‘তুমি না সরলে মাহিরের হতে পারব না’

রাজধানীর পুরান ঢাকায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল নেতা জোবায়েদ হোসেনের হত্যার পরিকল্পনায় নাম উঠে এসেছে তারই ছাত্রী ও প্রেমিকা বার্জিস শাবনাম বর্ষা। আর সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন তার প্রথম প্রেমিক মাহির। পুলিশ বলছে, মাহিরের ছুরিকাঘাতে আহত জোবায়েদ বর্ষার কাছে শেষমুহূর্তে বাঁচার আকুতি জানিয়ে সিঁড়িতে যখন ছটফট করছিলেন, তখন জোবায়েদের উদ্দেশে বর্ষা বলেন, ‘তুমি না সরলে আমি মাহিরের হতে পারব না।’ এর কিছু সময় পরেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যান জোবায়েদ। এ ঘটনায় মাহির রহমান (১৯), বার্জিস শাবনাম বর্ষা (১৮) ও ফারদীন আহম্মেদ আয়লানকে (২০) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

এদিকে জোবায়েদ হত্যাকা-ে জড়িতদের ফাঁসির দাবিতে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে আদালতপাড়ায় বিক্ষোভ মিছিল করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা। তারা দ্রুত বিচার দাবি করেন এবং এ মামলায় আরও যারা জড়িত তাদেরও শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।

গতকাল দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এসএন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, মাহির ও বর্ষার মধ্যে প্রায় দেড় বছর ধরে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। টিউশন পড়াতে গিয়ে জোবায়েদের সঙ্গে বর্ষার ঘনিষ্ঠতা বাড়ে, যা মাহিরের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব হয়নি। এটি মূলত একটি ত্রিভুজ প্রেমের গল্প। তিনি বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েরর শিক্ষার্থী জোবায়েদ পুরান ঢাকার বংশাল থানার নুরবক্স লেনে বর্ষাকে পড়াতে গিয়ে দুজনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রেমিকা বর্ষা একই সময়ে মাহির ও জোবায়েদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ত্রিভুজ প্রেম থেকে বের হতে নিজেই হত্যার পরিকল্পনা সাজান বর্ষা।

পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, মাহির গত সেপ্টেম্বরে বিষয়টি জানতে পারেন। মাহিরকে বর্ষা বলেন যে, জোবায়েদকে না সরালে তিনি মাহিরের হতে পারবেন না। এরপর গত ২৩ সেপ্টেম্বর জোবায়েদকে হত্যা পরিকল্পনা করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য জনা গেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, হত্যার দিন বিকেল ৪টার দিকে জোবায়েদ টিউশন পড়াতে আসবেন এ তথ্য মাহিরকে দেন বর্ষা। এরপর মাহির তার বন্ধু আয়লানকে নিয়ে বর্ষার বাসার নিচের গলিতে অবস্থান নেন। জোবায়েদ বাসার নিচে পৌঁছালে তাদের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে মাহির জোবায়েদকে বর্ষাকে ছেড়ে দিতে বলেন, কিন্তু জোবায়েদ রাজি হননি। তখন মাহির ছুরি দিয়ে জোবায়েদের গলায় আঘাত করেন, ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়।

এক প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বলেন, আমরা তদন্তে পেয়েছি মাহির একই বাসায় ভাড়া থাকতেন। মাহির ও বর্ষার দীর্ঘদিনের পরিচয়। তবে তারা প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়েছেন দেড় বছর আগে। নিহত জোবায়েদ এক বছর ধরে বর্ষাকে পড়াতেন। মেয়েটা জোবায়েদের প্রতি দুর্বল হয়ে যায়। মেয়েটার অবস্থা ছিল এমন যে, সে যখন যার কাছে যেত তার কথা বলত। এমন অবস্থায় মাহিরকে তার প্রেমিকা বর্ষা বলেছে, জোবায়েদকে না সরাতে পারলে আমি তোমার হতে পারব না। এভাবেই তারা জোবায়েদকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে। মাহিরের এক আঘাতেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যান জোবায়েদ।

মাহিরকে তার মা থানায় হস্তান্তরের বিষয়ে নজরুল ইসলাম বলেন, আসলে আসামি গ্রেপ্তারে পুলিশের নানা কৌশল থাকে। আগে চট্টগ্রামের রাউজানে নিয়মিত শিক্ষার্থী অপহরণ হতো, মুক্তিপণ আদায় করা হতো। আমরা তখন অপহরণকারীদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এসে তাদের ব্যবহার করে সমঝোতার চেষ্টা করতাম। ঠিক এভাবেই আমরা মাহিরকে থানায় দিয়ে যেতে চাপ প্রয়োগ করেছি। এটা আমাদের কৌশলের অংশ। স্বেচ্ছায় থানায় হস্তান্তর করা হয়নি। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হত্যার পুরো পরিকল্পনা বর্ষার। বরগুনার মিন্নির ঘটনার সঙ্গে অনেকাংশ মিল রয়েছে। মেয়েটা দুজনের কারও কাছ থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না। ফলে সে নিজেই হত্যার পরিকল্পনা সাজায়।

হত্যার পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক কোনো বিষয় ছিল কি না জানতে চাইলে অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, মাহির ও বর্ষা ২৩ সেপ্টেম্বর হত্যার পরিকল্পনা করে। এখানে রাজনৈতিক কোনো বিষয় নেই। এটা ত্রিভুজ প্রেমের ঘটনা। হত্যার মুহূর্তে জোবায়েদের প্রেমিকা বর্ষার শেষ কথার বিষয়ে লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী বলেন, বর্ষা আমাদের নিশ্চিত করেছে যে, জোবায়েদ মারা যাওয়ার সময় সে উপস্থিত ছিল।

তদন্তে জানা গেছে, জোবায়েদের শেষ কথা ছিল বর্ষাকে উদ্দেশ্য করে ‘আমাকে বাঁচাও’। বর্ষা তখন জোবায়েদের উদ্দেশে বলে, ‘তুমি না সরলে আমি মাহিরের হব না।’ তদন্তে প্রকাশ পায় যে, দোতলার সিঁড়িতে জোবায়েদকে ছুরিকাঘাত করা হয়। এ সময় সে বাঁচার চেষ্টা করছিল। বর্ষাদের বাসা পাঁচতলায় হলেও ঘটনার সময় সে তিনতলার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে নিচের হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করে।

গত রবিবার বিকেলে রাজধানীর আরমানিটোলায় টিউশনিতে গিয়ে খুন হন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের ২০১৯-২০ সেশনের শিক্ষার্থী ও জবি ছাত্রদল আহ্বায়ক কমিটির সদস্য জোবায়েদ হোসেন। আরমানিটোলার একটি বাড়ির সিঁড়িতে রক্তাক্ত অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই এনায়েত হোসেন সৈকত রাজধানীর বংশাল থানায় তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।