অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের কর্মী, গৃহপরিচারক এবং নাবিকসহ দীর্ঘদিন শ্রম আইনের সুরক্ষার বাইরে থাকা শ্রমজীবীদের অধিকার নিশ্চিত করতে নতুন শ্রম আইন অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ। এতে নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি পুরুষ ও নারী শ্রমিককে একই কাজের জন্য ভিন্ন মজুরি দেওয়ার মতো বৈষম্যকে আইনে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এ অনুমোদনের মধ্য দিয়ে শ্রম আইনকে আধুনিক, আন্তর্জাতিক মানসম্মত এবং শ্রমিক ও উদ্যোক্তা উভয়পক্ষের জন্য অধিক ভারসাম্যপূর্ণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।
গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে ঢাকার তেজগাঁওয়ে তার কার্যালয়ে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে ওই অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ব্রিফিংয়ে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানান আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল ও প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, শ্রম আইন সংশোধনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশনগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ আইনটি যুগান্তকারী। আইএলওর কমিটি অব এক্সপার্টসের সুপারিশ, বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও রাষ্ট্রের মতামত এবং ত্রিপক্ষীয় কমিটির (শ্রমিক-মালিক-সরকার) আলোচনার ভিত্তিতে সংশোধনগুলো করা হয়েছে।
নতুন আইনে শ্রমের সংজ্ঞা আরও বিস্তৃত করা হয়েছে উল্লেখ করে আইন উপদেষ্টা জানান, অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, গৃহপরিচারক এবং নাবিকদের ক্ষেত্রেও শ্রম আইনের বিধান প্রযোজ্য হবে। এর ফলে এতদিন আইনের বাইরে থাকা এ শ্রমজীবীরা এখন থেকে শ্রমিক হিসেবে আইনি সুরক্ষা পাবেন।
আসিফ নজরুল বলেন, ‘নতুন শ্রম আইনে মালিকদের দ্বারা শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্ত করার প্রথা সম্পূর্ণভাবে নিষেধ করা হয়েছে। আগে অভিযোগের ভিত্তিতে অনেক মালিক শ্রমিকদের অন্য প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়া বন্ধ করে দিতেন এবার তা সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।’
আইন উপদেষ্টা বলেন, নারী শ্রমিকদের জন্য মাতৃত্বকালীন সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে, পুরুষ ও নারী শ্রমিককে একই কাজের জন্য ভিন্ন মজুরি দেওয়ার মতো বৈষম্যকে আইনে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, নতুন শ্রম আইন অনুযায়ী, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন ও নিবন্ধন প্রক্রিয়া অনেক সহজ করা হয়েছে। শ্রমিকদের জন্য বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হয়েছে, যাতে আদালতে না গিয়েও বিরোধ নিষ্পত্তি করা যায়।
ড. আসিফ নজরুল বলেন, ‘শ্রমিকদের দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ নিশ্চিতে একটি বিশেষ তহবিল গঠনের সিদ্ধান্তও অনুমোদন পেয়েছে। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় আহত বা নিহত শ্রমিক ও তার পরিবারের পুনর্বাসন ও চিকিৎসা এ তহবিল থেকে দেওয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ আইনে শ্রমিক-মালিক সম্পর্ককে আরও মানবিক ও ন্যায্য করার চেষ্টা করা হয়েছে। এটি শুধু শ্রমিক নয়, পুরো শিল্প খাতের জন্যই এক নতুন যুগের সূচনা করবে।’
আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা চাই একটি এমন শ্রমনীতি, যা একদিকে শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা করবে, অন্যদিকে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখবে। এ সংশোধনীর মূল লক্ষ্য হলো পারস্পরিক আস্থা ও ন্যায়ভিত্তিক শ্রম সম্পর্ক গড়ে তোলা।’
সভায় সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ-২০২৫, দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ-২০২৫ নীতিগতভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
ড. আসিফ নজরুল বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় আইন নিয়ে আমরা প্রায় ২৫-৩০ বছর ধরে কথা বলেছি। এবার তা বাস্তবায়নের পথে।’
প্রস্তাবিত আইনে অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি, পদায়ন ও শৃঙ্খলাবিষয়ক সব ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের হাতে থাকবে। পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব বাজেট ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা থাকবে, যাতে তারা নিজস্ব উন্নয়ন ও সম্পদ ব্যবহারে স্বাধীনতা পায়।
আইন উপদেষ্টা বলেন, এতে কিছু আর্থিক সংশ্লেষ আছে। তাই অর্থ উপদেষ্টা ও জনপ্রশাসন উপদেষ্টার মতামত নেওয়া প্রয়োজন। সেই আলোচনার পর আইনটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আবার উপদেষ্টা পরিষদে তোলা হবে। তিনি জানান, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর আইনও একইভাবে নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে।
আসিফ নজরুল বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে আমাদের অনেক তরুণ প্রাণ হারিয়েছেন, অনেকের স্থায়ী অঙ্গহানি হয়েছে। তাদের আত্মত্যাগের স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্যই এ জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। জাদুঘরটি দেশের প্রচলিত কোনো জাদুঘরের অধীন শাখা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি সম্পূর্ণ স্বাধীন কাঠামো ও প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। জাদুঘর পরিচালনার জন্য নতুন জনবল নিয়োগ, প্রশাসনিক কাঠামো নির্ধারণ ও বাজেট বরাদ্দের বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। তিনি আরও জানান, দ্রুত সময়ের মধ্যেই অধ্যাদেশটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের নতুন কনস্যুলেট খোলার সিদ্ধান্ত : উপদেষ্টা পরিষদের ওই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানের অঙ্গরাজ্য ডেট্রয়েট শহরে বাংলাদেশের নতুন কনস্যুলেট চালুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
তিনি বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, তাদের পুরো কাজকে যেন অনলাইনে সার্ভিস দিতে পারেন। সেটার সক্ষমতা যেন কনস্যুলেট চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে থাকে। সেই বিষয়ে উনি নির্দেশনা দিয়েছেন।’
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের দূতাবাস আছে। এ ছাড়া টেক্সাসের হিউস্টনে, ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসে, ফ্লোরিডার মায়ামিতে, লুজিয়ানার নিউ অরলেন্সে এবং নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশের কনস্যুলেট অফিস আছে। এ ছাড়া নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের স্থায়ী মিশন রয়েছে।
ব্রিফিংয়ে বিমানবন্দরে অগ্নিকা-ের বিষয়ে প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, বিমানবন্দরে কার্গো ভিলেজে অগ্নিকা-ের পর এখন কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কার্গো ভিলেজটি পুনরায় চালু করতে বলা হয়েছে। আগুনের কারণ অনুসন্ধানের জন্য স্কটল্যান্ড, তুরস্ক, অস্ট্রেলিয়া, চীনের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। দেশগুলো বিভিন্ন আলামতের ফরেনসিক করতে সাহায্য করছে।