গাজীপুর কালীগঞ্জে ২০২৫ উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশে দেখা যায় একমাত্র সরকারি কালীগঞ্জ শ্রমিক কলেজসহ সকল কলেজের ফলাফল আগের বছরের চেয়ে ব্যাপক ধস নেমেছে।
কালীগঞ্জের ৭টি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা পরীক্ষার্থীর মধ্যে তুলনামূলকভাবে প্রতিটি কলেজে ফলাফলের অবস্থা আগের তিন বছরের ফলাফল ক্রমান্বয়ে খারাপ ।
সরকারি কালীগঞ্জ শ্রমিক কলেজের অধ্যক্ষ আতাউর রহমান বলেন এবার উচ্চ মাধ্যমিক ফলাফল এত খারাপ হওয়ার পিছনে ছাত্রছাত্রীদের পড়ালেখার প্রতি অনীহা বেশি।
দৈনিক দেশ রূপান্তর প্রতিনিধির এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন আমরা এই বছর তিন বিষয় টেস্টে ফেল করা ছাত্র-ছাত্রীদেরও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়েছে।
কলেজে ফেল করা ছাত্রদের কোন কারণে পরীক্ষা অংশগ্রহণ করার জন্য দিয়েছেন এ বিষয়ে তিনি বলেন বোর্ডের কিছু বাধ্যবাধকতা থাকে সেই বিবেচনায় আমরা ফেল করা ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষা অংশগ্রহণ করার সুযোগ করে দিয়েছে।
প্রতিনিধি প্রশ্ন করেন সরকারি নিয়ম অনুযায়ী টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করা ছাত্রছাত্রীদের ফাইনাল পরীক্ষায় পাঠানোর তো কোন নিয়ম নাই ।
অধ্যক্ষ বলেন বোর্ডের কিছু নির্দেশনা থাকে তা মেনেই আমরা পরীক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ করতে দিয়েছি। প্রতিনিধি প্রশ্ন করেন যে সকল ছাত্র-ছাত্রী টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করেছে তাদের মধ্যে ফাইনাল পরীক্ষায় পাস করার সংখ্যা কেমন ?
উত্তরের তিনি বলেন, যারা ফেল করা ছাত্রছাত্রী তাদের ফাইনাল পরীক্ষার ফেল করার সংখ্যা বেশি।
এ বিষয়ে সরকারি কালীগঞ্জ শ্রমিক কলেজ উপাধ্যক্ষ ডক্টর আখতারুজ্জামান দৈনিক দেশ রূপান্তর প্রতিনিধি সঙ্গে কথা বলে জানান, পর্যায়ক্রমে শ্রমিক কলেজের ফলাফল খারাপের পিছনে বিশেষ করে কি কি কারণ তা তিনি এখনো জানেন না। তিনি গত ২৮ তারিখে অত্র কলেজে উপাধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন ।
এ বিষয়ে শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও সহকারী অধ্যাপক রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের মো. মাহমদুল হাসান কে দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধির প্রশ্ন করেন দীর্ঘ ৫৫ বছরের পুরানো এই কলেজ সরকারিকরণ হয়েছে ৬ বছর আগে ২০১৮ সালে, সরকারি করনের পর থেকে কি কারনে এই কলেজের ফলাফল ক্রমান্বয়ে খারাপের দিকে, এবং এ বছরে এমন ধসের কারণ কি?
এ বিষয়ে প্রভাষক বলেন বিশেষ করে গত বছরের ছাত্র আন্দোলনের পর থেকে ছাত্রছাত্রীরা লেখাপড়ায় ব্যাপক অমনোযোগী এটা একটি কারণ এবং অন্য বছরের ন্যায় উপর থেকে নির্দেশ ছিল না খাতায় নাম্বার বেশি করে দিয়ে পাস দেখাতে হবে। সম্পূর্ণ সঠিক মূল্যায়নের মাধ্যমে এ বছর ফলাফল নির্ধারিত হয়েছে।
পরীক্ষার অংশগ্রহণের কি নিয়মে শিক্ষার্থীদের নির্বাচিত করা হয়েছিল? উত্তরা বলে গত বছর টেস্ট পরীক্ষায় দুই থেকে তিনটি বিষয়ে ফেল করা পরীক্ষা দিতে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ায় পরীক্ষার ফলাফল এ বিপর্যয় হয়েছে বলে তিনি মনে করেন ।
প্রতিনিধি জিজ্ঞেস করেন সরকার থেকে এমন কোন নিয়ম বা বাধ্যবাধকতা ছিল কিনা যে পরীক্ষায় সরকারি কলেজে ফেল করা ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে? প্রশ্নের উত্তরে প্রভাষক বলেন এ বিষয়ে সরকার থেকে কোন সিদ্ধান্ত ছিল না, তথ্যাপিও ফেল করা ছাত্র-ছাত্রীদের পরীক্ষার সুযোগ করে দেওয়ার আমাদের ভুল হয়েছে। আমরা শিক্ষকরা যে ছাত্রছাত্রী ইংলিশে ও আইসিটি বিষয়ে ২০ নাম্বারের উপরে পেয়েছে তাদেরকে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলাম, দেখা গেছে যাদেরকে এই সুযোগ দেওয়া হইছে তাদের মধ্যে ইংলিশ এবং আইসিটিতে ফেল করা সংখ্যা বেশি।
প্রতিনিধি বলেন স্থানীয় সূত্রে ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় কলেজ ছাত্র ছাত্রীরা কলেজের শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট ও কোচিং না করলে তাদেরকে টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ দেখায় না। এ বিষয়ে প্রভাষক বলেন এটা সত্য না । তার পরেও কোন কোন শিক্ষক এরকম করে কিনা আমাদের জানা নেই।
প্রতিনিধি প্রশ্ন করেন সরকারি কলেজ হওয়ার কারণে ফলাফল এত খারাপ তার মানে আপনাদের কোন তদারকি করার বা কারো কাছে জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতা না থাকায় কি এর ফলাফল? উত্তরে শিক্ষক পরিষদ সাধারণ সম্পাদক বলেন বিষয়টি এরকম না, এই ফলাফলে আমরাও আন্তরিকভাবে দুঃখিত ও অপমানিত। শিক্ষকের মধ্যেও আভ্যন্তরীণ কোন্দলের ও আন্তরিকতার অভাবের বিষয়টিও এখানে জড়িত।
প্রতিনিধি এক প্রশ্নের উত্তরে প্রভাষক বলেন বেসরকারি থাকা অবস্থায় এর চেয়ে ভালো ফলাফল ছিল কিন্তু সরকারীকরণ করার পর থেকে আমাদের ফলাফল আগের চেয়ে খারাপ।আন্তরিকতার অভাবের বিষয়টিও এখানে জড়িত।
স্থানীয়ভাবে অনেকেই বলেন যে অত্র প্রতিষ্ঠানের ৪৩ জন শিক্ষকের মধ্যে প্রায় ৩৫ জন তথা ৮০% শিক্ষক এলাকার। গত সরকারের সাবেক এমপি ও ম্যানেজিং কমিটির রাজনৈতিক বিবেচনা বিভিন্ন পরীক্ষায় সি গ্রেট পেয়ে পাস ও নিয়োগ পরীক্ষায় তৃতীয় স্থান, পঞ্চম স্থান যাদের ছিল এই সকল শিক্ষকদেরকেও অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়। বিদায় তাদেরকে মনিটরিং করা এবং ক্লাস করার বিষয়টি তদারকি করা কষ্টসাধ্য।
সরকারি কালীগঞ্জ শ্রমিক কলেজে ২০২৩-২৪ সেশনে কলেজের ছাত্রছাত্রী ভর্তি হয় প্রায় ৮০০ জন তার মধ্য থেকে এবছর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন ৬৫৭ জন ও পাস করেন ২২১ জন ফেল করেন ৪৩৬ জন পাশের হার ৩৪.০৫%।
কালীগঞ্জের অন্যান্য কলেজের মধ্যে জামালপুর কলেজের পরীক্ষার্থী ১১৬ জন পাশ করে ৩৪ ফেল করেন ৮২ জন পাশের হার ২৯. ৫৭ %।
আজমপুর কলেজের পরীক্ষার্থী ৬৩ জন পাশ করে ২৪ ফেল করেন ৩৯ জন পাশের হার ৩৮.১০%।
কালিগঞ্জ মহিলা কলেজের পরীক্ষার্থী ৬৯ জন পাশ করে ৪২ ফেল করেন ২৭ জন পাশের হার ৬২.৬৯%।
সেন্ট নিকোলাস স্কুল এন্ড কলেজের পরীক্ষার্থী ৬২ জন পাশ করে ৩৭ ফেল করেন ২৫ জন পাশের হার ৫৯.৬৮%।
সেন্ট মারীস গার্লস হাই স্কুল এন্ড কলেজ পরীক্ষার্থী ২৩৫ পাশ করছে ১৯০ ফলে ৪৪ জন পাশের হার ৮১.২০%।
বীর মুক্তিযোদ্ধা রুহুল আমিন ঢালি উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ পরীক্ষার্থী ২৬ পাশ করছে ০৬ ফলে ২০ জন পাশের হার ২৪% ।
কালিগঞ্জ মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মো. নাজমুল ইসলাম বলেন আমরা এ বছর যাদেরকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করিয়েছিলাম, তাদের মধ্যে প্রায় ১৫ জন গত বছরের পরীক্ষায় এক ও দুই বিষয়ে ফেল করা পরীক্ষার্থী ছিল। তারা পুনরায় এই বছর পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে কিন্তু দীর্ঘ এক বছর পড়ালেখার সাথে তাদের সম্পৃক্ত না থাকায় এর মধ্যে থেকে সব পরীক্ষার্থী এই বছর ফেল করেছে। এই কারণে আমাদের পরীক্ষা পাশের হার সন্তুষ্ট জনক হয়নি। সামনের পরীক্ষাগুলো আমরা ভালো করব, তার জন্য নতুন করে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করছি।
কালীগঞ্জে সবগুলো কলেজেরই ফলাফল আগের চেয়ে ব্যাপক খারাপ কারণ হিসেবে অনেকে বলেন কলেজ গুলোর মধ্যে দলাদলি, শিক্ষকদের মধ্যে কোন্দল। ম্যানেজিং কমিটির অদক্ষতা এবং বিশেষ করে লেখাপড়া ব্যবস্থাপনা খুব খারাপ, সঠিক টাইমে শিক্ষকরা কলেজে আসেনা, নিয়মিত ক্লাস করার না, অভিভাবকদের সঙ্গে দায়সারা ভাবে আলোচনার অনুষ্ঠান দেখানো হয়। ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়মিত ক্লাস পরীক্ষা এবং তাদের বিভিন্ন টেস্ট পরীক্ষার মধ্যে দায়সারা ভাবে পাশ করিয়ে দেওয়া। বিশেষ করে প্রতিটি কলেজে টেস্ট পরীক্ষার সময় দুই তিনটি বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া। আরেকটি বিষয় হয়েছে আগের বছরের পরীক্ষার্থীদের এক বিষয়ে পরীক্ষার অংশগ্রহণের যে সুযোগ সেই সুযোগকে কাজে না লাগিয়ে শুধু রেজিস্ট্রেশনের সময় রেজিস্ট্রেশন করে নামমাত্র পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছেন দেখাগেল, দ্বিতীয়বার পরীক্ষার্থী ফেলের সংখ্যা বেশি।