১০ শতাংশ গাছ ‘লাগাতেই হবে’

গাছপালা ও জলাশয় কমে রাজধানী শহর ঢাকা দিন দিন তপ্ত দ্বীপে (হিট আইল্যান্ড) পরিণত হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় (২০২৫) ১০ শতাংশ বৃক্ষরোপণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিধিমালায় বলা হয়েছে, ২০ কাঠার ওপর প্লটের জন্য আবশ্যিকভাবে ১০ শতাংশ বৃক্ষরোপণ করতে হবে। তাছাড়া বিদ্যমান গাছ সংরক্ষণ করে নকশা অনুমোদন ও স্থাপনা নির্মাণ করলে বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

এদিকে, ঢাকার অধিকাংশ এলাকার ভবনের উচ্চতার সীমা বৃদ্ধি করে ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) ২০২২-৩৫-এর সংশোধন চূড়ান্ত হয়েছে, যা শিগগিরই গেজেট আকারে প্রকাশিত হবে। একই সঙ্গে খসড়া ঢাকা মহানগর ইমারত বিধিমালা-২০২৫-এর নীতিগত অনুমোদন করেছে ড্যাপ রিভিউ-সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটি। গত রবিবার গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে এক সভায় এ অনুমোদন দেওয়া হয়।

১০ শতাংশ গাছ লাগানো বাধ্যতামূলক : ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) বলা হয়েছে, গ্রামীণ এলাকার তুলনায় নগর এলাকার তাপমাত্রা স্বভাবতই অত্যধিক হয়ে থাকে। কারণ, নগর এলাকায় স্থাপিত ইট-সিমেন্ট-কাচের অবকাঠামোগুলো (রাস্তা, সুউচ্চ ভবন) সূর্য থেকে আসা আলোকরশ্মি শোষণ করে। এর ফলে এসব অবকাঠামোর পৃষ্ঠতল অত্যধিক তাপ ধারণ করে থাকে। তাছাড়া শিল্প কার্যকলাপ, গাড়ি থেকে নির্গত ধোঁয়ার মাধ্যমেও নগর এলাকার তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এ থেকে উত্তরণের জন্য বৃক্ষরোপণের কোনো বিকল্প নেই।

ড্যাপে বলা হয়েছে, তপ্ত দ্বীপ প্রভাব কমানোর জন্য ব্যবহৃত সেরা কৌশলগুলোর একটি হচ্ছে অধিক পরিমাণে গাছপালা রোপণ। বিভিন্ন সবুজ গাছপালা নগর এলাকায় শীতল এবং গরমের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির মাধ্যমে তাপমাত্রা কমিয়ে ফেলতে পারে। গাছপালা তার ভেতরকার পানি বাষ্পীভবন করে এবং ছায়া প্রদানের মাধ্যমে নগর এলাকায় শীতলতা দিতে পারে। এতে নগরের বায়ুদূষণও কমিয়ে নিয়ে আসা সম্ভব। কার্বন নিঃসরণের মাত্রা কমিয়ে আনতে গাছ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কিন্তু ঢাকায় দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে গাছপালা কমে আসছে। ২০২৩ সালে বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ ‘ঢাকা নগরীর সবুজ এলাকা এবং এর রাজনৈতিক অর্থনীতি’ নিয়ে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, ঢাকা মহানগরে ২০ ভাগ সবুজ এলাকা থাকা প্রয়োজন, সেখানে আছে সাড়ে আট ভাগের কম। তাও এসব এলাকা সীমানা প্রাচীরসহ নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

একই বছর পরিকল্পনাবিদদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) ল্যান্ডসেট স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ করে এক গবেষণায় উল্লেখ করে, ঢাকায় সবুজ এলাকা আছে মাত্র ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। গত ২৮ বছরে ঢাকা থেকে অন্তত ৪৩ শতাংশ সবুজ এলাকা ধ্বংস হয়েছে। একই সময়ে ঢাকা থেকে ৮৫ দশমিক ৮৫ ভাগ জলাভূমি হারিয়ে গেছে। এ সময়ে নির্মাণ এলাকা বা স্থাপনা বেড়েছে ৭৫ ভাগ।

এসব গবেষণা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, সবুজ গাছপালা এবং জলাশয় ধ্বংস করে কংক্রিটের স্থাপনা তৈরি করা হচ্ছে। এমনকি পার্ক ও খেলার মাঠসহ খোলা জায়গাগুলো কংক্রিট দিয়ে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে বলে জানায় বিআইপি। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ইমারত বিধিমালা এবার বৃক্ষরোপণ বাধ্যতামূলক এবং পুরাতন গাছ বাঁচিয়ে স্থাপনা করলে বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রতিটি গাছের জন্য ফ্লোর স্পেসে ১০ বর্গমিটার করে প্রণোদনা দেওয়ার কথা বিধিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।

ড্যাপে ভবনের উচ্চতা সীমা বাড়ছে : রাজউক সূত্র জানিয়েছে, ড্যাপ (২০২২-৩৫) যেসব বিষয়ের সংশোধনীতে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকার অধিকাংশ এলাকার ভবনের উচ্চতা সীমা বৃদ্ধি করা, মুখ্য জলস্রোত ও সাধারণ জলস্রোত একীভূত করে ‘বন্যা প্রবাহ অঞ্চল’ করা, যেখানে কোনো ধরনের স্থাপনা করা যাবে না। ব্লকভিত্তিক উন্নয়নে অন্তত ৫০ শতাংশ এলাকা খেলার মাঠ ও পার্কের জন্য রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

গুলশান ও ধানমন্ডি এলাকা বাদে রাজধানীর প্রায় সব এলাকার ভবনের উচ্চতার সীমা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় দ্বিগুণ হবে উচ্চতার সীমা। বিশেষ করে ঢাকার চারপাশে নতুন সংযুক্ত এলাকার ভূমিমালিকরা আগের চেয়ে দ্বিগুণ উচ্চতার ভবন নির্মাণের অনুমতি পাবে।

কোন এলাকায় ভবনের উচ্চতার সীমা কত বাড়ছে : সংশোধিত ড্যাপ এবং খসড়া ঢাকা মহানগর ইমারত বিধিমালা-২০২৫ অনুযায়ী, রাজউক এলাকার সব জায়গায়ই ভবনের উচ্চতা বেড়েছে। কোথাও কোথাও ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফলে আগে এসব এলাকায় সর্বোচ্চ পাঁচতলা ভবন করার সুযোগ ছিল, এখন সেখানে ১০ থেকে ১১ তলা পর্যন্ত করার সুযোগ পাবে। শুধু তাই নয়, ভবনের আশপাশে যত বেশি খালি জায়গা রাখবে, সেই প্লটে ভবনের উচ্চতায় তত বেশি ছাড় পাবে।

যদি কোনো এলাকায় এফএআরের মান ২ দশমিক ৫ হয়, সেখানে ন্যূনতম জমি ফাঁকা রেখে ভবন তৈরি করলে পাঁচ-ছয়তলা ভবন তৈরির সুযোগ পাবে। কিন্তু জমির মালিক যদি ভবনের আশপাশে আরও বেশি জমি ছাড়েন, তাহলে ২ দশমিক ৫ মান নিয়েও ওই জায়গায় আট-নয়তলা পর্যন্ত ভবন তৈরি করতে পারবেন।

উল্লেখযোগ্যভাবে এফএআরের মান পরিবর্তন করা জায়গাগুলোর মধ্যে রয়েছে মিরপুরের এফএআর ২ দশমিক ৮ থেকে বাড়িয়ে ৩ দশমিক ৪, দক্ষিণখানে ২ থেকে ৩ দশমিক ১, শেওড়াপাড়ায় ২ থেকে ৩, কড়াইলে ০ থেকে ২, মহাখালী ২ দশমিক ২ থেকে ৩ দশমিক ৩, মোহাম্মদপুর ২ দশমিক ৭ থেকে ৩ দশমিক ৪, পুরান ঢাকায় ২ দশমিক ৬ থেকে ৩ দশমিক ৩, খিলগাঁওয়ে ২ থেকে ৩ দশমিক ৪, টঙ্গীতে ২ দশমিক ৪ থেকে ৩ দশমিক ২, রূপগঞ্জে ২ থেকে ৩ দশমিক ২, সাভারে ২ থেকে ৩ দশমিক ৪, মিরপুর ডিওএইচএসে ২ দশমিক ৫ থেকে ৪ দশমিক ৮, খিলক্ষেত আবাসিক এলাকায় ২ থেকে ৪ দশমিক ৪ করা হয়েছে।

বারিধারা, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, কচুক্ষেত, উত্তরা, লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুর, পান্থপথ, ডেমরা, মগবাজারসহ বেশ কিছু এলাকায় ফারের বিদ্যমান মানের চেয়ে ১ দশমিক ৫ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। তাছাড়া ঢাকার চারদিকের এলাকা অর্থাৎ কেরানীগঞ্জ, সাভারের হেমায়েতপুর, নারায়ণগঞ্জের কাশিপুর, রূপগঞ্জের কাঁচপুর, ভুলতা গাউছিয়া এলাকায় আগের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ উচ্চতার ভবন নির্মাণের সুযোগ পাবেন ভূমিমালিকরা। পাশাপাশি জনঘনত্বও সর্বোচ্চ ২৫০ থেকে বাড়িয়ে ৩০০ করা হয়েছে। ড্যাপের সংশোধনীতে রাজধানী ঢাকাকে ২৭৫টি জনঘনত্ব ব্লকের পরিবর্তে ৬৮টি ব্লকে ভাগ করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আশরাফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি, প্রকৌশলী, পরিবেশবাদী সংগঠনসহ সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে ড্যাপের সংশোধনীর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। নতুন সংশোধনীর কারণে রাজধানীর ধানমন্ডি ও গুলশান এলাকা বাদে প্রায় সব এলাকায় ভবন এক থেকে দোতলার বেশি করা যাবে।

বড় প্রকল্পের অনুমোদন সহজ করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আগে তিনটি ধাপে বড় প্রকল্পের অনুমোদন নিতে হতো। এর মধ্যে ছাড়পত্র, বিশেষ কমিটির অনুমোদন এবং নকশা অনুমোদন নিতে হতো। সেবা সহজীকরণের স্বার্থে বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে বিশেষ কমিটির অনুমোদন বাদ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ নতুন ড্যাপের গেজেট প্রকাশের পর বড় ও বিশেষ প্রকল্পের অনুমোদনের জন্য ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র ও নকশা অনুমোদনের বিধান থাকছে।

গাজীপুর অংশ বাদ : ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) গাজীপুর মহানগরীর কিছু অংশ যুক্ত ছিল। সেখানে নতুন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ হওয়ায় ড্যাপ থেকে ওই এলাকা বাদ দেওয়া হয়েছে। শুধু ঢাকার ১ হাজার ০৯৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বিধিমালা পরিবর্তন : খসড়া ঢাকা মহানগর ইমারত বিধিমালা-২০২৫-এ বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। স্থাপনা ভাঙার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানির পুনঃব্যবহার ও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার নতুন করে সংযোজন করা হয়েছে।

আগে যেখানে কোনো ভবন নির্মাণের পরে পাঁচ বছর অন্তর অন্তর অকুপেন্সি সনদ নিতে হতো, সেখানে নতুন বিধিমালায় একবার অকুপেন্সি সনদ নিলে আর কোনো নবায়ন করতে হবে না। পাঁচ কাঠা ও এর চেয়ে বড় প্লটে স্যুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

পুরাতন বিধিমালা ২০০৮ অনুযায়ী, ভবন নির্মাণের আবেদন করলেই নির্মাণ অনুমোদন ফি দিতে হতো। নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, ভবনের নির্মাণের সুপারিশপ্রাপ্ত হলে এর পরে নির্মাণ অনুমোদন ফি পরিশোধ করতে হবে। আগে ভবন নির্মাণে আবেদন নিষ্পত্তির সময় সর্বোচ্চ ৪৫ দিন ধার্য হলেও, নতুন বিধিমালায় তা ১৮০ দিনে উন্নীত করা হয়েছে।

পরিবেশবাদীরা বলছেন, ড্যাপের সংশোধনে পরিবেশগত দিক প্রাধান্য দেওয়ার কথা বললেও এখানে শুধু মুখ্য জলস্রোত ও সাধারণ জলস্রোত একীভূত করে ‘বন্যা প্রবাহ অঞ্চল’ করার বিষয়টি পরিবেশগত দিকে সাফল্য।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বন্যা প্রবাহ অঞ্চলে স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে এটি খুব ভালো দিক। তবে যে শহর সাত দিনের পাঁচ দিন যানজটে অচল হয়ে থাকে, দুর্ঘটনা ঘটলে জ্যামের কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হয়, সেখানে ফার ও জনঘনত্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রে আরও চিন্তা করা দরকার ছিল।

ড্যাপ সংশোধনের লক্ষ্যে গত ১৯ মার্চ ড্যাপ রিভিউ-সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির সভায় সংশোধনী প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা হয়। সেখানে পুনরায় যাচাইয়ের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই নির্দেশনার আলোকে রাজউক ও মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে কমবেশি ৩৫টি সভা করে চূড়ান্ত খসড়া উপস্থাপন করে।