সরকারের কাছে পাওনা ২৫ লাখ মেয়ের ভিক্ষায় চলেন সেতারা

খুলনার কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলের সাবেক ঝাড়ুদার সেতারা বেগম। এক সময় পরিশ্রম করে হোস্টেলের প্রতিটি কোণ ঝকঝকে রাখতেন তিনি। অথচ এখন তার দিন কাটছে অন্ধকার, অগোছালো, স্যাঁতসেঁতে একটি ঘরে। তিনবার স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে এখন শয্যাশায়ী তিনি। জীবন চলছে প্রতিবন্ধী মেয়ের ভিক্ষার টাকায়। অথচ মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের এ প্রতিষ্ঠানটির কাছে তার বেতন-ভাতা বকেয়া পাওনা রয়েছে প্রায় ২৫ লাখ টাকা।

শুধু সেতারা বেগমই নন; খুলনা কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলের শুরু থেকে যে ১১ জন নিয়োগ পেয়েছিলেন, তাদের বেশিরভাগের অবস্থাই এমন। ওই ১১ জন নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে ২০০৩ সালের জুন পর্যন্ত পুরনো স্কেলে পুরোপুরি বেতন-ভাতা পেয়েছেন। তবে ২০০৩-এর জুলাই থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত পেয়েছেন বেতন-ভাতার অর্ধেক। আর ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত সব কর্মচারীর বেতন-ভাতা সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।

হোস্টেল সূত্র জানিয়েছে, ওই ১১ জনের মধ্যে ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সাতজন অবসরে গেছেন। একজন মারা গেছেন। বাকি তিনজন এখনো কর্মরত। দীর্ঘদিন ধরে বেতন-ভাতা না পাওয়ায় কর্মরতদের পাশাপাশি অবসরে যাওয়া ও কর্মরত কর্মচারীরা এখন দিশেহারা। অভাব-অনটনে ধারদেনায় জর্জরিত হয়ে অথৈ সাগরে পড়েছে পরিবারগুলো। অথচ তারা প্রত্যেকেই বেতন-ভাতা বাবদ লাখ লাখ টাকা পাবেন প্রতিষ্ঠানের কাছে। হোস্টেল সূত্র বলছে, ১১ কর্মচারীর মোট বকেয়া দাঁড়িয়েছে ২ কোটি টাকার বেশি।

প্রতিষ্ঠানটির সাবেক এবং বর্তমান কর্মচারীরা বলছেন, বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে দফায় দফায় চেষ্টা চালিয়েও কোনো সুরাহা হয়নি। রাজস্বভুক্ত না হওয়ায় দায়িত্ব নেননি কোনো কর্মকর্তা। অবশ্য ২০২২ সালে অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক ফরিদা পারভীন এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ের থোক বরাদ্দ থেকে ওই ১১ জন কর্মচারীর বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধের অনুরোধ করেছিলেন। ওই প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেছিলেন, ‘অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে হোস্টেলের বিল পরিশোধে অপারগতা প্রকাশ করা হলেও বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধে অপারগতা জ্ঞাপন করা হয়নি।’

তবে ২০২৪ সালের অক্টোবর মানে তৎকালীন মহাপরিচালক কেয়া খান এক চিঠিতে বলেছিলেন, ‘বেতন-ভাতা বাবদ ১ কোটি ৯১ লাখ ৯৬ হাজার ৫৫১ টাকা হোস্টেলের সীমিত আয় থেকে পরিশোধ করা সম্ভব নয়। বিষয়টি অর্থ বিভাগকে জানালে তারাও অপারগতা প্রকাশ করেছে।’ তবে তিনি সার্বিক বিবেচনায় বিষয়টি অর্থ বিভাগকে পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেন।

আর হোস্টেলের কর্মচারীদের একটি প্রতিনিধিদল গত মাসে বর্তমান মহাপরিচালক কাজী গোলাম তৌসফের সঙ্গে দেখা করে তাদের অবস্থার কথা জানালে তিনিও বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনার আশ্বাস দেন।

আশির দশকে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে মহিলাদের নিরাপত্তা ও আবাসন সমস্যার সমাধানে বিভাগীয় শহরগুলোতে কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সেই পরিকল্পনায় মহানগরী খুলনার বয়রায় ১ বিঘা ৮ কাঠা জমিতে নির্মিত হয় খুলনা কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল। এরপর প্রকল্পের আওতায় ১৯৮৬ সালের জুন মাসে হোস্টেলটি চালু হয়। ১৯৮৬ ও ’৮৭ সালে হোস্টেলটি পরিচালনায় নিয়োগ দেওয়া হয় ১১ জন কর্মচারী। তারা হলেন সহকারী হোস্টেল সুপার পদে হাসনা হেনা, হিসাবরক্ষক কাম ক্যাশিয়ার পদে মো. মাসুদুর রহমান, অফিস সহকারী কাম টাইপিস্ট পদে আব্দুল মান্নান, মেসেঞ্জার কাম পিয়ন পদে মো. আবুল হোসেন, কুক পদে সুফিয়া খাতুন ও মর্জিনা বেগম, ওয়েটার পদে খায়রুন নেছা ও হাচিনা পারভীন, দারোয়ান পদে সৈয়দ আজিজুর রহমান ও মো. আবুল কালাম এবং ঝাড়ুদার পদে সেতারা বেগম নিয়োগ পান।

ঝাড়ুদার সেতারা বেগমের মেয়ে আকলিমা বেগম জানান, তারা স্বামী-স্ত্রী দুজনই প্রতিবন্ধী। তাদের একটি সন্তান রয়েছে। মহানগরী খুলনার আন্দিরঘাট এলাকায় এক কক্ষের একটি ঝুপড়ি ভাড়া ঘরে তারা বসবাস করেন। তাদের এ সংগ্রামের সংসারে যোগ দিয়েছেন তিনবার স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে ‘অচল’ হয়ে পড়া তার মা। এখন ভিক্ষা করেই চলছে মায়ের ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয়সহ তাদের জীবন-জীবিকা।

কর্মচারী মো. আবুল কালাম জানান, তার স্ত্রী হার্ট, কিডনি ও পিত্তথলিতে পাথর রোগে ভুগছেন, তিন সন্তান লেখাপড়া করছে। অথচ দীর্ঘদিন ধরে বেতন নেই। ধার করে ওষুধ কিনতে হয়। দেনার জালে জড়িয়ে এখন আর বের হওয়ার পথ দেখছেন না। এমন দুর্দশা থেকে বাঁচতে তিনি দ্রুত বকেয়া পরিশোধের দাবি জানিয়ে বলেন, ‘আমরা দ্রুত আমাদের বকেয়া পারিশ্রমিকটা চাই।’

মো. আবুল হোসেন বলেন, ‘হোস্টেল পরিচালনাসংক্রান্ত নীতিমালা ও নিয়োগপত্রে নানা সুযোগ-সুবিধার কথা বলা হয়েছে। অথচ ২২ বছর ১১ জন কর্মচারী অর্ধেক বা বেতন না পেয়েই কাজ করেছেন। বর্তমানে কর্মরত তিনজনের বেতন-ভাতাও বন্ধ। ফলে অভাব-অনটনে অবসরে যাওয়া ও কর্মরত সব কর্মচারী ধারদেনায় জর্জরিত হয়ে পড়েছেন। পরিবারে অভাব-অনটন লেগেই আছে। চরম মানবেতর জীবনযাপন করছি আমরা।’

আবুল হোসেন জানান, বেতন-ভাতা না পেয়ে হিসাবরক্ষক কাম ক্যাশিয়ার মো. মাসুদুর রহমানের করুণ পরিণতি হয়েছে। ২০২২ সালের ১৭ এপ্রিল অভাব-অনটন ও দেনার চাপে তিনি আত্মহত্যা করেন। এ ঘটনার পরও কর্র্তৃপক্ষ কোনো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।

তবে এ প্রসঙ্গে খুলনা কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলের সুপার মোছা. সুমিতা ইয়াসমিন বলেন, ‘খুলনার কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল রাজস্ব খাতে যায়নি। তাই হোস্টেল পরিচালনা কমিটি নিজস্ব আয় থেকে বেতন-ভাতাসহ ইউটিলিটি ব্যয় মেটাতে সিদ্ধান্ত নেয়। সে ক্ষেত্রে হোস্টেলের ধারণক্ষমতা ১৫০টি সিট। এর মধ্যে ৮০টি সিট পরিত্যক্ত। বাকি ৭০টি সিটে বর্ডার থাকতে পারে। এ ছাড়া দোকানঘর ভাড়া থেকে কিছু টাকা আয় হয়। তাই সিট ভাড়া ও দোকানঘর ভাড়ার টাকা দিয়ে পৌরকর ও বিদ্যুৎ ইউটিলিটি পরিশোধে কিছু টাকা খরচ হয়। বাকি টাকা ব্যাংকে জমা রেখে মাঝেমধ্যে তাদের কিছু বেতন-ভাতা দেওয়া হয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে বকেয়ার কারণে বেতন-ভাতা প্রায় ২ কোটি টাকা কর্মচারীদের পাওনা রয়েছে। হোস্টেল পরিচালনা কমিটি ও মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি অবগত করেছে।’

নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মমতাজ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি অবশ্যই মানবিক। যারা প্রকল্পে কাজ করতেন, তারা তখন প্রকল্পের ধরন অনুযায়ী বেতন-ভাতা পেয়েছেন। সেখানে তারা রাজস্ব খাতের আওতায় ছিলেন না। ফলে চাকরি-পরবর্তী সুবিধায় তারা সরকারি সুবিধা পাচ্ছেন না। তাদের চাকরিকে সরকারিভাবে ভাবাটাও সঠিক নয়। ফলে খুবই সীমিত আয় থেকে বর্তমান কর্মরত ও কিছু অবসরপ্রাপ্তকে সুবিধা দেওয়া যায়। এর বেশি নয়।’

তবে মানবিক বিবেচনায় যারা আগে এ প্রকল্পে ছিলেন, তাদের পাওনা কী পরিমাণ অথবা কতজন এমন পাওনাদার আছে তাদেও বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘অর্থ বিভাগের সঙ্গে আলাপ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে তারা কী ধরনের সুবিধা পেতে পারেন।’ তবে তার ভাষ্য, ‘এই প্রকল্পকে রাজস্ব খাতে আনার কোনো সুযোগ আপাতত নেই।’

অবশ্য অবসরে যাওয়া ও কর্মরত কর্মচারীরা বলছেন, রাজস্ব খাতে যাওয়ার বিষয়টি এখনো তাদের কাছে মুখ্য নয়। বকেয়া বেতন-ভাতা পেয়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জীবনের বাকি সময়টা হয়তো কিছু স্বস্তিতে কাটত। যারা বিপুল পরিমাণে ঋণের জালে জড়িয়েছেন, তারা মৃত্যুর আগে ঋণমুক্ত হতে পারবেন।