আবুল কালাম সবশেষ ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছিলেন ‘ইচ্ছে তো অনেক। আপাতত যদি জীবন থেকে পালিয়ে যেতে পারতাম।’ বুকভরা কষ্ট নিয়ে গত শনিবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ স্ট্যাটাস দেন তিনি।
গতকাল রবিবার সকালে অফিসের উদ্দেশে নারায়ণগঞ্জ থেকে মতিঝিলে আসেন আবুল কালাম। দুপুর ১২টায় মতিঝিল থেকে অফিসের কাজে ফার্মগেট যান। রাস্তার একপাশ দিয়ে হাঁটছিলেন। আকস্মিকভাবে ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনের ৪৩৩ নম্বর পিলারের বিয়ারিং প্যাড খুলে তার মাথায় পড়লে ঘটনাস্থলেই মারা যান কালাম। আগের রাতে ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাস যেন দুপুরে সৃষ্টিকর্তা কবুল করে ফেলেছেন। জীবন থেকে পালিয়ে গেলেন আবুল কালাম।
কিশোর বয়সে বাবা-মাকে হারিয়ে ভাইবোনদের সংসারে বেড়ে ওঠেন আবুল কালাম। কঠোর পরিশ্রম করে সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতে চেষ্টা করছিলেন। পরিবারের প্রিয় মানুষটিকেও নিয়ে গেলেন সৃষ্টিকর্তা। কালামের বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার মোক্তারের চর ইউনিয়নের ঈশ্বরকাঠি গ্রামে। তার এমন মৃত্যু মানতে পারছেন না স্বজন ও গ্রামের মানুষরা।
এদিকে হাসপাতালে নিহত আবুল কালামের স্ত্রী আইরিন আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘এটা দুর্ঘটনা নয়, হত্যা। এটা মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের অবহেলা। টাকা বা চাকরি দিয়ে ক্ষতিপূরণ হবে না। এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অবহেলায় জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার ছেলেটার বয়স ৪, মেয়ের ৩ বছর। বাচ্চা দুটি তাদের বাবাকে হারাল। সেটার ক্ষতিপূরণ কীভাবে হবে?’
জানা গেছে, ঈশ্বরকাঠি গ্রামের জলিল চোকদার ও হনুফা বেগম দম্পতির ছেলে আবুল কালাম। চার ভাই ও ছয় বোনের মধ্যে কালাম ভাইদের মধ্যে সবার ছোট। ২০ বছর আগে তার বাবা ও মা মারা যান। এরপর বড় হন বড় ভাই ও বোনদের কাছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে ঢাকায় একটি ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে কাজ করতেন। ২০১৮ সালে আইরিন আক্তারকে বিয়ে করেন। দাম্পত্য জীবনে এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক ছিলেন কালাম। স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তান নিয়ে নারায়ণগঞ্জের পাঠানটুলী এলাকায় থাকতেন। ঢাকার মতিঝিলের একটি ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে কাজ করায় তিনি প্রতিদিন নারায়ণগঞ্জ থেকে যাতায়াত করতেন। ব্যবসায়িক কাজে নিয়মিত ফার্মগেট এলাকায়ও আসতে হতো।
আবুল কালামের মৃত্যুর খবরে শোকার্ত ঈশ্বরকাটি গ্রামের বাসিন্দারা। কান্নায় ভেঙে পড়েন গ্রামে থাকা তার স্বজনরা। অনেকে ছুটে আসেন ঢাকায়।
শরীয়তপুর প্রতিনিধি জানান, নড়িয়া উপজেলা সদরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কীর্তিনাশা নদী। নদীর তীরের ঈশ্বরকাটি গ্রামটি উপজেলা সদর থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে। গতকাল বিকেলে ঈশ্বরকাটি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িতে চার ভাইয়ের টিনের চারটি বসতঘর রয়েছে। গ্রামে এলে একটি ঘরে থাকতেন আবুল কালাম। সেই ঘরটি তালাবদ্ধ। তার বড় ভাই খোকন চোকদারের ঘরে বসে কাঁদছিলেন বড় বোন সেলিনা বেগম; কাঁদছিলেন পরিবারের অন্য সদস্যরাও। তার মৃত্যুর খবর শুনে গ্রামের মানুষরা ও এলাকার তার বন্ধুবান্ধব বাড়িতে উপস্থিত হয়েছেন।
আবুল কালামের বাল্যকালের বন্ধু রিহিনুজ্জামান বলেন, ‘এক মাস আগে সে যখন গ্রামে এসেছিল, তখন আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আমার সেই হাস্যোজ্জ্বল বন্ধুটি আজ নেই, ভাবতে পারছি না।’
ঘরে বসে আবুল কালামের ছবি হাতে নিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বড় বোন সেলিনা বেগম বলছিলেন, ‘আমার ভাইটি সারা জীবন কষ্ট করেছে। কিশোর বয়সে বাবা-মাকে হারিয়েছে। আজ দুই শিশুসন্তান রেখে সে নিজেও না ফেরার দেশে চলে গেছে। এখন এই শিশু দুটির কী অবস্থা হবে? কে তাদের পিতৃস্নেহ দেবে। তার বিধবা স্ত্রী কার কাছে গিয়ে দাঁড়াবে? আল্লাহ, তুমি আমার ভাইয়ের পরিবারের সঙ্গে এমন কেন করলা।’
আবুল কালামের বড় ভাই খোকন চোকদার গ্রামের বাড়িতে থাকেন। পারিবারিক জমিজমা দেখাশোনা করেন। পারিবারিক সেসব জমিজমা ও ফসলাদির খোঁজ নেওয়ার জন্য গত মাসে কালাম গ্রামের বাড়িতে আসেন। বড় ভাইয়ের সঙ্গে কাজ সেরে আবার ঢাকায় ফিরে যান। খোকন চোকদার বলেন, ‘ওটাই যে আমার ভাইয়ের শেষযাত্রা হবে, আমি বুঝতে পারিনি। এখন সে ফিরবে প্রাণহীন দেহ নিয়ে। আমরা স্বজনরা অপেক্ষায় আছি তার প্রাণহীন দেহটার জন্য। আমাদের পরিবারের সঙ্গে কেন এমন হলো। আমার ভাইটি তো কারও কোনো ক্ষতি করেনি। তাহলে কেন অকালে তাকে প্রাণ হারাতে হলো। তার স্ত্রী-সন্তানকেইবা এখন কে দেখবে?’
নিহতের মেজভাবি আছমা বেগম বলেন, ‘দুপুর ১২টার দিকে আবুল কালামের সঙ্গে আমার শেষ কথা হয়েছে। সে বলছিল দুয়েক দিনের মধ্যে বাড়িতে আসবে এবং আমি যেন ইলিশ মাছ কিনে রাখি। আমার ভাই আর আসল না।’