রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় এক পথচারীর মৃত্যুর পর মেট্রোরেলের ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। তবে আগারগাঁও থেকে ফার্মগেট অংশে মেট্রোরেল তুলনামূলক কম গতিতে চলছে। দীর্ঘ সময় মেট্রোরেল বন্ধ থাকায় বাড়তি গাড়ির চাপে সড়কে যানজট দেখা দিয়েছে।
এদিকে বিয়ারিং প্যাডের মান নির্ধারণের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেছেন এক আইনজীবী। অন্যদিকে এ ঘটনার জন্য প্রকৌশল খাতে দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, অযোগ্য নিয়োগ এবং প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছে ইঞ্জিনিয়ার্স রাইটস মুভমেন্ট।
গত রবিবার দুপুর ১২টার দিকে ফার্মগেট এলাকায় মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড খসে পড়ায় আবুল কালাম নামে এক পথচারী মারা যান। এ ঘটনার পরপরই মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ওইদিন বিকেল থেকে আগারগাঁও-উত্তরা অংশে এবং সন্ধ্যায় শাহবাগ-মতিঝিল অংশে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। তবে দুর্ঘটনার পর থেকে আগারগাঁও থেকে শাহবাগ অংশে ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল।
গতকাল সোমবার বেলা ১১টা থেকে উত্তরা থেকে মতিঝিল রুটে মেট্রোরেল চলাচল শুরু হয়। কর্র্তৃপক্ষ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিষয়টি জানায়। তবে ট্রেন চলাচল শুরুর বিষয়টি না জানার কারণে বেশিরভাগ নগরবাসী সড়কপথে চলাচল করেন। ফলে গণপরিবহনে বাড়তি চাপ পড়ে এবং সড়কে যানজট দেখা দেয়। এমনকি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতেও যানজট লক্ষ করা গেছে।
১০ কিলোমিটার গতি : দুর্ঘটনার প্রায় সাড়ে ২২ ঘণ্টা পর ফার্মগেট স্টেশন দিয়ে মেট্রোরেল চলাচল শুরু হলেও বিজয় সরণি থেকে ফার্মগেট স্টেশন পর্যন্ত মেট্রোরেলের গতি অনেক কম বলে জানিয়েছেন যাত্রীরা। দুপুর ১২টার দিকে বিজয় সরণি থেকে ফার্মগেট স্টেশন পর্যন্ত ট্রেনের গতি ছিল ঘণ্টায় মাত্র ১০ কিলোমিটার। অন্যান্য স্টেশনের মধ্যে স্বাভাবিক গতি ছিল ঘণ্টায় ৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত। বিজয় সরণি স্টেশন পার হওয়ার পরই মেট্রোরেলের গতি হঠাৎ কমে যায়।
একজন যাত্রী বলেন, আগেও বিজয় সরণি থেকে ফার্মগেট স্টেশন পর্যন্ত মেট্রোরেলের গতি কম ছিল। তবে দুর্ঘটনার পর গতি আরও কমে গেছে। একজন যাত্রী গুগল ম্যাপে গতি পরীক্ষা করে দেখেন, বিজয় সরণি থেকে ফার্মগেট স্টেশন পর্যন্ত গতি মাত্র ১০ কিলোমিটার। তবে অন্য স্টেশনগুলোতে গতি ছিল ৭০ কিলোমিটার। আরেকজন যাত্রী বলেন, সম্ভবত ঝুঁকির কারণে কম গতিতে ট্রেন চালানো হচ্ছে। এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে অনেকে পোস্ট করেছেন।
নিরাপত্তার স্বার্থে বিজয় সরণি-ফার্মগেট অংশে মেট্রোরেলের গতি কমানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (লাইন-৬)-এর উপপ্রকল্প পরিচালক (গণসংযোগ) মো. আহসান উল্লাহ শরিফী বলেন, ফার্মগেট স্টেশনে থাকা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা জানিয়েছেন, আগের তুলনায় গতি কমানো হয়েছে। তবে এই মুহূর্তে এর কারণ বা ব্যাখ্যা আমি দিতে পারব না।
সড়কে যানজট : রবিবারের দুর্ঘটনার পর গতকাল বেলা ১১টা পর্যন্ত মেট্রোরেল সেবা আংশিকভাবে বন্ধ ছিল। পুরোপুরি চালু হওয়ার পরও অনেকে তাৎক্ষণিকভাবে তা জানতে পারেননি। ফলে অফিসগামী বেশিরভাগ মানুষ সড়কপথ ব্যবহার করেছেন। এতে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যানজট দেখা দেয়। অনেক যাত্রীকে গণপরিবহনের জন্য রাস্তায় অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। নগর পরিবহনের বাসগুলো যাত্রীতে পরিপূর্ণ ছিল।
মিরপুর, তেজগাঁও এবং ঢাকার কেন্দ্রস্থলের সংযোগ সড়কগুলোতে যাত্রীরা যানবাহনের অভাবে আটকা পড়েন। মিরপুর ১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও, বিজয় সরণি, ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজার এলাকায় তীব্র যানজট দেখা দেয়। এর মধ্যে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের একটি অংশে একটি কাভার্ড ভ্যান উল্টে যাওয়ায় যানজট পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।
বিয়ারিং প্যাডের মান নির্ধারণের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট : মেট্রোরেল ও সব ফ্লাইওভারের পিলারে ব্যবহৃত বিয়ারিং প্যাডের গুণগত মান নির্ধারণ এবং তা নিশ্চিত করতে কমিটি গঠনের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়েছে। গতকাল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন জনস্বার্থে এ রিট দায়ের করেন। রিটে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব, মেট্রোরেল কর্র্তৃপক্ষ ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ঢাকার পরিবহন সমন্বয় কর্র্তৃপক্ষ এবং ইটালিয়ান-থাই ডেভেলপমেন্ট পাবলিক কোম্পানিকে বিবাদী করা হয়েছে।
রিট আবেদনটি হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের কার্যতালিকায় এলে শুনানি হবে বলে জানিয়েছেন রিটকারী আইনজীবী। ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে বলেন, জীবনের সুরক্ষা ও নিশ্চয়তা আমাদের সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের উদাসীনতায় একজন মানুষ এভাবে মারা যাওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। এ ধরনের মৃত্যু সাংবিধানিক অধিকার চরমভাবে ক্ষুণœ করে এবং এটি চরম অবহেলা বলে আমি মনে করি।
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে এ ধরনের একটি ঘটনা ঘটেছিল। সৌভাগ্যক্রমে সে সময় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু এরপরও কর্র্তৃপক্ষের কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। ওই ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও তার প্রতিবেদন এখনো প্রকাশিত হয়নি। অর্থাৎ, কর্র্তৃপক্ষের উদাসীনতা স্পষ্ট। এসব বিবেচনায় এ রিট আবেদন করা হয়েছে।
গত রবিবার ফার্মগেট এলাকায় মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড খসে আবুল কালাম আজাদের মৃত্যুর ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের দাবি জানানো হতে পারে বলে জানিয়েছেন রিটকারী আইনজীবী।
মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড খসে পড়া অব্যবস্থাপনার ফল : মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড খসে একজন পথচারীর মৃত্যুর ঘটনায় দেশের প্রকৌশল খাতে দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, অযোগ্য নিয়োগ এবং প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছে ইঞ্জিনিয়ার্স রাইটস মুভমেন্ট। গতকাল বিকেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শহীদ মিনারের পাদদেশে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি এ দাবি জানায়।
সংগঠনের নেতারা বলেন, হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মেট্রোরেল প্রকল্পেও দুর্ঘটনা ঘটছে, যা প্রকৌশল খাতে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিস্তার প্রমাণ করে। নিয়োগ, টেন্ডার, মালামাল ক্রয় থেকে শুরু করে প্রকল্প তদারকিতে গাফিলতি রয়েছে।
সংগঠনটি আরও জানায়, বাংলা, সমাজবিজ্ঞান ও প্রশাসন বিভাগের মতো অপ্রকৌশলী ব্যক্তিরা প্রকৌশল খাতের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োজিত হচ্ছেন, যা দেশের অবকাঠামোগত নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। এ ছাড়া, ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের মতো বড় প্রতিষ্ঠানে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট সার্ভিস রুল বা অর্গানোগ্রাম নেই। সরকারি কমিটিগুলো দুর্নীতি ও বৈষম্য রোধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় কোনো ফল পাওয়া যায়নি, তবে তাদের মেয়াদ জবাবদিহি ছাড়াই বাড়ানো হচ্ছে।