গ্রামীণ অঞ্চলে ডিজিটাল রূপান্তর প্রক্রিয়া চলমান

দেশ রূপান্তর : যুগের প্রয়োজনে প্রায় সব ব্যাংকই তাদের সেবাগুলোকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে রূপান্তর করেছে। সত্যিকার অর্থে কতটা ডিজিটাল হলো ব্যাংক সেবা?

মো. আহসান-উজ জামান : বর্তমান সময়ে ব্যাংক খাতে ডিজিটাল রূপান্তর এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মিডল্যান্ড ব্যাংক শুরু থেকেই প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। এখন গ্রাহকরা ঘরে বসেই কোনো শাখায় না গিয়ে অ্যাকাউন্ট খোলা, ফিক্সড ডিপোজিট বা ডিপিএস চালু করা, কিউআর কোডের মাধ্যমে বিভিন্ন পেমেন্ট সম্পন্ন করার পাশাপাশি ব্যাংকিং অ্যাপ ব্যবহার করে ফান্ড ট্রান্সফারের সুবিধা নিতে পারছেন। তবে গ্রামীণ ও দূরবর্তী অঞ্চলে এই ডিজিটাল রূপান্তর এখনো একটি চলমান উন্নয়ন প্রক্রিয়া হিসেবে এগিয়ে চলছে।

দেশ রূপান্তর : ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা বাংলাদেশে আর্থিক লেনদেন সহজ করে দিয়েছে। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে আপনারা কী ধরনের সেবা দিচ্ছেন?

মো. আহসান-উজ জামান : মিডল্যান্ড ব্যাংকের যাত্রার প্রথম দিকেই কন্ট্যাক্ট সেন্টার (১৬৫৯৬) চালু করা হয়েছে, যেখানে গ্রাহক তার যেকোনো দরকারে সহজেই ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। সেই সঙ্গে, ‘মিডল্যান্ড অনলাইন’ অ্যাপ, একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা যার মাধ্যমে কাস্টমার অনবোর্ডিং, ফান্ড ট্রান্সফার থেকে শুরু করে, এফডিআর বা ডিপিএস খোলা, ইউটিলিটি বিল প্রদান ইত্যাদি সেবা ঘরে বসেই গ্রহণ করা যায়। তাছাড়া, চেক বইয়ের জন্য অনুরোধ, ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধ, মোবাইল রিচার্জ, ডিজিটাল লেন্ডিং-এর সুবিধাও আছে আমাদের অ্যাপে। এছাড়াও, মিডল্যান্ড ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট/এমসিএম (গঈগ), একটি আধুনিক ও কার্যকরী প্ল্যাটফর্ম যা করপোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহকদের জন্য আন্তঃব্যাংক স্থানান্তর (বিইএফটিএন, আরটিজিএস), অ্যাকাউন্ট স্টেটমেন্ট, লেনদেন করা এবং লেনদেন ট্র্যাকিং, বিল পরিশোধ এবং ফান্ড মুভমেন্ট আরও সহজ ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালনার সুযোগ করে দেয়।

তাছাড়াও, ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ (এনপিএসবি) চালুর শুরুর দিকের প্রথম ছয়টি ব্যাংকের মধ্যে আমরা অন্যতম ছিলাম। পরে আরটিজিএস ও বিইএফটিএনসহ বিভিন্ন উদ্যোগেও আমরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছি। এছাড়া ‘বিনিময়’ নামের ইন্টার-অপারেবল অ্যাপের মাধ্যমে এক ব্যাংক থেকে আরেক ব্যাংকে ফান্ড ট্রান্সফারের যে পাইলট প্রকল্পটি ১২টি ব্যাংকের অংশগ্রহণে শুরু হয়েছিল, তাতেও আমরা শুরু থেকেই যুক্ত থেকে সরকারের ডিজিটাল ব্যাংকিং উদ্যোগে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছি। এছাড়াও ঋণের ক্ষেত্রে ডিজিটাল সিকিউরড লোন এবং ডিজিটাল সিকিউরড ক্রেডিট কার্ড চালু রয়েছে। খুব শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়নের আওতায় ডিজিটাল ক্ষুদ্রঋণ প্রক্রিয়া চালু হতে যাচ্ছে।

দেশ রূপান্তর : অনলাইন ব্যাংকিং লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রায়ই সতর্কতা জারি করা হয়। আপনার ব্যাংকে অনলাইন লেনদেনে গ্রাহকদের নিরাপত্তা কেমন?

মো. আহসান-উজ জামান : আমরা গ্রাহকসেবাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকি। আমাদের যাত্রার প্রতিটি ধাপে আমরা চেষ্টা করেছি আস্থা, স্বচ্ছতা এবং সেবার মান রক্ষা করতে। মিডল্যান্ড ব্যাংক বরাবরই বিশ্বাস করে যে, একটি ব্যাংকের সাফল্যের মূল ভিত্তি হচ্ছে গ্রাহক সন্তুষ্টি ও নিরাপত্তা। এখন যেহেতু অনলাইন ব্যাংকিংয়ের যুগ, তাই গ্রাহক নিরাপত্তাই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। এবং এই ক্ষেত্রে উভয়পক্ষের সতর্কতা অবলম্বন করা অত্যন্ত জরুরি। বিভিন্ন সতর্কতামূলক বার্তা, ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্টসহ বিভিন্নভাবে অনলাইন ব্যাংকিং লেনদেনের ক্ষেত্রে নিরাপদ থাকতে গ্রাহকদের সতর্ক করা হয়।

দেশ রূপান্তর : ব্যাংকের কত শতাংশ গ্রাহক এখন ডিজিটাল সেবা পাচ্ছেন? বাংলাদেশে অনলাইন ব্যাংকিংয়ের ভবিষ্যৎ কেমন?

মো. আহসান-উজ জামান : বর্তমানে মিডল্যান্ড ব্যাংকের প্রায় ৩৬ শতাংশ গ্রাহক ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করছেন। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহকদের মধ্যে অনলাইন ব্যাংকিংয়ের প্রতি আগ্রহ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্রাহকদের সুবিধা নিশ্চিত করতে ব্যাংকটি তাদের সব পণ্য ও সেবাকে ধীরে ধীরে ডিজিটাল ভার্সনে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ইতিমধ্যে, ব্যাংকের অনলাইন ব্যাংকিং অ্যাপ- মিডল্যান্ড অনলাইনের মাধ্যমে গ্রাহকরা ঘরে বসেই খুব সহজে, সহজ কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করেই অ্যাকাউন্ট চালু করা থেকে শুরু করে লেনদেন করা, বিল পরিশোধ, অ্যাকাউন্টের সঙ্গে ফিক্সড ডিপোজিট বা ডিপিএস চালু এবং লোনের জন্য আবেদন করার সুযোগ পাচ্ছেন। গ্রাহকের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রতিটি লেনদেনের ক্ষেত্রে ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা পাসওয়ার্ড লগইন, ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি) যাচাইসহ একাধিক সুরক্ষা ধাপ কার্যকর করা হয়েছে। লেনদেন শেষে ই-মেইল ও এসএমএস অ্যালার্টের মাধ্যমে গ্রাহক তাৎক্ষণিক তথ্যও পাচ্ছেন।

ব্যাংকিং খাতে এই প্রযুক্তিনির্ভর পরিবর্তন গ্রাহক সেবাকে আরও গতিশীল, নিরাপদ ও স্বচ্ছ করেছে। তাই বলা যায়, বাংলাদেশে অনলাইন ব্যাংকিংয়ের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ও উজ্জ্বল।

দেশ রূপান্তর : এখন প্রায় সব ব্যাংকেরই ডেবিট কার্ড ও ক্রেডিট কার্ড রয়েছে। আপনাদের ব্যাংকে কার্ডধারীর সংখ্যা কত? ভবিষ্যতে ভার্চুয়াল কার্ড আনার কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি না?

মো. আহসান-উজ জামান : বর্তমানে মিডল্যান্ড ব্যাংক থেকে ইসুকৃত কার্ডের সংখ্যা প্রায় আড়াই লাখের মতো। আমরা গ্রাহকদের পছন্দ ও চাহিদা অনুযায়ী ডেবিট কার্ড ও ক্রেডিট কার্ড এই সুবিধা প্রদান করতে নিয়মিত চেষ্টা করে যাচ্ছি। 

ভবিষ্যতে ডিজিটাল ও নিরাপদ লেনদেন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে আমাদের ভার্চুয়াল কার্ড আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এটি গ্রাহকদের জন্য আরও টেকসই এবং সুবিধাজনক ডিজিটাল পেমেন্ট অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করবে এবং অনলাইন লেনদেনের নিরাপত্তাও বাড়াবে।

দেশ রূপান্তর : কেন্দ্রীয় ব্যাংক ক্যাশলেস বা নগদবিহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে লেনদেনের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠছে বাংলা কিউআর কোড। কতটা এগিয়েছে এই কার্যক্রম?

মো. আহসান-উজ জামান : কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশের অর্থনৈতিক খাতে ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’ গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো নগদ লেনদেন কমিয়ে ডিজিটাল ও ইলেকট্রনিক পেমেন্ট ব্যবস্থাকে সর্বজনীন করা, যাতে লেনদেন হয় আরও দ্রুত, নিরাপদ ও স্বচ্ছ। এই লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চালু করেছে বাংলা কিউআর কোড, যা এখন ধীরে ধীরে লেনদেনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

বাংলা কিউআর চ্যানেলে অংশগ্রহণকারী যেকোনো ব্যাংক, এমএফএস বা পিএসপি-এর গ্রাহকরা এখন মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে কিউআর কোড স্ক্যানের মাধ্যমে দোকান বা মার্চেন্ট পয়েন্টে তাৎক্ষণিক অর্থ প্রদান করতে পারছেন। গ্রাহকদের নগদ নির্ভরতা কমাতে এবং ডিজিটাল পেমেন্টে উৎসাহিত করতে মিডল্যান্ড ব্যাংক তাদের অনলাইন ব্যাংকিং অ্যাপ ‘মিডল্যান্ড অনলাইন’-এ বাংলা কিউআর কোড পেমেন্ট ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের আর্থিক খাতে ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’ উদ্যোগকে সফলভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর লক্ষ্য ২০৩১ সালের মধ্যে শতভাগ অনলাইন বা নগদবিহীন লেনদেন নিশ্চিত করা। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে ব্যাংকগুলোকে ডিজিটাল লেনদেন প্রসারে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে একটি আধুনিক, নিরাপদ ও সম্পূর্ণ ক্যাশলেস অর্থনীতি প্রতিষ্ঠিত হবে, যা দেশের ডিজিটাল রূপান্তরের যাত্রায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

দেশ রূপান্তর : ডিজিটাল লেনদেন নিরাপদ রাখতে গ্রাহকদের করণীয় কী?

মো. আহসান-উজ জামান : মিডল্যান্ড ব্যাংক বিশ্বাস করে, ব্যাংকের উন্নয়ন শুধু আয় বৃদ্ধিতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং গ্রাহকের অভিজ্ঞতা উন্নত করা ও প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করাই প্রকৃত অগ্রগতি। এ লক্ষ্যে ব্যাংকটি ধারাবাহিকভাবে ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবাকে আরও আধুনিক, দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য করতে কাজ করে যাচ্ছে।

তবে নিরাপদ ডিজিটাল লেনদেনের জন্য গ্রাহকের সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। নিজের লগইন পাসওয়ার্ড, পিন বা ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড কখনোই অন্য কারও সঙ্গে শেয়ার করা উচিত নয়। অনলাইন ব্যাংকিং বা মোবাইল অ্যাপে কোনো অস্বাভাবিক বা সন্দেহজনক কার্যক্রম লক্ষ করলে দ্রুত কাছাকাছি শাখা বা ব্যাংকের কল সেন্টারে যোগাযোগ করতে হবে। প্রতিবার লেনদেন সম্পন্ন করার পর অবশ্যই অ্যাপ থেকে লগআউট করে নিতে হবে, যাতে অ্যাকাউন্ট সুরক্ষিত থাকে। ব্যাংক ও গ্রাহক উভয়ের সচেতন অংশগ্রহণই ডিজিটাল ব্যাংকিংকে আরও নিরাপদ, সহজ ও বিশ্বস্ত করে তুলবে।