আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করে নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করছে বিএনপি। ইশতেহারে এবার তরুণদের প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে দেশের শিক্ষিত বেকারদের বেকার ভাতা দেওয়ার কথা বলেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
দলটির নেতারা জানিয়েছেন, দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় বছরের পর বছর বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। এ অবস্থায় বিএনপি জনগণের ভোটে ক্ষমতায় গেলে শিক্ষিত বেকারদের বেকার ভাতা দেবে। পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে।
তারা জানান, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বিএনপি ভোটের অন্তত দুই সপ্তাহ আগে আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহার ঘোষণা করবে। এরপর
তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাধ্যমে প্রতিটি সংসদীয় আসনে ইশতেহার পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিএনপি নেতারা বলছেন, শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে তিনটি প্রহসনের নির্বাচনে তরুণরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। দেশে তরুণ ভোটার তিন কোটি চার লাখ সাত হাজার। তাদের বয়স ১৮ থেকে ২৯ বছর। মোট ১২ কোটি ৪৪ লাখ ৮০ হাজার ভোটারের মধ্যে ২৪ দশমিক ৪২ শতাংশই তরুণ। এদের বড় অংশই শিক্ষার্থী। সব মিলিয়ে আগামী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে তরুণ ভোটার হবেন গুরুত্বপূর্ণ ‘ফ্যাক্টর’। ভোটের হিসাব-নিকাশ তারা পালটে দিতে পারেন। কাজেই বিএনপির টার্গেটও তরুণ ভোটাররা। এসব কারণে তরুণদের আকৃষ্ট করতে মাসব্যাপী কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে সম্প্রতি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, তথ্যপ্রযুক্তির এই সময়ে বিশ্ববাজারের সঙ্গে দক্ষতা এবং যোগ্যতার প্রতিযোগিতায় যদি টিকে থাকতে হয় তাহলে অবশ্যই সবাইকে তথ্যপ্রযুক্তি এবং কারিগরি শিক্ষায় দক্ষতা অর্জন করতে হবে। আগামী দিনে জনগণের রায়ে বিএনপি আবারও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে এবার স্কুলপর্যায় থেকে কারিকুলামের ভেতরে আইসিটি এবং কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থাটিকে আমরা প্রবর্তন করব।’
‘দেশের শিক্ষিত কর্মহীন ব্যক্তিদের জন্য বিএনপি বেকার ভাতা চালু করার বিষয়ে ভাবছে’এমনটা জানিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমরা যেটা চেষ্টা করছি, যারা চাকরি পাননি তাদের জন্য একটা শিক্ষিত বেকার ভাতার ব্যবস্থা করার। এটা এক বছর পর্যন্ত থাকবে। এর মধ্যে সরকার তাদের কর্মসংস্থানের জন্য চেষ্টা করবে। শিক্ষিত বেকাররাও তাদের কর্মসংস্থানের চেষ্টা করবেন।’
বেকার ভাতা কীভাবে প্রদান করা হবে এবং এর পরিমাণ কী হবে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় জাতীয় বাজেটে যে বরাদ্দ থাকে সেখান থেকে অন্যান্য ভাতার মতো বেকার ভাতা প্রদান করা হবে। এ ছাড়া কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশে ব্যবসার সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করবে। গণতান্ত্রিক সরকার না থাকায় ব্যবসার পরিবেশ নেই। ব্যবসায়ীরা এখন হাত গুটিয়ে বসে আছেন। নির্বাচিত সরকার আসলে তারা বিনিয়োগ করবেন। আর বিনিয়োগ করলে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।’
ইশতেহার তৈরির কাজে যুক্ত বিএনপির এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস এনএইচসির আদলে বাংলাদেশে “সার্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা” গড়ে তুলতে চায় বিএনপি। বিএনপি আগামীতে ক্ষমতায় গেলে দারিদ্র্য বিমোচন না হওয়া পর্যন্ত সুবিধাবঞ্চিত দরিদ্র জনগণের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী আরও সম্প্রসারিত করবে। জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশের কম হবে না।’
তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক নাগরিককে একজন সরকারি রেজিস্ট্রার্ড চিকিৎসকের অধীনে রাষ্ট্রীয় খরচে সর্বোত্তম স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের পর্যায়ক্রমিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বিদ্যমান জেলা পর্যায়ের হাসপাতাল ও বিশেষায়িত স্তরের স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালীকরণ ও সঠিক রেফারেন্স সিস্টেম বাস্তবায়ন করা হবে, ২৪ ঘণ্টা হেল্প লাইন, জরুরি চিকিৎসাসেবা, দুর্ঘটনা পরবর্তী সেবা, দ্রুত স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা, স্বাস্থ্যসেবায় ন্যায়বিচার, রোগী ও সেবা প্রদানকারীর জন্য সমতাভিত্তিক আইন প্রণয়ন, সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে চিকিৎসক ও রোগীর সম্পর্কোন্নয়নের কার্যকর ব্যবস্থা করা হবে। এ ছাড়া ‘মধ্যমেয়াদি’ (এক থেকে পাঁচ বছর) এবং ‘দীর্ঘমেয়াদি’ (১০ বছর পর্যন্ত) পরিকল্পনার মাধ্যমে গোটা স্বাস্থ্য খাতে আমূল পরিবর্তন করা হবে।
শিক্ষা খাতে বিশেষ করে শিক্ষকদের বিষয়টি মাথায় রেখে শিক্ষা খাতের ইশতেহার তৈরি করা হচ্ছে। এতে বলা হয়েছে, জনগণের ভোটে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে অবশ্যই রাষ্ট্রের সামর্থ্য অনুযায়ী শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বাড়ানো কিংবা চাকরি স্থায়ীকরণ কিংবা জাতীয়করণের বিষয়টি ইনশাআল্লাহ ইতিবাচক বিবেচনার জন্য উচ্চপর্যায়ের কমিশন গঠন করবে বিএনপি।
দলটির নেতারা বলছেন, নির্বাচন সামনে রেখে ব্যতিক্রমী ও গণমুখী নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করা হচ্ছে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, তরুণ প্রজন্মের চাহিদা এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিয়ে বিএনপি এবার ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবকে ভিত্তি করেই আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বাস্তবসম্মত একটি ইশতেহার সাজানো হয়েছে। বিএনপির এই নির্বাচনী ইশতেহারে সংবিধান সংশোধন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা এবং ন্যায়পাল নিয়োগের প্রস্তাব বিশেষভাবে স্থান পাচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইশতেহার তৈরির কাজ চলছে। ইতিমধ্যে কাজ প্রায় শেষ করে ফেলেছি। এখন সেক্টর অনুযায়ী স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উঠবে। সেখানে আলোচনা হবে। এবং অনুমোদন হলে তা চূড়ান্ত করা হবে। ইশতেহার ৩১ দফার ভিত্তিতেই প্রণয়ন করা হচ্ছে।’
দলটির একাধিক নেতা বলছেন, সংস্কারে ও অন্তর্ভুক্তির বার্তা, বিচারবিভাগ ও প্রশাসনে কাঠামোগত পরিবর্তন, গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশে স্বাধীনতা, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, নির্বাচনী ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের আভাস, তারুণ্য ও প্রজন্মভিত্তিক প্রতিশ্রুতি, খাদ্য, কৃষি ও শিল্পে উদ্ভাবনী পরিকল্পনা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় অভূতপূর্ব বরাদ্দ, পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষা, পরিবেশ ও নগর উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি ও গবেষণাসহ বেশ কয়েকটি ভাগে ভাগ করে ইশতেহারের কাজ করছেন দলটির দায়িত্বপ্রাপ্তরা।
সূত্রমতে, ইশতেহারে সামাজিক কল্যাণে ব্যাপক প্রতিশ্রুতি, নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়নে সব নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্য কার্ড, নারীদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’, কৃষকদের জন্য ‘ফার্মার্স কার্ড’, শিক্ষিত বেকারদের জন্য বেকার ভাতা, এক বছরে ৬০ লাখ কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতিগুলোকে ‘বাস্তবতার ভিত্তিতে প্রস্তুত উন্নয়ন পরিকল্পনা’ হিসেবে দেখাবে বিএনপি। জেনজি ও ছাত্রজনতার চাওয়া-পাওয়া ও অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা প্রতিফলনের মাধ্যমে তরুণ সমাজকে সম্পৃক্ত করতেই বিএনপি এবার ব্যবহারিক শিক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান ও তরুণ নেতৃত্ব বিকাশের বিষয়গুলোকে ইশতেহারে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
দলটির এক শীর্ষস্থানীয় নেতা জানান, ‘তরুণদের আকর্ষণ করতে হলে শুধু আশ্বাস নয়, বিশ্বাসযোগ্য কর্মপরিকল্পনা লাগবে। ইশতেহারে সেই দিকেই আমরা যাচ্ছি।’
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের তত্ত্বাবধানে নগর জীবনের সমস্যা নিরসনে বিশেষ পরিকল্পনা যুক্ত হচ্ছে যার মধ্যে রয়েছে : যানজট নিয়ন্ত্রণ, ময়লা-আবর্জনা ব্যবস্থাপনা, সুপেয় পানির বণ্টন ব্যবস্থা, ভাষাকেন্দ্রিক ব্যবহারিক শিক্ষা থাকছে।
ইশতেহারে প্রতিহিংসামূলক রাজনীতির বিপরীতে সব মত ও পথের সহাবস্থানে একটি বৈষম্যহীন, সম্প্রীতিমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকারের কথা বলা হয়েছে। এ লক্ষ্যে নতুন ধারার ‘সামাজিক চুক্তি’ এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের রূপরেখাও ইশতেহারে তুলে ধরা হবে।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘ইশতেহার ৩১ দফার ভিত্তিতে তৈরি হচ্ছে। আমরা যেগুলোতে একমত হয়েছি, প্রথমে আমরা সেগুলোর ওপরেই জোর দেব। সেটা আপনি যে নামেই বলেন না কেন, স্বাভাবিকভাবে আমরা ঐকমত্য কমিশনে যেগুলোতে সবাই মিলে একমত হয়েছি, আমরা প্রথমে সেগুলোতে ইনশাআল্লাহ সরকার গঠনের সুযোগ পেলে প্রথমে সেগুলোতেই অবশ্যই জোর দেব।’
তিনি বলেন, ‘আর, তারপরে আপনি যেটা ৩১ দফার কথা বললেন, অবশ্যই ৩১ দফা আমাদের রাজনৈতিক কমিটমেন্ট জনগণের প্রতি। কারণ ওটা তো আমাদের রাজনৈতিক কমিটমেন্ট। এটাও যেমন পলিটিক্যাল কমিটমেন্ট, ওটাও আমাদের পলিটিক্যাল কমিটমেন্ট। এটা আমরা রাজনৈতিক দলগুলো মিলে একত্রিত হয়ে বলেছি। ওটাও আমরা অনেকগুলো রাজনৈতিক দল একত্রিত হয়েই কিন্তু ৩১ দফা দিয়েছি।’
বিএনপির একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ইশতেহার প্রণয়নে বিশেষজ্ঞ টিম যুক্ত রয়েছেন। দলটির সিনিয়র নেতা ছাড়াও সাবেক সচিব, কূটনীতিক, অর্থনীতিবিদ এবং জাতীয়তাবাদী চিন্তাবিদদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশেষজ্ঞ দল ইতিমধ্যেই ইশতেহারের ড্রাফট প্রস্তুত করেছেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ১৯ অঙ্গীকার নিয়ে ইশতেহার ঘোষণা করেছিল বিএনপি। সেই ইশতেহারে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন, বিচার বিভাগ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাসহ বেশ কিছু বিষয়ে অঙ্গীকার করে দলটি। এবারও সেসব বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে ঐকমত্য কমিশনের সিদ্ধান্ত ও ৩১ দফার সমন্বয়ে ইশতেহার প্রণয়নের কাজ করেছে বিএনপি। এজন্য করা হয়েছে কয়েকটি সাব-কমিটি। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ৩০টির বেশি অঙ্গীকার করে ক্ষমতায় এসেছিল বিএনপি। যার মধ্যে অনেকগুলোই পূরণ করেনি দলটি। তবে দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন, নারী আসন বাড়ানোসহ শিক্ষা-অর্থনীতি-কৃষি খাতে বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছিল খালেদা জিয়ার সরকার।