত্বপালনকালে কমিশন ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে এই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী সাধন চন্দ্রের পছন্দের নির্দিষ্ট ঠিকাদার ছাড়া অন্য কাউকে কাজ দিতেন না তোফায়েল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ঠিকাদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা অনেকেই টেন্ডার জমা দিতাম, কিন্তু কাজ পেতাম না। যেই কাজ করত ৩ থেকে ৪ শতাংশ কমিশন দিতে হতো তোফায়লেকে। এরপর কমিশনের প্রস্তাব দিয়েও লাভ হয়নি। মূলত সাধন চন্দ্রের সুপারিশ ছাড়া কেউ কাজ করতে পারত না।’

কমিশন বাণিজ্যসহ অনিয়মের বিষয়ে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে তোফায়েল আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এগুলো মিথ্যা, আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। পিডি নিয়োগ বাতিল এবং পুনঃনিয়োগ নিয়ে করা প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা সরকারের বিষয়। এ নিয়ে সরকারই ভালো বলতে পারবে।

এ প্রসঙ্গে বক্তব্য নিতে একাধিকবার ফোন দিয়েও স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব রেজাউল মাকসুদ জাহেদীর সাড়া পাওয়া যায়নি।